১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ  । ৩০শে নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ 

ফিরে এলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার

সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে আবারও ফিরে এসেছে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ১৪ বছর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বে আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে যে রায় দিয়েছিলেন, গত বছর জুলাই অভ্যুত্থানের পর সেই রায়ের বিরুদ্ধে একাধিক আপিল করা হয়। সেসব আপিল মঞ্জুর ও পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন নিষ্পত্তি করে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির আপিল বেঞ্চ গত বৃহস্পতিবার এই রায় দেন। বেঞ্চের অন্য ছয় বিচারপতি হলেন বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক, বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুব। এই রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে ফিরে এলো। তবে এই রায়টি এখনই কার্যকর হবে না। এটি কার্যকর হবে পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে। ঐতিহাসিক এই রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেছেন, ‘আজকের দিনটি সারা বাংলাদেশের মানুষের জন্য ঈদের দিন। সর্বসম্মতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল করে রায় দিয়েছেন আপিল বিভাগ।’ ১৯৯৪ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে তৎকালীন বিরোধী দলগুলো নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনে নামে। ১৯৯৬ সালে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী আনে বিএনপি সরকার। এরপর এই পদ্ধতির অধীনে ১৯৯৬ সালে সপ্তম, ২০০১ সালে অষ্টম এবং ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়।
২০০৪ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে অগণতান্ত্রিক ও সংবিধানবহির্ভূত আখ্যা দিয়ে আইনজীবী এম সলিমউল্যাহসহ তিন আইনজীবী হাইকোর্টে একটি রিট করেন। শুনানির পর তিন বিচারপতির বৃহত্তর বেঞ্চ ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট রায় দেন। রায়ে বলা হয়, ত্রয়োদশ সংশোধনী সংবিধানসম্মত ও বৈধ। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট। ওই বছর রিট আবেদনকারীরা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন। ২০১০ সালে আপিলে শুনানি শুরু হয়। সর্বোচ্চ আদালত এই মামলায় অ্যামিকাস কিউরি (আদালতকে সহায়তাকারী) হিসেবে দেশের আটজন সংবিধান বিশেষজ্ঞের বক্তব্য শোনেন। তাঁরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মত দেন। এমনকি সে সময়ের অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পক্ষে মত দেন। প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকসহ আপিল বিভাগে তখন সাতজন বিচারপতি ছিলেন। ছয় বিচারপতির তিনজনই অ্যামিকাস কিউরিদের পক্ষে একমত হন। এমন পরিস্থিতিতে প্রধান বিচারপতি হিসেবে এ বি এম খায়রুল হকের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে ২০১১ সালের ১০ মে রায় ঘোষণা করেন। সেই রায়টি ‘ত্রুটিপূর্ণ’ উল্লেখ করে গত বৃহস্পতিবার তা বাতিল করে দিয়েছেন সর্বোচ্চ আদালত। আইনজীবী, রাজনীতিবিদসহ দেশের সর্বস্তরের মানুষ তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ফেরানোর রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। তারা মনে করে, এর ফলে নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীন সরকারের কারচুপি করার সুযোগ বন্ধ হবে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী রায়কে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে এখন থেকে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আদলে রাষ্ট্র পরিচালনার অনুরোধ জানিয়েছেন। আমরা আশা করি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে ভবিষ্যতে আর কোনো ষড়যন্ত্র হবে না। জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী, সব জাতীয় নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়