প্রতিদিনের ডেস্ক:
১৪ দলীয় জোটের শরিক হিসেবে চব্বিশের জুলাই আন্দোলন দমনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর সহযোগী, বল প্রয়োগে উসকানি এবং কুষ্টিয়ায় আন্দোলন দমনে ফোনকলের পর ছয়জনকে হত্যার অভিযোগে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শুনানি শেষ হয়েছে।বৃহস্পতিবার (১৪ মে) শুনানি শেষে রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ রেখেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।আদালতে প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। আসামিপক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী।এর আগে ২৫ সেপ্টেম্বর আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। ৩৯ পৃষ্ঠার অভিযোগের সঙ্গে রয়েছে এক হাজার ৬৭৯ পৃষ্ঠার নথিপত্র।রয়েছে তিনটি অডিও ও ছয়টি ভিডিও ডকুমেন্ট। এ মামলায় একমাত্র আসামি করা হয়েছে হাসানুল হক ইনুকে।আটটি অভিযোগে আন্দোলনকারীদের ‘বিএনপি-জামায়াত’, ‘সন্ত্রাসী’সহ সাম্প্রদায়িক ট্যাগ দেওয়া এবং তাদের বিরুদ্ধে বল প্রয়োগের উসকানি, ১৪ দলীয় জোট সরকারের অংশীদার জাসদের সভাপতি হিসেবে নিজের ঊর্ধ্বতন অবস্থান থেকে সরাসরি সম্পৃক্ত থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের নির্দেশ, প্ররোচনা, উসকানি এবং সহায়তা, কুষ্টিয়ায় পুলিশ সুপারকে ফোনকল করে আন্দোলন দমনের নির্দেশনার পর ছয়জনকে হত্যার কথা বলা হয়েছে।
বিদেশি মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার
মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, হাসানুল হক ইনু ঊর্ধ্বতন অবস্থানে থেকে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই একটি বিদেশি গণমাধ্যমে আন্দোলন দমনে এবং আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী, সাম্প্রদায়িক ট্যাগ প্রদান করেন এবং তাদের বিরুদ্ধে বল প্রয়োগের উসকানি দেন।
১৪ দলের সভায় হাজির থেকে উসকানি
অভিযোগপত্রে বলা হয়, আন্দোলন চলাকালে ১৯ জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে এবং জাসদ প্রধান আসামি হাসানুল হক ইনুর উপস্থিতিতে ১৪ দলীয় জোটের সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় কোটা সংস্কার ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে কঠোর থেকে কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্দেশ্যে সমগ্র দেশব্যাপী সেনা মোতায়েনপূর্বক কারফিউ জারির মাধ্যমে আন্দোলনরত নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতাকে দমনের জন্য সর্বোচ্চ বল প্রয়োগের সিদ্ধান্ত কার্যকর করার জন্য ‘শুট অ্যাট সাইট’ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। পরে তা বাস্তবায়নের জন্য দেশব্যাপী সেনা মোতায়েন করে নিরীহ-নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের দেখা মাত্র গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং তা সরকার কার্যকর করে। এই নির্দেশের সঙ্গে আসামি হাসানুল হক ইনু ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোট সরকারের অংশীদার জাসদের সভাপতি হিসেবে তার ঊর্ধ্বতন অবস্থান থেকে সরাসরি সম্পৃক্ত থেকে উক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন, প্ররোচনা দিয়েছেন, উসকানি দিয়েছেন এবং সহায়তা করেছেন।
কুষ্টিয়ার এসপিকে ফোনকল
অভিযোগে বলা হয়, ২০ জুলাই দুপুরে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে হাসানুল হক ইনু তার নিজ জেলা কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোনকল দিয়ে আন্দোলনকারীদের ছবি দেখে তালিকা প্রণয়ন ও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন এবং পূর্বের নির্যাতনকে অনুমোদন করেন। এই নির্দেশনা অনুযায়ী কুষ্টিয়া জেলা পুলিশ সুপারের অধীনস্থ পুলিশ বাহিনী এবং ১৪ দলীয় জোটের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী ৫ আগস্ট পর্যন্ত কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি বর্ষণ করে। এই গুলি বর্ষণে শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, বার্মিজ গলিতে সুরুজ আলী বাবু, হরিপুরগামী রাস্তা আড়ংয়ের সামনে শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, মো. উসামা, তুলা পট্টির গলিতে ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও ফায়ার সার্ভিসের বিপরীত দিকে রাস্তার ওপর চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ নিহত হন। রাইসুল হকসহ অসংখ্য নিরীহ-নিরস্ত্র আন্দোলনরত ছাত্র-জনতা আহত হন, অনেককে আটক করে নির্যাতন করা হয়।
আন্দোলন দমনে শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনালাপ
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, হাসানুল হক ইনু সার্বক্ষণিক শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে আন্দোলন দমনে লেথাল উইপন (প্রাণঘাতী অস্ত্র) ব্যবহার করে আন্দোলন দমনের লক্ষ্যে আন্দোলনকারীদের ঘেরাও করে ছত্রীসেনা (প্যারাট্রুপার) নামিয়ে হেলিকপ্টার ব্যবহার করে তাদের গুলি করে হত্যা, বোম্বিং করে হত্যা, আটক ও নির্যাতনের ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা, উসকানি প্রদান করেন। তারই অংশ হিসেবে তিনি ২০ জুলাই দুপুরে আন্দোলন দমনে লেথাল উইপন ব্যবহার, আন্দোলনকারীদের ঘেরাও করে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে বোম্বিং করে ও ছত্রীসেনা নামিয়ে হত্যাসহ আন্দোলন দমনে গুলি বর্ষণসহ শেখ হাসিনার গৃহীত পদক্ষেপ অনুমোদন করেন এবং তা কার্যকর করার জন্য শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে ওই পদক্ষেপ বাস্তবায়নে ষড়যন্ত্র, সহায়তা ও সম্পৃক্ত ছিলেন।
গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার
২৭ জুলাই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু একটি টিভি চ্যানেলে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী, জঙ্গি ইত্যাদি সাম্প্রদায়িক ট্যাগ প্রদান করে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। সেই সঙ্গে সরকারের জারি করা কারফিউ এবং লেথাল উইপন ব্যবহার করে হত্যাকাণ্ড সংঘটনসহ নির্যাতন-নিপীড়নকে কৌশলে সমর্থন করেন।
হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের বৈধতা
২৯ জুলাই শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের সভায় জোটের অন্যতম শরিক ১৪ দল জাসদের প্রধান আসামি হাসানুল হক ইনু নিজে উপস্থিত থেকে আন্দোলনকে দমন ও ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক ট্যাগ প্রদান করেন। আসামি হাসানুল হক ইনু একটি রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত প্রস্তাবের মাধ্যমে বাস্তবায়নে নির্দেশ দিয়ে, প্ররোচনা দিয়ে, উসকানি দিয়ে এবং সহায়তা করার মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলীয় জোটের সশস্ত্র ক্যাডার কর্তৃক পরিচালিত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনকে বৈধতা দেন।
সার্বক্ষণিক শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা
হাসানুল হক ইনু সার্বক্ষণিক শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে আন্দোলন দমনে কারফিউ স্থায়ী করে দেখা মাত্র গুলি করে হত্যা, লেথাল উইপনের ব্যবহার করে আন্দোলন দমনে নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতাকে জঙ্গি তকমা দিয়ে গুলি করে হত্যা, আটক ও নির্যাতনের ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা, উসকানি এবং নির্দেশ দিতে থাকেন। তারই অংশ হিসেবে তিনি ৪ আগস্ট আন্দোলন দমনে কারফিউ জারি করে গুলি বর্ষণসহ শেখ হাসিনার গৃহীত পদক্ষেপ অনুমোদন করেন এবং তা কার্যকর করার জন্য শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে ওই পদক্ষেপ বাস্তবায়নে ষড়যন্ত্র, সহায়তা ও সম্পৃক্ত ছিলেন এবং তার অধীনস্থ দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেন।
কুষ্টিয়ায় ৬ জনকে হত্যা
৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার কোটা সংস্কার ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে ছাত্রদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে কুষ্টিয়া জেলার সর্বস্তরের জনতার সঙ্গে নিরীহ-নিরস্ত্র শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, মো. উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ রাস্তায় নেমে আসেন। তারা সকাল ১০টার দিকে কুষ্টিয়ার হাজার নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতা হাসপাতাল মোড়ে জড়ো হয়ে সেখান থেকে চৌড়হাস থেকে মজমপুরের দিকে শান্তিপূর্ণভাবে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুগত অধস্তন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক সংসদ সদস্য মো. মাহবুবউল আলম হানিফ, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম নেতা জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর সভাপতি সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা এবং নির্দেশের প্রেক্ষিতে কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. সদর উদ্দিন খান, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. আসগর আলী এবং কুষ্টিয়া শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং কুষ্টিয়া সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মো. আতাউর রহমান আতাদের নির্দেশে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গসংগঠনের সন্ত্রাসী অজয় সুরেখা, মানব চাকী, আতিকুর রহমান অনিক, শেখ হাফিজ চ্যালেঞ্জ, রাশিদুল ইসলাম বিপ্লব, তৈয়ব বাদশা, তাইজাল আলী খান, স্বপন কুমার গং পুলিশের ছত্রচ্ছায়ায় (কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশের সঙ্গে একত্রে) নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর শহরের বিভিন্ন স্থানে গুলি চালাতে থাকেন। তাদের এই গুলি বর্ষণের ফলে দুপুর দেড়টা থেকে চারটার মধ্যে বক চত্বর থেকে অনুমান ৫০ গজ উত্তরে শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, বার্মিজ গলিতে সুরুজ আলী বাবু, হরিপুরগামী রাস্তা আড়ংয়ের সামনে শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুত্তাকিন, মো. উসামা, তুলা পট্টির গলিতে ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও ফায়ার সার্ভিসের বিপরীত দিকে রাস্তার ওপর চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ শহীদ হন।

