রাজধানীতে চার দেয়ালের মাঝে বেড়ে উঠছে শিশুরা। তাদের জন্য নেই প্রয়োজনীয় খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান। যেসব পার্ক রয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগই বেদখল ও মাদকসেবীদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। আবার কিছু পার্ক ময়লা-আবর্জনার স্তূপে পরিত্যক্ত হয়ে আছে, সেখানে শিশু-বৃদ্ধ কারো যাওয়ার সুযোগ নেই।
পুরান ঢাকা থেকে মোহাম্মদপুর, লালমাটিয়াসহ সর্বত্র প্রায় একই চিত্র।
খবরে বলা হয়েছে, মোহাম্মদপুর টাউন হল শহীদ পার্কে সন্ধ্যা নামতেই বসে মাদকসেবীদের আড্ডা। এলাকায় ছয়টি মাঠ থাকলেও মাত্র দুটি কিছুটা ব্যবহারযোগ্য। বাকিগুলো বখাটেদের দখলে, নয়তো বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত লালমাটিয়ায় তিনটি মাঠ থাকলেও মূলত একটি ব্যবহারযোগ্য। বাংলামোটর সংলগ্ন পান্থকুঞ্জের বড় অংশে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণসামগ্রী রাখা হয়েছে। পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, প্রকল্পের নামে পার্কটির বড় সবুজ এলাকা ধ্বংস করা হয়েছে।পার্ক ও খেলার মাঠ নিয়ে সবচেয়ে উদ্বেগের চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) গবেষণায়।
এতে দেখা গেছে, রাজধানীতে ২৩৫টি খেলার মাঠ থাকলেও সাধারণের জন্য উন্মুক্ত মাত্র ৪২টি। গত তিন দশকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় সবুজ অঞ্চল কমেছে ৬৬ শতাংশ। একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে কংক্রিটের জঙ্গল, কমেছে জলাশয় ও গাছ লাগানোর খালি জমি।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতিজনের জন্য অন্তত ৯ বর্গমিটার খোলা স্থান থাকা উচিত। সেখানে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে মাথাপিছু খোলা জায়গা এক বর্গমিটারেরও কম।
এই দমবন্ধ পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে নগরীর বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যের ওপর। বিশেষ করে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। জানা গেছে, গ্রামের চেয়ে শহরের শিশুরা দিনের বড় অংশ মোবাইলের স্ক্রিনে কাটায়। প্রায় ২৯ শতাংশ শিশুর মোবাইল আসক্তি গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছেছে। ৯২ শতাংশ অভিভাবকের অভিযোগ, খেলার জায়গার অভাবেই আজকের এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
২০০০ সালের ‘খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন’ অনুযায়ী কোনো মাঠ বা পার্ক ভাড়া, ইজারা বা অন্য কাজে ব্যবহার করা যাবে না। সংগত কারণেই প্রশ্ন আসে, এই আইনের প্রয়োগ কোথায়? রাজধানীর পার্কগুলোতে যে অসুস্থ পরিবেশ, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চোখে পড়ছে না। তাদের এমন উদাসীনতার অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে জনজীবনে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, ‘মাঠ-পার্ক দখলদারদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। ঈদের পর পদক্ষেপ দৃশ্যমান হবে।’ তাঁর প্রতিশ্রুতির যথাযথ বাস্তবায়ন হোক। সর্বোপরি নগরীর বাসিন্দাদের জন্য পার্কগুলোর প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা হোক—এটিই কাম্য।

