গাজীপুরের টঙ্গীতে রাসায়নিক গুদামের অগ্নিকাণ্ডে চারজনের মৃত্যু আমাদের আবারও সতর্ক করল। তিনজন ফায়ার ফাইটার ও একজন দোকান কর্মচারীর জীবনাবসান শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা ও ব্যাবসায়িক স্বার্থসিদ্ধির করুণ পরিণতি। দীর্ঘদিন ধরে বিশেষজ্ঞরা আবাসিক এলাকায় রাসায়নিক গুদাম রাখাকে ‘গোপন বোমা’ বলে আসছেন। তবু রাজধানী থেকে শুরু করে শিল্প শহরগুলোতে বাসাবাড়ি, মার্কেট, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এ ধরনের গুদাম গড়ে উঠছে। প্রতিদিন লাখো মানুষ ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে বাস করছে। ২০১০ সালের নিমতলী ও ২০১৯ সালের চুড়িহাট্টার মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে ১৯৫ জনের মৃত্যুতে দেশ কেঁপে উঠেছিল। তখন সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল রাসায়নিক গুদাম সরিয়ে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা হবে। কিন্তু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি। বরং দিন দিন নতুন নতুন এলাকায় এ ধরনের ব্যবসা ছড়িয়ে পড়ছে। টঙ্গীর কাঁঠালদিয়ায় ৯৩ কোটি টাকায় নির্মিত ৫৩টি আধুনিক ওয়্যারহাউস আজও খালি পড়ে আছে। মালিকরা সেগুলো ব্যবহার না করে আবাসিক এলাকায় অবৈধভাবে ব্যবসা চালাচ্ছেন। সরকারের প্রচার, বিজ্ঞপ্তি, চিঠি, কোনো কিছুই তাঁদের টলাতে পারেনি। কারণ রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল নজরদারি। এটি শুধু টঙ্গীর সমস্যা নয়। দেশের বিভিন্ন জেলার জনবহুল এলাকায় রাসায়নিকের গুদাম ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত। সড়কের পাশে ড্রামে ভরা কেমিক্যাল রাখা, সাইনবোর্ডহীন বিপজ্জনক মজুদ, অগ্নিনিরাপত্তার ন্যূনতম ব্যবস্থা ছাড়াই ব্যবসা চালানো, এসব একেকটা চলন্ত বোমার মতো। কোনো এক সিগারেটের আগুনেই শত মানুষের প্রাণ ঝরতে পারে।
টঙ্গীর সাহারা মার্কেটের অগ্নিকাণ্ডে ফায়ার সার্ভিসের ওয়্যারহাউস পরিদর্শক খন্দকার জান্নাতুল নাঈমসহ চারজনের মৃত্যু প্রমাণ করে এই ব্যবসা কতটা প্রাণঘাতী হতে পারে। এই সাহসী ফায়ার ফাইটাররা জীবন বাজি রেখে মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, কিন্তু অবৈধ রাসায়নিক গুদামের ভয়াবহতার কাছে হার মানতে হলো তাঁদের। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই মর্মান্তিক ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে নিহতদের আত্মত্যাগ জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন। সরকারের দায়িত্ব শুধু নতুন গুদাম নির্মাণ নয়, বরং কঠোর বিধি-নিষেধ প্রয়োগের মাধ্যমে অবৈধ গুদাম সরানো। লাইসেন্স, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন, স্থানীয় প্রশাসন, সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই ভয়াবহ ঝুঁকি দূর করা সম্ভব নয়। একদিকে খালি পড়ে থাকা নিরাপদ গুদাম, অন্যদিকে জনবহুল এলাকায় বিপজ্জনক মজুদ, এ যেন রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার জ্বলন্ত উদাহরণ। টঙ্গীর অগ্নিকাণ্ড আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। নতুন নিমতলী কিংবা চুড়িহাট্টা চাই না আমরা। বিপজ্জনক হলেও এক শ্রেণির ব্যবসায়ী স্থানীয়ভাবে ‘ম্যানেজ’ করে এই অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। এখনই যদি কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে যেকোনো মুহূর্তে আরেকটি মর্মান্তিক বিপর্যয় ঘটবে। নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে হলে রাসায়নিক গুদামগুলো অবিলম্বে জনবহুল এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি।

