১৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ২৮শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

ছিনতাইকারীর হাতে রাজস্ব কর্মকর্তা খুন : আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে?

ড. হারুন রশীদ
রাতের পথ সবসময়ই কিছুটা অনিশ্চয়তার। কিন্তু সেই অনিশ্চয়তা যখন জীবনের নিশ্চয়তাকেই গ্রাস করে, তখন তা আর নিছক দুর্ঘটনা থাকে না—তা হয়ে ওঠে রাষ্ট্র ও সমাজের ব্যর্থতার নির্মম প্রতিচ্ছবি। চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লায় ফেরার পথে রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর হত্যাকাণ্ড আমাদের সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।একজন মানুষ, যিনি দিনের শেষে ঘরে ফিরছিলেন—তার প্রিয়জনদের কাছে, তার নতুন জীবনের কাছে। সদ্য বিবাহিত, সামনে ছিল অনেক স্বপ্ন, দায়িত্ব, ভালোবাসা। কিন্তু সেই ফেরাটা আর হলো না। বাস থেকে নামার পরই তিনি পড়ে গেলেন একদল ছদ্মবেশী ছিনতাইকারীর ফাঁদে—যারা মানুষ নয়, বরং মানুষের ছদ্মবেশে থাকা নিষ্ঠুরতার প্রতীক।
এই ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আমাদের জনপথের নিরাপত্তাহীনতার নগ্ন প্রকাশ। আমরা কি এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে রাত তো দূরের কথা, দিনের আলোতেও নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়? যেখানে একজন কর্মজীবী মানুষ নিজের গন্তব্যে পৌঁছাতেপারবে কিনা, তা ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে?
বুলেট বৈরাগীর মৃত্যুর বর্ণনা শোনার পর যে কেউ শিউরে উঠবে। তাকে সিএনজিতে তুলে মারধর করা হয়েছে, ছিনতাই করা হয়েছে, এবং শেষে চলন্ত সিএনজি থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এই নির্মমতা কোনো একক অপরাধীর নয়; এটি একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ সংস্কৃতির ফল—যেখানে অপরাধীরা জানে, ধরা পড়লেও বিচার পেতে সময় লাগবে, আর ভয়ভীতি দেখিয়ে তারা আবারও ফিরে আসতে পারবে।
প্রশ্ন হলো—এই দুষ্টচক্রের শেষ কোথায়? আমরা কেন বারবার একই ধরনের ঘটনার সাক্ষী হচ্ছি? আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় আসামিরা গ্রেফতার হয়েছে, এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু প্রতিটি ঘটনার পর যদি শুধু গ্রেফতার আর মামলা দায়েরেই আমরা সন্তুষ্ট থাকি, তাহলে কি এই অপরাধ বন্ধ হবে?
আমাদের ভাবতে হবে আরও গভীরে। কেন এই তরুণরা সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রে জড়াচ্ছে? বেকারত্ব, মাদকাসক্তি, সামাজিক অবক্ষয়—এসব কি তাদের এই পথে ঠেলে দিচ্ছে না? আবার একইসঙ্গে, আইন প্রয়োগ ও বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতা কি তাদের উৎসাহিত করছে না?
এই ঘটনার মানবিক দিকটি আরও বেদনাদায়ক। একজন মা তার একমাত্র সন্তানকে হারালেন। একজন স্ত্রী হারালেন তার জীবনসঙ্গীকে, যার সঙ্গে হয়তো ভবিষ্যতের অসংখ্য পরিকল্পনা ছিল। একটি পরিবার মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। এই শোকের ভার কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না।
আমরা প্রায়ই বলি—রাষ্ট্র আমাদের নিরাপত্তা দেবে। কিন্তু বাস্তবে, সেই নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত? মহাসড়ক, বাসস্ট্যান্ড, জনবিচ্ছিন্ন এলাকা—এসব জায়গায় নিরাপত্তা জোরদার করার দাবি কি নতুন? তবুও কেন প্রতিবারই এমন ঘটনার পর আমরা নড়েচড়ে বসি, তারপর আবার ভুলে যাই?
