১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ  । ৩০শে নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ 

বিএনপির ৪৭ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী : নতুন অঙ্গীকারের দিন আজ

সুন্দর সাহা
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ৪৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ ১ সেপ্টেম্বর। দেশের অন্যতম বৃহত্তম এই দলটি পা রাখবে ৪৮ বছরে। ১৯৭৮ সালের এই দিনে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও ইসলামী মূল্যবোধ সামনে রেখে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই দল গঠন করেন। দীর্ঘ ৪৭ বছরে সংঘাত-বিক্ষোভ, চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে দলটি একাধিকবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়েছে। কিন্তু ২০০৬ সালের পর থেকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে রয়েছে বিএনপি। এর মধ্যে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বর্তমান চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন দল বিএনপি। তবে তিনি কারাগারে থাকা অবস্থা সবশেষ ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে অংশ নেয়। দিনের ভোট রাতে কেটে বাক্স বোঝাই করার কারণে আওয়ামী লীগের তৎকালীন ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করেন। বিএনপিকে দেয়া হয় মাত্র ছয়টি আসন। প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন সময় বিপর্যয়ের মুখে পড়লেও বারবার ঘুরে দাঁড়ায় বিএনপি। বিগত ১৬ বছরে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত দুর্নীতিবাজ প্রশাসনের ষড়যন্ত্রে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দলটির নেতাকর্মীরা বিভিন্ন মামলায় বিপর্যস্ত। দলের নেতা-কর্মীদের বার বার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। লাগাতার হত্যা-খুন-গুমের পরও দমে যায়নি জাতীয়বাদের সৈনিকরা। চলমান পরিস্থিতিতে ঘুরে দাঁড়িয়েছে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত এ দলটি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দীর্ঘ যাত্রাপথে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের অস্থিরতা, শেখ মুজিবের একদলীয় এবং নাগরিক স্বাধীনতার সংকটের মধ্য দিয়ে যখন জাতি দিশেহারা, তখন ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের নেতৃত্বে বিএনপির আবির্ভাব ঘটে। এই আবির্ভাব ছিল কেবল একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম নয়; এটি ছিল জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন রক্ষার প্রত্যয়। একাত্তরে যুদ্ধের ময়দানে জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রতি আনুগত্য ভেঙে ফেলেছিলেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, এটা কোনো বিচ্ছিন্ন আন্দোলন নয়, বরং একটি সশস্ত্র বিদ্রোহ, যার লক্ষ্য স্বাধীনতা। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এটি ছিল একটি সাহস যোগানো ঘোষণা একজন মেজর প্রকাশ্যে জানালেন, তারা পাকিস্তানি সেনাদের ছেড়ে বিদ্রোহ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় জিয়াউর রহমানের আরেকটি বিখ্যাত ঘোষণা ছিল, এতদিন আমরা কেবল স্বাধীনতার কথা শুনেছি, এবার স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে। এ উক্তি কেবল স্লোগান ছিল না, যার মাধ্যমে তিনি জনগণকে সক্রিয় সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তাঁর দৃষ্টিতে স্বাধীনতা মানে কেবল ভৌগোলিক মুক্তি নয়, বরং রাষ্ট্র গঠনের দায়িত্ব। তাই স্বাধীনতার পর তিনি বলেছিলেন, স্বাধীনতা এসেছে, কিন্তু আমাদের দৃষ্টিতে এখনও অনেক কাজ বাকি।’ এটি নিছক অভিব্যক্তি নয়; বরং যেখানে রাষ্ট্র শুধু স্বাধীন থাকে না, বরং উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও জনগণের কল্যাণের মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন, তাঁর শাসনের অধীনে দীর্ঘদিনের শূন্যতা পূরণ করতে হলে প্রয়োজন একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম, যার মূল দর্শন হবে জনগণকেন্দ্রিক। তাই বিএনপি গঠিত হয় স্বাধীনতা, বহুদলীয় গণতন্ত্র, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও গ্রামীণ উন্নয়ন। এই দর্শন ছিল পূর্ববর্তী শাসনের এককেন্দ্রিক সমাজতান্ত্রিক নীতির বিকল্প, যেখানে কৃষক-শ্রমিক থেকে শুরু করে ছাত্র-যুবক পর্যন্ত সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার চেষ্টা ছিল। জিয়া উপলব্ধি করেছিলেন, রাজনীতির কেন্দ্রে থাকতে হবে জনগণকে। জিয়ার একটি বিখ্যাত উক্তি ছিল, রাজনীতি মানে জনসেবা। এই দর্শনের ভিত্তিতেই বিএনপি গড়ে ওঠে। বিএনপি-এর দর্শনকে তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন জনগণকেন্দ্রিক ভাষায় বাংলাদেশের রাজনীতি মানে জনগণের রাজনীতি এবং জনগণের জন্যই আমরা কাজ করি। রাষ্ট্রক্ষমতার বৈধতা কেবল জনগণের সমর্থন নয়, বরং আইন ও ন্যায়বিচারের ওপরও প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। এটি ছিল তাঁর মূল বার্তা। একইসাথে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, আমরা সকলের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে চাই। যেখানে রাষ্ট্রকে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথে পরিচালিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তিনি একটি দৃঢ় জাতীয় চরিত্র গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডে বিএনপি নেতৃত্বহীনতা, দমননীতি ও বিভেদের মধ্যে টিকে থাকার চ্যালেঞ্জে পড়ে। কিন্তু আপসহীন নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি পুনর্গঠিত হয় এবং ১৯৮০-এর দশকে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণআন্দোলন গড়ে তোলে। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান বিএনপির নেতৃত্বেই গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিজয় ছিল গণতান্ত্রিক যাত্রার এক মাইলফলক। বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাস রচনা করেন। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন, অর্থনৈতিক উদারীকরণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও দৃঢ় পররাষ্ট্রনীতি ছিল বিএনপির উল্লেখযোগ্য অর্জন।
