সুন্দর সাহা
ভারতের পেট্রাপোল স্থলবন্দর থেকে বাংলাদেশে রপ্তানির সময় প্রায় ১৫ কোটি টাকা মূল্যের ৫ ট্রাক পণ্য জব্দ করেছে সে দেশের সীমান্ত রক্ষী ও বিএসএফ। বিষয়টি ফাঁস হওয়ার পর বেনাপোলে শুল্ক ফাঁকিবাজ চক্রের হোতা হাসানুজ্জামান হাসানের দৌঁড়-ঝাপ শুরু হয়েছে। তাকে রক্ষার মিশনে মাঠে নেমেছে স্বেচ্ছাসেবক লীগের বেনাপোলের আলোচিত এক টাউট। এদিকে, হাসানুজ্জামান হাসানের অপকর্ম তদবির মিশনে নেমেছে বেনাপোলে তার আলোচিত লাইসেন্স বিহীন সিএণ্ডএফ এজেন্টও। লাইসেন্স বিহীন সিএণ্ডএফ এজেন্ট এক সপ্তাহের মধ্যে ভারতে জব্দ পণ্য বেনাপোল বন্দরে আমদানি করে এনে ছাড় করিয়ে নিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ দিয়েছে। এভাবেই চলছে, তাদের শুল্ক ফাঁকির বাণিজ্য। অবৈধ পন্থায় ভারত থেকে পণ্য আমদানি করে এনে হাসানুজ্জামান হাসান টাকার কুমির বনে গেছে। অবৈধ আয়ে বিত্ত-ভৈববে ডুবে গেছে।

বেনাপোলের কাগজ পুকুরে এবং ছোট আঁচড়ায় হাসানুজ্জামানের বাড়ি দুটি দেখলেই তার সাথে তার বিতর্কিত সিএণ্ডএফ এজেন্টও বিপুল পরিমাণ কালো টাকার মালিক বনে গেছে। সদ্য সাবেক কমিশনার মো. কামরুজ্জামানসহ কাস্টমসের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সাথে অর্থের বিনিময়ে সখ্যতা গড়ে লাইসেন্স ভাড়া করে সিএণ্ডএফ এজেন্ট সাজা ব্যক্তিটি যশোর শহরে চার কোটি টাকার বাড়ি কিনেছে। ফকির থেকে আমীর বনে যাওয়া সেই আলোচিত ব্যক্তিটি প্রায় কোটি টাকার গাড়ী কিনে গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এভাবেই বেনাপোল বন্দরকে ব্যবহার করে ট্রাক ড্রইভারের বেকার ছেলে বনে গেছে আমদানিকারক। ভাজা ওয়ালার ছেলে বনে গেছে চোরাই ও অবৈধ পণ্য চালানের বাহক। সূত্র মতে, গত সোমবার (১ সেপ্টেম্বর) সকালে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বাংলাদেশে রপ্তানির সময় ভারতীয় ৫টি ট্রাক জব্দ করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ও কাস্টমস যৌথভাবে আটক করে। ৫টি ট্রাকে প্রায় ১৫ কোটি টাকার বিভিন্ন পণ্য জব্দ করেছে। আটকের পর ট্রাক খুলে ভারত সরকারের অর্থনৈতিক গোয়েন্দা সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) ও কাস্টম যৌথভাবে মালামাল ইনভেন্টরি করেন।

পেট্রাপোল ব্যবসায়ী সূত্রে জানা যায়, এই পণ্যের বাংলাদেশের মালিক বেনাপোলের কথিত আমদানিকারক বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত হাসানুজ্জামান। দীর্ঘদিন যাবৎ বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত হাসানুজ্জামান হাসানের মালিকানাধীন কথিত আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স জামান ট্রেডার্স!’ এবং যার ভারতীয় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের মন্ডল গ্রুপ নামের একটি চক্র অবৈধ আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। পণ্যের ভারতীয় সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট বাপি মণ্ডল। ভারতের পেট্রাপোলের অবৈধ ব্যবসাসীরা বাপী মণ্ডলকে রক্ষার জন্য তার নাম বিকৃত করে পেট্রাপোলের রফতানিকারক অমিত ওরফে বাপীকে ফাঁসানোর চেষ্টা করে। সীমান্ত সূত্র জানায়, বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষারত জব্দকৃত ভারতীয় ৫টি ট্রাকে মোটরসাইকেল পার্টসের নামে মিথ্যা ঘোষনায় বাংলাদেশে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করা হচ্ছিল। ভারত সরকারের অর্থনৈতিক গোয়েন্দা সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)-র গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কাস্টমস ও বিএসএফ ৫টি ট্রাক আটক করে। আটককৃত গাড়িতে পণ্য সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে ঔষধ, জিলেট ব্লেড, ট্রিমার, শাড়ি কাপড়, ফেব্রিক্স, ইমিটেশন জুয়েলারী, মুর্তি, হাত ঘড়ি, চাদর, তালা, এয়ারবার্ড, থালা বাসন, থ্রীপিস, জুতাসহ বিভিন্ন ধরনের সেলুন আইটেম সামগ্রী। জব্দকৃত পণ্যের আনুমানিক মূল্য ১৫ কোটি টাকা বলে জানা গেছে।
