১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ  । ৩০শে নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ 

মেহেরপুর ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল: ৭৬ কোটি টাকার অব্যবহৃত ভবন জৌলুশ হারাচ্ছে

মেহেরপুর প্রতিনিধি
স্বপ্ন ছিল আধুনিক চিকিৎসার কেন্দ্র হবে ২৫০ শয্যার মেহেরপুরের আধুনিক জেনারেল হাসপাতাল। রোগীরা পাবে সর্বোচ্চ সেবা, আর চিকিৎসকরা কাজ করবেন বিশ্বমানের পরিবেশে। কিন্তু বাস্তবতা হলো- ৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হাসপাতালের ভবন আজও পড়ে আছে ব্যবহারবিহীন। সময়ের ব্যবধানে ভবনের জৌলুশ হারাচ্ছে, দেওয়ালে পড়ছে ধুলোর ছাপ, আর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পেছনে লুকিয়ে আছে দায়সারা প্রকৌশল কাজ আর অভিযোগের পাহাড়। মঙ্গলবার সরজমিনে দেখা যায়-তালাবদ্ধ ভবন। নিচতলায় হাসপাতালে ভিজিটে আসা বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির মোটরসাইকেলের গ্যারেজে পরিণত। কেউ ঝাল মুড়ি বিক্রি করছে। ক্লান্ত রিকশা চালকরা ভবনের বারান্দার ছায়াতে রিকশায় অবস্থান করছেন। রাতের বেলা সেখানে বিপথগামীদের আড্ডার স্থল বলেও অনেকের অভিযোগ। পাশের পুরোনো একশ বেডের হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৫শ রোগী গাদাগাদি করে রেখে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। ২০১৮ সালে গণপূর্ত বিভাগের তত্ত্বাবধানে ১১তলা বিশিষ্ট হাসপাতাল ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৭৬ কোটি টাকা। তবে ২০২৩ সালের ১২ নভেম্বর-যখন ভবনের মাত্র ৯তলা পর্যন্ত নির্মাণকাজ শেষ, অনেক কাজ অসমাপ্ত, তখনই জেলা প্রশাসন ও তৎকালীন জনপ্রশাসন মন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের চাপে প্রকল্পটি ‘উদ্বোধন’ করা হয়। নির্মাণ হয়নি ১০ ও ১১তলা, এমনকি এখন পর্যন্ত ১০ ও ১১তলার জন্য দরপত্রও আহ্বান করা হয়নি। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. হাসিবুস সাত্তার বলেছিলেন-আমি ভবন গ্রহণে আপত্তি জানিয়েছিলাম। ভবনটি সম্পূর্ণ নয়, ত্রুটিপূর্ণ। কিন্তু মন্ত্রীর চাপের মুখে আমাকে তা গ্রহণে বাধ্য করা হয়। আমি ভবন গ্রহণের পর ৬০ লাখ টাকার ফার্নিচারের দরপত্র আহ্বান করি। ওই অবস্থায় ভবন চালু না করা হলে ভবিষ্যতে কোনদিন একসঙ্গে সমস্যা মেটবে না। তিনি আরও জানান-গণপূর্ত বিভাগ ভবন বুঝে নেওয়ার জন্য চিঠি দিলে ভবন গ্রহণের উপযোগী পর্যবেক্ষণে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। গঠিত তদন্ত কমিটি খুঁজে পায় একের পর এক অনিয়ম ও নির্মাণ ত্রুটি : ছাদে পানি জমে, জানালার গ্লাস ভাঙা, নিচতলা থেকে ষষ্ঠতলা পর্যন্ত সিঁড়ির গ্রিল নেই-যা বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি, নিুমানের কাচ, রঙ নষ্ট, দরজা-জানালার মান প্রশ্নবিদ্ধ, নেই সিসিটিভি, নেই মেডিকেল গ্যাস, নেই এক্স-রে কক্ষে রেডিয়েশন প্রটেকশন, প্রসিডিউর রুমে নেই এসি, স্টোররুমে কাঠের দরজার বদলে কাচ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা নেই, লিফট চালু না, নেই সুইপার বা পর্যাপ্ত সিকিউরিটি। এসব অসঙ্গতির মধ্যেও ভবনটি গ্রহণ করা হয়েছে, যেখানে চিকিৎসাসেবা চালু করা তো দূরের কথা-ব্যবহারের উপযোগী করাই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম রফিকুল হাসান দাবি করেছেন, ডিপিপি ও দরপত্র অনুযায়ী কাজ হয়েছে। কিন্তু বাস্তবচিত্র বলছে ভিন্ন কথা। কোনো একটি তলা নয়, পুরো ভবনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অংশ নির্মাণ ত্রুটিতে ভরা। অনেক স্থানে মনে হয়েছে, যেন কাগজে-কলমেই সেবা নিশ্চিত করা হয়েছে, বাস্তবে নয়। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শাহরিয়া শায়লা জাহান বলেন, এই ভবনে চিকিৎসাসেবা চালু করা সম্ভব নয় যতদিন না সব সমস্যা সমাধান হয়। ভবনের ভেতরে ন্যূনতম অবকাঠামো না থাকলে রোগীর নিরাপত্তা ও চিকিৎসাসেবা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। লজিস্টিক সাপোর্ট ছাড়া ভবন চালু কোনভাবেই সম্ভব নয়। যে ভবন হওয়ার কথা ছিল মেহেরপুরবাসীর আশা ও নির্ভরতার প্রতীক, সেটি আজ দাঁড়িয়ে আছে নীরব এক সাক্ষী হয়ে-অসচ্ছতা, তড়িঘড়ি উদ্বোধন আর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার নিদর্শন নিয়ে। ৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই হাসপাতাল ভবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন প্রশ্ন একটাই-এটি কি জনগণের কল্যাণে ব্যবহার হবে, নাকি ফাইলের পাতায় থেকে যাবে দুর্নীতির আরেকটি উদাহরণ হয়ে?

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়