একের পর এক একই গল্প-
এই ঘটনা নতুন নয়। বরং গত কয়েক বছরে আমরা একই ধরনের অসংখ্য ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখেছি। মহাসড়ক, রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড কিংবা শহরের অন্ধকার গলি—সব জায়গাতেই একই চিত্র।
কিছু বছর আগে রাজধানীর উপকণ্ঠে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী রাতে বাস থেকে নামার পর নিখোঁজ হন। পরে তার মরদেহ পাওয়া যায় পাশের একটি ঝোপে। তদন্তে জানা যায়, তাকেও একইভাবে ছিনতাইকারীরা টার্গেট করে হত্যা করেছিল।
আরেকটি ঘটনায়, একটি গার্মেন্টস কর্মী রাতে ডিউটি শেষে বাসা ফেরার পথে অটোরিকশায় উঠেছিলেন। পরে তার ওপর হামলা চালিয়ে সবকিছু ছিনিয়ে নেওয়া হয়। তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও সারাজীবনের জন্য মানসিক ট্রমা নিয়ে বেঁচে আছেন।
এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটি বড় সমস্যার অংশ। এগুলো আমাদের বলে দেয়—অপরাধীরা কেবল সুযোগ খুঁজছে, আর সেই সুযোগ তৈরি হচ্ছে আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফাঁকফোকর থেকে।
অপরাধের পেছনের বাস্তবতা-
আমরা প্রায়ই ঘটনাগুলোর পর আবেগে প্রতিক্রিয়া জানাই, কিন্তু কারণগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করি না। কেন এই তরুণরা এমন ভয়াবহ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে?
বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক বৈষম্য একটি বড় কারণ। যখন একজন তরুণ কাজের সুযোগ পায় না, তখন সে সহজ অর্থ উপার্জনের জন্য অপরাধের পথে ঝুঁকতে পারে।
মাদকাসক্তি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাদকের বিস্তার তরুণ সমাজকে বিপথে ঠেলে দিচ্ছে। মাদকের নেশা মেটাতে তারা যে কোনো পর্যায়ে যেতে প্রস্তুত।
আইন প্রয়োগ ও বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতা। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা ধরা পড়লেও দ্রুত বিচার হয় না, ফলে তাদের মধ্যে ভয় কমে যায়। তারা মনে করে—ধরা পড়লেও কোনো না কোনোভাবে পার পাওয়া সম্ভব।
আমাদের সামাজিক অবক্ষয়। আমরা ধীরে ধীরে এমন এক সমাজে পরিণত হচ্ছি, যেখানে অন্যের বিপদে এগিয়ে আসার মানসিকতা কমে যাচ্ছে। পথের পাশে কেউ আক্রান্ত হলেও অনেকেই তা এড়িয়ে যায়—ঝামেলায় জড়াতে চায় না।
মানবিক ট্র্যাজেডি: একটি পরিবারের ভাঙন
রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর মৃত্যু শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। এটি একটি পরিবারের ভেঙে পড়ার গল্প।
একজন মা—যিনি তার একমাত্র সন্তানের জন্য অপেক্ষা করছিলেন—হঠাৎ করেই পেলেন তার মরদেহ। সেই মুহূর্তের কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
একজন নববিবাহিত স্ত্রী—যিনি হয়তো জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করেছিলেন—হঠাৎ করেই হয়ে গেলেন নিঃসঙ্গ। তার ভবিষ্যৎ, তার স্বপ্ন, তার নির্ভরতার জায়গা—সবকিছু মুহূর্তেই হারিয়ে গেল।
আমরা যখন এই ঘটনাগুলো সংবাদ হিসেবে পড়ি, তখন হয়তো কিছুক্ষণ শোক প্রকাশ করি, আবেগ মথিত হই, তারপর আবার দৈনন্দিন জীবনে ফিরে যাই। কিন্তু যাদের জীবন ভেঙে যায়, তাদের জন্য এই শোক কখনোই শেষ হয় না।
নিরাপত্তাহীনতার সংস্কৃতি-
বাংলাদেশে জনপথের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। মহাসড়কে ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণ—এসব যেন এক ধরনের নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
রাতের বেলা দূরপাল্লার যাত্রীরা বিশেষভাবে ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। বাস থেকে নামার পর তাদের জন্য কোনো নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে বাসস্ট্যান্ডগুলোই অপরাধীদের জন্য সহজ টার্গেট জোনে পরিণত হয়েছে। এমনকি শহরের ভেতরেও নিরাপত্তা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সিসিটিভি ক্যামেরা, পুলিশ টহল—এসব থাকা সত্ত্বেও অপরাধীরা নানা কৌশলে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
কী করা জরুরি?
