৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

কপোতাক্ষ তীরে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্য চাকলা বাজার

উত্তম চক্রবর্তী, রাজগঞ্জ
যশোরের মনিরামপুর উপজেলার মশ্বিমনগর ইউনিয়নের কপোতাক্ষ নদের তীরে গড়ে ওঠা প্রাচীনতম চাকলা বাজার আজ বিলুপ্তির পথে। একসময় যে বাজারে জমজমাট হাট বসত, শতশত মানুষের পদচারণায় মুখর থাকত এলাকাজুড়ে, সেই ঐতিহ্যবাহী বাজার এখন পরিণত হয়েছে জনশূন্য, পরিত্যক্ত একটি স্থানে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, চাকলা বাজারের বয়স শত বছরেরও বেশি। কপোতাক্ষ নদের ঘাটকে কেন্দ্র করে এই বাজার এককালে ছিল এলাকার বাণিজ্যের প্রাণ কেন্দ্র। সপ্তাহের দুইদিন হাট বসত। তাজা সবজি, মাছ, মাংস, কাঁচামাল থেকে শুরু করে গৃহস্থালির নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছু মিলত এখানেই। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে হারিয়ে গেছে সেই কোলাহল। বাজারের ভাঙা-জীর্ণ দোকানঘরগুলো নিজ চোখে ইতিহাসের সাক্ষী হলেও নেই আর ক্রেতার ভিড়, নেই আগের সেই বেচাকেনার পরিবেশ। স্থানীয় দোকানদার মশিয়ার রহমান বলেন, একসময় হাটের দিন দোকান সামলাতে হিমশিম খেতে হতো। এখন দিনে দুই-চারজন ক্রেতা আসে, তাও শুধু গল্প করতে। বাজারের পুরনো রূপ আর নেই।বাজারটিতে এখনো রয়েছে সরকারী খাসজমি। প্রতি বছর নিয়ম অনুযায়ী ইজারা ডাকও হয়। তবে কার্যত বাজারটি আর সচল না থাকায় সরকারের এই পুরোনো বাজারটিকে টিকিয়ে রাখা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। মশ্বিমনগর ইউনিয়নের স্থানীয় ইউপি সদস্য সেলিম হোসেন জানান, চাকলা বাজার আমাদের ইউনিয়নের একটি ঐতিহ্য। কাঁঠালতলা বাজার গড়ে ওঠার পর লোকজন সেদিকেই ঝুঁকে পড়েছে। যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা এখন নতুন বাজারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। তবুও চাইলে চাকলা বাজারকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব। সরকারি উদ্যোগ, সংস্কার, নতুন ঘর নির্মাণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা হাশেম আলী বলেন, চাকলা বাজার শুধু বাজার ছিল না, এটি ছিল আমাদের মিলনমেলা। গ্রামের মানুষ এখানে এসে সামাজিক বন্ধন শক্ত করত। দেখলে মন খারাপ হয়। আরেক বাসিন্দা রুবেল হোসেন বলেন, পুরনো বিল্ডিংগুলো সংস্কার করে আবার হাট চালু করলে ক্রেতা ফিরবে। নদীর পাড়ে সুন্দর পরিবেশ- এটা পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তোলা যেত। অনেকে মনে করছেন, অবহেলা ও পরিকল্পনার অভাবে বাজারটির ঐতিহ্য ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। মাঠপর্যায়ে দেখা যায়, বাজারটিতে এখন মাত্র কয়েকটি দোকান সচল থাকলেও তেমনভাবে বেচাকেনা হয় না। জীর্ণপ্রায় সরকারি স্থাপনা, ভাঙা দোকানঘর ও নীরব পরিবেশ যেন বলে দেয় চাকলা বাজারের হারিয়ে যাওয়া অতীতের গল্প। স্থানীয়রা বলছেন- সরকারি উদ্যোগ, বাজার পুনর্নির্মাণ, আধুনিকীকরণ ও নতুন ব্যবসায়ীদের উৎসাহ দেওয়া হলে চাকলা বাজার আবারও তার অতীতের যৌলুস ফিরে পেতে পারে। এক প্রবীণ বাসিন্দার কথায়- চাকলা বাজারের ইতিহাস আছে, স্মৃতি আছে। এটাকে বাঁচিয়ে রাখা হোক। হারিয়ে যাক, সেটা দেখতে ভালো লাগে না। চাকলা বাজারের এই বিলুপ্তপ্রায় অবস্থা স্থানীয়দের জন্য শুধু একটি বাজার হারানোর গল্প নয়, বরং একটি ঐতিহ্য, একটি ইতিহাস হারানোর শঙ্কা।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়