সূত্র আরও জানায়, ভূয়া রফতানির লাইসেন্সে বাংলাদেশে রপ্তানির সময় এসব পণ্যের কোন বৈধ কাগজপত্র পায়নি ভারতীয় কাস্টমস। এসব পণ্য মোটরসাইকেল পার্টস বলে রপ্তানি করা হচ্ছিলো। এসব পণ্যের বস্তার গায়ে এসআর ইন্টারন্যাশনাল বনগাঁ, এস আর/পারভেজ, এসআর ইন্টারন্যাশনাল, রাজন সেন, জে জে সোহেল, শাকিল এইসপি, আজিম, সিধু, আবু সাইদ ইত্যাদি ট্রান্সপোর্ট চালানের নাম পণ্যের পাওয়া যায়। সূত্র জানায়, মণ্ডল গ্রুপের মালিক কুতুব উদ্দীন মণ্ডল ও সাব্বির মণ্ডল কোন রফতানিকারক নন। তারা মূলত অবৈধ মালের ক্যারিংম্যান। রফতানিকারক না হওয়া সত্বেও কুতুব উদ্দীনের বাড়ির কাছে গড়ে তুলেছেন বন্দর শেডের মত বিরাট একটি গোডাউন। অবৈধ পণ্য প্রথমে এই গুদামে এনে জড়ো করা হয়। তারপর বিভিন্ন পন্থায় অবৈধভাবে বাংলাদেশে পাঠানো হয়। এরা শুধু বেনাপোল কাস্টমস হাউজের শুল্ক ফঁকি দেয না। এরা ভারতের পেট্রাপোলেও শুল্ক ফাকি দিতে রফতানিকাকের ভূয়া লাইসেন্সের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে পণ্য পাচার করে। বাংলাদেশ এবং ভারতীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করে বলেন, বেনাপোল বন্দরের শেড ইনচার্জ ও আইআরএম টিম ও শুল্ক গোয়েন্দার যোগসাজজে পূর্ব চুক্তি মোতাবেক শুল্ক ফাঁকি দিতে ভারত থেকে এমন পণ্য চালান আমদানি করেন। বাংলাদেশে এসব পণ্যের শুল্কায়ন গ্রুপ ও পরীক্ষণ গ্রুপ (আইআরএম) টিমের নাম মাত্র পরীক্ষণে মোটা টাকার বিনিময়ে খালাশ করে দেয়। স্থানীয়রা জানায়, দীর্ঘদিন যাবৎ বেনাপোলের হাসানুজ্জামান হাসানসহ চিহ্নিত একটি চক্র সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে অবৈধ এই বাণিজ্যে লিপ্ত। এরা ভারত থেকে বৈধ পণ্যর সাথে অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজসে আমদানি নিষিদ্ধ ও অবৈধ পণ্য আমদানি করে সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আসছে। আর এসব শুল্ক ফাঁকি দিয়ে অসাধু আমদানিকারক ও কথিত সিএন্ডএফ এজেন্টরা টাকার কুমির বনে যাচ্ছে। আর এদের মধ্যে অধিকাংশ ভাড়াকৃত লাইসেন্স ব্যবহার করে বলে জানা গেছে। আলোচিত ও বিতর্কিত হাসানুজ্জামান হাসান বেনাপোলের বিত্তিআঁচড়ার আলী আকবরের পুত্র। বর্তমানে হাসান কাগজপুকুর এলাকায় বসবাস করে। এ বিষয়ে সিএণ্ডএফ এজেন্ট ওমর এণ্ড সন্সের লাইসেন্স ভাড়া নিয়ে শুল্ক ফাঁকির বাণিজ্যে লিপ্ত কথিত সিএণ্ডএফ এজেন্ট আজিম উদ্দীন দৈনিক প্রতিদিনের কথাকে বলেন, ‘এসব লিখে কোন লাভ হবে না। এক সপ্তাহের মধ্যে এই পণ্য চালান বেনাপোল বন্দরে আসবে এবং তা ছাড় করিয়ে ঢাকায় পাঠানো হবে। এ ক্ষমতা হাসানুজ্জামানের আছে। নিজের লাইসেন্স না থাকায় আজিম উদ্দীন ওমর এণ্ড সন্সের লাইসেন্স ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করেন। এ দিকে, হাসানুজ্জামান হাসানের অধিকাংশ পণ্য ওমর এণ্ড সন্স এবং নিরা এন্টাপ্রাইজ নামের সিএণ্ডএফ এজেন্টের লাইসেন্সে ছাড় করানো হয় বলে বন্দরের একাধিক সূত্র জানায়। বর্তমান কাস্টমস কমিশনার অনলাইনে পুরাতন কয়েকটি ফাইল নাড়া-চাড়া করলেই হাসানুজ্জামান হাসান এবং সিএণ্ডএফ এজেন্ট ওমর এণ্ড সন্স এবং নিরা এন্টাপ্রাইজের শানে নজুল উদঘাটন করতে সমর্থ হবেন। তেমন একটি কঠোর পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন বেনাপোলের ব্যবসায়ীরা।

