৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ২১শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

হঠাৎ ঝড়ে লণ্ডভণ্ড মেহেরপুর, উদ্বিগ্ন কৃষক

মেহেরপুর প্রতিনিধি
মেহেরপুরে হঠাৎ ঝড় ও বজ্রবৃষ্টিতে গম, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বাম্পার ফলনের আশা থাকলেও সময়মতো পাকা গম কেটে ঘরে তুলতে না পারায় চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। কৃষকরা জানান, চলতি মৌসুমে গমের ফলন ভালো হলেও জ্বালানি তেলের সংকট ও হারভেস্টার মেশিন না পাওয়ার কারণে সময়মতো গম কাটতে পারেননি তারা। এর মধ্যেই গতকাল (৩০ মার্চ) রাত ৯টার দিকে আকস্মিক ঝড় ও বৃষ্টিতে মাঠের অধিকাংশ পাকা গম মাটিতে পড়ে গেছে। এতে গম ঘরে তোলা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কৃষকদের ভাষ্য মতে, গত বছর বিঘাপ্রতি গম কাটতে যেখানে খরচ হতো ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা, সেখানে চলতি মৌসুমে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকায়। তবুও পর্যাপ্ত হারভেস্টার মেশিন না পাওয়ায় অনেক কৃষক সময়মতো গম কাটতে পারেননি। ফলে ঝড়-বৃষ্টির আগেই ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় মাঠে লুটিয়ে পড়া গম দ্রুত সংগ্রহ করতে না পারলে তা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত অপরিপক্ব (নামলা) গমে ফলন বিপর্যয়ের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে পড়ে থাকা গম কাটতে অতিরিক্ত খরচ গুনতে হবে কৃষকদের। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ১৩ হাজার ১৬৫ হেক্টর জমিতে গমের আবাদ হয়েছে। ফলন ভালো হলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সময়মতো ফসল ঘরে তুলতে না পারার কারণে ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এদিকে কালবৈশাখী ঝড়ে গমের পাশাপাশি ভুট্টা ও কলা চাষিরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন। জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঝড় ও বৃষ্টির কারণে কিছু চাষির কলাগাছ নুয়ে পড়েছে। এছাড়া অপরিপক্ব (নামলা) ভুট্টা ক্ষেতের বেশিরভাগ গাছ মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে, যা ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা বাড়িয়েছে। যদিও আগাম (আগুড়ি) ভুট্টায় তেমন ক্ষতি না হলেও নমলা ভুট্টা চাষিরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচও ওঠার সম্ভাবনা কমে গেছে। জেলার ঢেপা-পাঙ্গাসী পাড়া গ্রামের গম চাষি শাহাদত হোসেন বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে চাষাবাদ করছেন, কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে আগে কখনও পড়েননি। তার গম বেশ কিছুদিন আগেই কাটার উপযোগী হয়েছিল। তবে হারভেস্টার মেশিন না পাওয়ায় সময়মতো গম কাটতে পারেননি। বর্তমানে অধিকাংশ কৃষকই শ্রম ও সময় বাঁচাতে মেশিনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। এরই মধ্যে গত রাতের ঝড়ে তার পাকা গম মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এখন সেই পড়া গম কাটতে অতিরিক্ত খরচ হবে। দ্রুত গম কাটতে না পারলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। নওয়াপাড়া গ্রামের গম চাষি নয়ন ইসলাম জানান, তার এবার এক বিঘা জমিতে গম রয়েছে। কিন্তু গম কাটার মেশিনের অভাবে এখনও তা কাটতে পারেননি। গত রাতের ঝড় ও বৃষ্টিতে ক্ষেতের সব গম মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। আবহাওয়া এমন থাকলে তিনি ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। সময়মতো গম কাটা-মাড়াই করে ঘরে তুলতে না পারায় তিনি এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে পড়েছেন বলেও জানান। কাঙ্ক্ষিত ফলন নিয়ে এখন দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তার। গাঁড়াডোব গ্রামের ভুট্টা চাষি রুস্তম জানান, তার ও তার ভাইয়ের পাশাপাশি জমিতে দুই বিঘা করে ভুট্টা চাষ করা হয়েছিল। কিন্তু গত রাতের ঝড়ে তাদের জমির প্রায় অর্ধেক ভুট্টা মাটির সাথে লুটিয়ে পড়ে। তিনি বলেন, অনেক খরচ ও পরিচর্যার পর মোচা আসার এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা। ফলে লোকসানের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারণ মাটিতে পড়ে যাওয়া গাছের অপরিপক্ব ভুট্টা থেকে আর কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যাবে না। জুগিন্দা গ্রামের ভুট্টা চাষি হৃদয় ইসলাম জানান, তাদের এক বিঘা জমিতে ভুট্টা রয়েছে, যেখানে গাছে কেবল মোচা আসা শুরু হয়েছে। এমন অবস্থায় গত রাতের ঝড়ে অধিকাংশ জমির ভুট্টা গাছ নুয়ে পড়েছে। এতে করে নুয়ে পড়া গাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যাবে না বলে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, এক বিঘা জমিতে তাদের ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু প্রত্যাশিত ফলন না পেলে সেই খরচও উঠে আসবে না। কলা চাষি রাজিব জানান, এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ক্ষতি না হলেও অধিকাংশ কলাগাছ বাঁকা হয়ে গেছে। গত রাতের ঝড়ে তার ৫-৬টি গাছ ভেঙেও পড়েছে। তবে আবহাওয়া স্বাভাবিক থাকলে বড় ক্ষতির আশঙ্কা নেই বলে তিনি মনে করেন। কিন্তু আবার যদি ঝড়-বৃষ্টি হয়, তাহলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন বলেও তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সঞ্জীব মৃধা জানান, কালবৈশাখী ঝড়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। প্রাথমিকভাবে কিছু ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে আগামী দুই একদিনের মধ্যে আবহাওয়া স্বাভাবিক হয়ে গেলে গমের বড় ধরনের ক্ষতি নাও হতে পারে। বিষয়টি অনেকটাই আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। অনুকূল আবহাওয়া ফিরে এলে ফসলের একটি পুনরুদ্ধার (রিকভারি) হওয়ার সুযোগ থাকে। তিনি আরও বলেন, ঝড়ে আক্রান্ত হওয়া ফসলের প্রকৃত ক্ষতির চিত্র সাধারণত দুই থেকে তিন দিন পর স্পষ্ট হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভুট্টা গাছ হেলে পড়লেও পরে আবার সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে। কৃষকরাও পরিচর্যা করে গাছ দাঁড় করানোর চেষ্টা করলে তা অনেক সময় সফল হয়। তাই ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ জানতে আরও কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হবে। এছাড়া, পাকা ভুট্টা মাটিতে পড়ে গেলেও তা সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা সম্ভব, ফলে এতে ফলনের বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে না। তবে হাতে গোনা দুই একজন চাষি ছাড়া কলা চাষিরা তেমন ক্ষতির সম্মুখীন হননি বলেও তিনি জানান।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়