বিনিয়োগে স্থবিরতা

দেশে শিল্প-ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা ভালো নয়। বিনিয়োগে স্থবিরতা চলছে। দেশি বা বিদেশি কোনো উদ্যোগেই ভালো সাড়া নেই। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তারা আস্থাহীনতায় রয়েছেন।সেই সঙ্গে আছে বিদ্যুৎ-জ্বালানির সংকট, ঋণের উচ্চ সুদের হার, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিসহ বেশ কিছু কারণ। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মতে, বিনিয়োগকারীরা চান ধারাবাহিক নীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি দিকনির্দেশনা। কেবল নির্বাচিত সরকারই এই ধারাবাহিকতা দিতে পারে, আর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া বিনিয়োগের গতি ফেরানোও সম্ভব নয়।দেশে প্রতিনিয়ত কর্মক্ষম জনসংখ্যা বাড়ছে।
বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। বেকারত্বের হার বাড়তে থাকবে। সমাজে অস্থিতিশীলতা বাড়বে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি দ্রুততর হবে।
সেই পরিস্থিতি আবার বিনিয়োগের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করবে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে দেখা যায়, কর্মসংস্থান না বেড়ে উল্টো কমছে। জানা যায়, গত এক বছরে সাভার, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে ৩৫৩টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বেকার হয়েছেন এক লাখ ১৯ হাজার ৮৪২ জন শ্রমিক। তাঁদের বেশির ভাগই অন্য কোনো কাজের সংস্থান করতে না পেরে গ্রামে চলে গেছে।
অনেকে বাধ্য হয়ে নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে যাচ্ছেন। এতে নষ্ট হচ্ছে সামাজিক স্থিতি। আবার অনেক কারখানা বন্ধ না হলেও ধুঁকে ধুঁকে টিকে আছে। লোকসান দিচ্ছে। ফলে সময়মতো বেতন-ভাতা দিতে পারছে না। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা সড়ক অবরোধসহ নানা ধরনের কর্মসূচি পালন করছেন।
ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, বিনিয়োগে স্থবিরতা দেশের অর্থনীতিকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। কর্মসংস্থান ব্যাহত হচ্ছে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকট, ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানিসংকটের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ পতনের দিকে। অনিশ্চয়তার কারণে নতুন বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি নিতে চাইছেন না; বিদ্যমান ব্যবসায়ীরাও নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগে যাচ্ছেন না। তাঁরা দীর্ঘমেয়াদি নীতি ও স্থিতিশীলতার জন্য নির্বাচিত সরকারের জন্য অপেক্ষা করছেন। বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো রাজনৈতিক অস্থিরতা। বিনিয়োগকারীরা সব সময় স্থিতিশীলতা খোঁজেন। জ্বালানি সমস্যার সমাধান সম্ভব, কিন্তু রাজনৈতিক সহিংসতা বা সড়ক অবরোধ দেখলেই বিনিয়োগকারীরা পিছিয়ে যান। নির্বাচিত সরকার এলে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলে বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৬.৫২ শতাংশ। আগের মাস জুনে যা ছিল ৬.৪৯ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইটে গত ২২ বছরের যে তথ্য রয়েছে, তাতে এই প্রবৃদ্ধি তার মধ্যে সর্বনিম্ন। তা থেকেও বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির নেতিবাচক চিত্রই স্পষ্ট হয়। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ‘নির্বাচিত সরকারের অনুপস্থিতিতে নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ করা কঠিন। ব্যাংকও ঋণ দিতে দ্বিধা করে।’
বর্তমান বিশ্ব অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ। আর বিনিয়োগ দু-এক দিনের বিষয়ও নয়। একজন বিনিয়োগকারী দীর্ঘ মেয়াদে তাঁর বিনিয়োগের নিশ্চয়তা চাইবেন। আমরা যদি বিনিয়োগের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করতে না পারি, পরিবেশের স্থিতিশীলতা প্রমাণ করতে না পারি, তাহলে দেশি-বিদেশি কোনো বিনিয়োগই হবে না। তাই নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার দিকেই আমাদের বেশি মনোযোগ দিতে হবে।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়