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ অসম্ভব নয়, তবে এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ।
মহাসড়ক ও বাসস্ট্যান্ডে নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। নিয়মিত টহল, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
গণপরিবহনে যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বাস থেকে নামার পর যাত্রীরা যেন নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে, সে বিষয়ে পরিকল্পনা থাকা জরুরি।
দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীরা যেন বুঝতে পারে—অপরাধ করলে শাস্তি অনিবার্য। সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে সিএনজি বা অন্যান্য ভাড়ার যানবাহনে ওঠার ক্ষেত্রে যে অসতর্কতা আমরা প্রায়ই করি, সেটিই অনেক সময় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সচেতনতা এখানে বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন। আমরা অনেকেই তাড়াহুড়োর কারণে গাড়ির নম্বর দেখি না, চালকের পরিচয় যাচাই করি না, কিংবা কোথায় যাচ্ছি তা পরিবারের কাউকে জানাই না। অথচ এই ছোট ছোট বিষয়গুলোই জীবন রক্ষা করতে পারে। একটি গাড়িতে ওঠার আগে অন্তত গাড়ির নম্বর প্লেটটি ফোনে সংরক্ষণ করা বা পরিচিত কাউকে পাঠিয়ে দেওয়া—এটি খুব সাধারণ কিন্তু কার্যকর একটি পদক্ষেপ।এছাড়া, একা গভীর রাতে অচেনা যানবাহনে ওঠা এড়িয়ে চলা উচিত। সম্ভব হলে রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ব্যবহার করা যেতে পারে, যেখানে চালকের তথ্য ও যাত্রার ট্র্যাকিং থাকে। জরুরি প্রয়োজনে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেল্পলাইন নম্বরও হাতে রাখা দরকার। মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে।
আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে?
বুলেট বৈরাগীর মৃত্যু আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরে—আমরা কি সত্যিই নিরাপদ? উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামোগত অগ্রগতি—এসবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যদি একজন মানুষ নিরাপদে বাড়ি ফিরতে না পারে, তাহলে সেই উন্নয়নের মূল্য কতটুকু? একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য তার নাগরিকদের নিরাপত্তায়। যদি সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে সব অর্জনই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। বুলেট বৈরাগীর মৃত্যু যেন আরেকটি পরিসংখ্যান হয়ে না যায়। এটি আমাদের বিবেককে নাড়া দিক, আমাদের চিন্তা করতে বাধ্য করুক।
আমরা যেন এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারি, যেখানে একজন মানুষ নিশ্চিন্তে পথে বের হতে পারে, নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারে। যেখানে কোনো মা তার সন্তানের জন্য দুশ্চিন্তায় রাত জাগবেন না, কোনো স্ত্রী হঠাৎ করে তার জীবনের আলো হারাবেন না।
প্রশ্নটি এখন আমাদের সবার—আমরা কি এই পরিবর্তন চাই? নাকি পরবর্তী বুলেট বৈরাগীর জন্য অপেক্ষা করব?
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়