উৎপল মণ্ডল, শ্যামনগর
উপকূলীয় অঞ্চলে একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, লবণাক্ততার বৃদ্ধি এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে জীবিকার সন্ধানে এলাকার বহু পুরুষ বাধ্য হয়ে দূরবর্তী ইটভাটায় কাজ করতে চলে যাচ্ছেন। এতে গ্রামে থেকে যাচ্ছে নারীরা—যাদের কাঁধে এখন পুরো সংসারের দায়িত্ব। সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সীগঞ্জ গ্যারেজ বাজারে সাপ্তাহে রবিবার ও বুধবার হাট বসে। গত সপ্তাহের এই দিন বিকেলে সেখানে বাজার করতে আসা আবাদচণ্ডিপুর গ্রামের মাসুরা খাতুন জানান, স্বামী-সন্তান মিলিয়ে তার সাতজনের সংসার। স্বামী এলাকায় থাকলে আমাকে এভাবে হাটে আসতে হতো না। এ সময় তার চোখে-মুখে সংকোচ ভেসে ওঠে। তিনি বলেন, আমার স্বামীই সব সময় বাজার করতেন। আমি শুধু ঘরের কাজ সামলাতাম। এখন আর সেই অবস্থা নেই। স্বামী ও ছেলেকে নিয়ে ঢাকার একটি ইটভাটায় চলে গেছে। এখন এই সংসারের সব আমাকেই সামলাতে হয়। একই বাজারে কথা হয় দক্ষিণ শ্রীফলকাটি গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ারা বেগমের (৩৬) সঙ্গে। তিনিও বাজারের ব্যাগ নিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনছিলেন। বললেন, আমার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে খুলনার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। মাসের পর মাস বাড়িতে থাকেন না। আগে আমি কখনো একা বাজারে আসিনি। এখন সবকিছু নিজেকেই করতে হয়। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লবণ-পানিতে চিংড়ি চাষের কারণে কৃষিজমি কমে যাওয়ায় এই অঞ্চলে কর্মসংস্থানের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে কাজের সন্ধানে পুরুষরা যখন বছরের অর্ধেকের বেশি সময় এলাকার বাইরে থাকেন, তখন সংসার থেকে শুরু করে বাড়ির বাইরের সব দায়িত্ব এসে পড়েছে নারীদের কাঁধে। আগে পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী ছিলেন পুরুষেরা। কিন্তু কৃষিতে লোকসান বাড়তে থাকায় তারা বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে গিয়ে ইটভাটায় শ্রমিক হিসেবে কাজ নিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে মাসের পর মাস বাড়ির বাইরে থাকতে হচ্ছে তাদের। অন্যদিকে, ঘরে থাকা নারীরা এখন শুধু গৃহস্থালি কাজই নয়, বাজার করা, সন্তানদের দেখাশোনা, এমনকি কৃষিজমিতে কাজ করাসহ সব দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। কেউ কেউ ছোটখাটো ব্যবসা বা হাঁস-মুরগি পালন করে আয় বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। স্থানীয়দের মতে, আশির দশকে অপরিকল্পিতভাবে লবণ-পানির চিংড়ি চাষ শুরু হলে এ অঞ্চলে ধীরে ধীরে কৃষিজমি কমে যেতে থাকে। একসময় যেখানে ধানসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন হতো, সেখানে এখন শুধুই চিংড়ির ঘের। এতে কৃষিনির্ভর শ্রমিকরা কাজ হারিয়ে ফেলেন। জীবিকার তাগিদে অনেককেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে গিয়ে ইটভাটা, নির্মাণ কিংবা পরিবহনশ্রমিক হিসেবে কাজ করতে হয়। একজন নারী মালতী রানী জানান, আগে কখনো বাজারে যাইনি। এখন সবকিছুই আমাকে করতে হচ্ছে চাল-ডাল কেনা থেকে শুরু করে জমির কাজ পর্যন্ত। শ্যামনগরের শ্রীফলকাটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জি এম নাজমুল হুসাইন বলেন, আগে উত্তরবঙ্গ থেকে শ্রমিকরা এখানে ধান কাটতে আসতেন। এখন আমাদের এলাকার মানুষই কাজের খোঁজে অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছে। স্থানীয় কৃষক সুধীর মণ্ডল জানান, বছরের প্রায় ছয় মাস অনেক পুরুষকে এলাকার বাইরে থাকতে হয়। বিশেষ করে অক্টোবর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত চলে এই মৌসুমী অভিবাসন (এলাকা পরিবর্তন)। শ্যামনগরসহ আশাশুনি ও কয়রা এলাকার প্রায় ৪০ শতাংশ শ্রমজীবী মানুষ এ সময় ইটভাটায় কাজ করতে যান। এ অবস্থায় মুন্সীগঞ্জ, হরিনগর, নওয়াবেঁকী, গাবুরা, কৈখালী, ভেটখালীর বাজারগুলোতে এখন নারীদের উপস্থিতি আগের চেয়ে অনেক বেশি। উপার্জনক্ষম ব্যক্তির উপস্থিতি বাড়িতে না থাকায় নারীরাই এখন বাজার করা, সন্তানের পড়াশোনা দেখা, এমনকি আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্বসহ সব কাজ সামলাচ্ছেন। লেখক গবেষক পীযুষ বাউলিয়া পিন্টু বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব উপকূলীয় কৃষিতে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি করছে। এর ফলে পেশায়ও পরিবর্তন আসছে, যেখানে পুরুষেরা বাইরের কাজে চলে যাচ্ছেন এবং নারীরা বাধ্য হয়ে বাড়ির কাজের পাশাপাশি খেতের ও বাজারের কাজ করছেন। তিনি আরও বলেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নারীদের জন্য প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ সুবিধা এবং বিকল্প কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি। পাশাপাশি কৃষিকে টেকসই করতে লবণসহিষ্ণু ফসল উৎপাদন ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া উচিত। স্থানীয় সমাজকর্মী শেখ কামরুজ্জামান বলেন, এলাকায় পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হলে মানুষকে পরিবার ছেড়ে দূরে যেতে হতো না। তার মতে, উপকূলীয় নারীদের এই পরিবর্তিত ভূমিকা একদিকে টিকে থাকার সংগ্রাম, অন্যদিকে সমাজ-অর্থনীতির গভীর সংকটের ইঙ্গিত বহন করে। উপকূলের এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় নারীরা হয়ে উঠছেন পরিবারের মূল ভরসা—সংসার থেকে বাজার, সবখানেই এখন তাদের দৃঢ় উপস্থিতি।

