ডা: সেলিনা সুলতানা
দেশের বিভিন্ন এলাকায় হাম-এর সংক্রমণ আবারও বাড়তে শুরু করেছে। জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি উদ্বেগজনক হলেও সঠিক সচেতনতা ও সময়মতো পদক্ষেপ নিলে এই ঝুঁকি অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে হাম মারাত্মক আকার নিতে পারে, তাই অভিভাবকদের সতর্কতা এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি, হাঁচি বা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে খুব সহজেই অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারে। বাতাসে এই ভাইরাস প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে—যা সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। ফলে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এর বিস্তার খুব দ্রুত ঘটে।
হামের লক্ষণ সাধারণত সংক্রমণের ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে প্রকাশ পায়। শুরুতে জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ লাল হওয়া—এসব উপসর্গ দেখা যায়। এরপর শরীরে লাল দানাদার ফুসকুড়ি ওঠে, যা প্রথমে মুখে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে গালের ভেতরে ছোট সাদা দাগ (কপলিক স্পট) দেখা যায়, যা হামের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। শিশুদের মধ্যে খাওয়ার অনীহা ও দুর্বলতাও লক্ষ্য করা যায়।তবে শুধু উপসর্গেই সীমাবদ্ধ নয়, হামের জটিলতাও ভয়াবহ হতে পারে। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানের সংক্রমণ, এমনকি মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) পর্যন্ত হতে পারে। অপুষ্টিতে ভোগা শিশু বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি।এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ হলো টিকাদান। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি অনুযায়ী শিশুকে ৯ মাস বয়সে প্রথম এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়া হয়। এছাড়া বিশেষ পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ডোজও দেওয়া যেতে পারে। যেসব শিশু এখনো হাম-রুবেলা (এমআর) টিকা পায়নি, তাদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা জরুরি।
একই সঙ্গে কিছু সাধারণ সতর্কতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশু হাম আক্রান্ত হলে তাকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখতে হবে, পরিচর্যাকারীকে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে এবং নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস বজায় রাখতে হবে। আক্রান্ত শিশুকে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে—নিজ থেকে কোনো ওষুধ দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। চিকিৎসার পাশাপাশি শিশুর সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করাও জরুরি। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার এবং শরীরের পানিশূন্যতা রোধে পর্যাপ্ত তরল ও ওরস্যালাইন দেওয়া প্রয়োজন। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে বুকের দুধ চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।হাম প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ—এটি মনে রাখা জরুরি। তাই আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা, সময়মতো টিকা এবং সঠিক পরিচর্যা। ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্র—সবাই মিলে উদ্যোগ নিলেই এই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
লেখক : কনসালটেন্ট: নিউরোডেভলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার এবং চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড পেডিয়াট্রিক ডিপার্টমেন্ট, বেটার লাইফ হসপিটাল। প্রাক্তন অটিজম বিশেষজ্ঞ: ঢাকা কমিউনিটি মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল।