একবিংশ শতকে প্রবেশ করে বিএনপি নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। বৈশ্বিক পরিবর্তন, প্রযুক্তি-নির্ভর অর্থনীতি ও তরুণ প্রজন্মের চাহিদা মোকাবেলায় বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলীয় শৃঙ্খলা, আধুনিকায়ন ও যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে এই সময় বিএনপি সবচেয়ে বেশি ভুগেছে রাষ্টীয় ষড়যন্ত্রের কারণে। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের রাজনৈতিক মামলা, গ্রেফতার, আন্দোলনের উপর বিধিনিষেধ সব মিলিয়ে দলকে কোণঠাসা করার চেষ্টা চালানো হয়েছে। তবুও বিএনপি একটি কার্যকর ও জনপ্রিয় দল হিসেবে টিকে আছে, যা দলের স্থিতিস্থাপকতা ও আদর্শের প্রতি অঙ্গীকারেরই প্রমাণ। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন চরম উত্তেজনা ও প্রত্যাশার জায়গায় পৌঁছেছে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে বলে ঘোষিত হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলন ও গণআন্দোলনের মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার যে লড়াই বিএনপি চালিয়ে এসেছে, এই নির্বাচন তারই পরিণতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশের সাধারণ জনগণ বিশ্বাস করে, এই নির্বাচন হবে পরিবর্তনের নির্বাচন। বিগত সময়ে জনগণ যে বঞ্চনা, দুর্নীতি, স্বৈরতান্ত্রিক শাসন এবং অর্থনৈতিক সংকটে ভুগেছে, তা থেকে মুক্তি পেতে তারা বিএনপির প্রতি আস্থা রাখছে। তরুণ প্রজন্ম থেকে শুরু করে গ্রামীণ জনগণ, সব শ্রেণির ভোটারদের আশা, বিএনপি বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে এবং জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করবে। বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে একটি গণতান্ত্রিক ও জনগণের সরকার গঠনের অঙ্গীকার করছে। তারেক রহমান প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন নিশ্চিতকরণ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অবসান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানে ব্যাপক সংস্কার, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার এবং বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফা বাস্তবায়নই হবে আগামী সরকারের অন্যতম কাজ।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন বিএনপির-এর জন্য কেবল স্মৃতিচারণ নয়। এটি আত্মসমালোচনা ও নতুন অঙ্গীকারের দিন। এ দিনে পুনর্নবায়িত হয় জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের প্রতিজ্ঞা, জিয়াউর রহমানের গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণের অঙ্গীকার, আধুনিক ও প্রযুক্তি-নির্ভর বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন। বস্তুত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিএনপির ভূমিকা এক মহাকাব্যের মতো। এটি জনগণের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। দমন-পীড়ন, কারাবরণ ও রাজনৈতিক সংকট সত্ত্বেও বিএনপি প্রমাণ করেছে কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার মাধ্যমে নয়, বরং জনগণের আস্থা ধরে রাখার মধ্য দিয়েই জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক অনুপ্রেরণা দেয়া সম্ভব। প্রসঙ্গত, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রথমে ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল বা ‘জাগদল’ নামে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। একই বছরের ১ মে সমমনা দল ও রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে গঠন করেন জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট। ১৯৭৮ সালের ২৮ আগস্ট ‘জাগদল’ বিলুপ্তির ঘোষণা দেন। তিন দিন পর ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা রেস্তোরাঁ প্রাঙ্গণে সংবাদ সম্মেলন করে জিয়াউর রহমান নতুন দল হিসেবে বিএনপির গঠনতন্ত্র ও কর্মসূচি ঘোষণা করেন। প্রতিষ্ঠার ছয় মাসের মাথায় ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২০০টি আসন লাভ করে। বিএনপির গঠনতন্ত্র তৈরির প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন নয়জন। এর আগে উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে ১৯৭৭ সালের ২২শে মে ‘আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে’ জেনারেল জিয়া ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এর মাধ্যমে পথচলা শুরু করে বিএনপি। ১৯৭৮ সালের ২৮ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা করা হয়। জুন মাসে অনুষ্ঠিত সে নির্বাচনে জিয়াউর রহমান ৭৬ দশমিক ৩৩ ভাগ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়