ফারুক যোশী
ব্রিটেনে একসময় ধূমপানকে “ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার” বলাহতো। গাড়িতে সিটবেল্ট বাধ্যতামূলক করার বিরুদ্ধেও ছিল তীব্রআপত্তি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সমাজ বুঝেছে, রাষ্ট্রও আইনবানিয়েছে—এ দুটোই এখন আর ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়।কারণ কিছু প্রযুক্তি বা অভ্যাস ব্যক্তিগত সীমা ছাড়িয়ে জনস্বাস্থ্যকিংবা সামগ্রিক নিরাপত্তার প্রশ্ন হয়ে ওঠে। আর তাই এখনব্রিটেনের শীর্ষ চিকিৎসকেরা একই সতর্কবার্তা দিচ্ছেন শিশুদেরস্ক্রিন টাইম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের বিষয়ে।
যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বড় চিকিৎসক সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে গঠিতঅ্যাকাডেমি অব মেডিক্যাল রয়্যাল কলেজেস সম্প্রতি সরকারকেজানিয়েছে, শিশুদের অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার ও সামাজিকযোগাযোগমাধ্যম তাদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্যক্ষতিকর—এ বিষয়ে চিকিৎসকদের মধ্যে “অভূতপূর্ব ঐকমত্য” তৈরি হয়েছে। তারা শুধু উদ্বেগ প্রকাশ করেই থেমে থাকেনি; বরংচিকিৎসকদের নিয়মিতভাবে শিশুদের স্ক্রিন টাইম সম্পর্কেজিজ্ঞাসা করার সুপারিশ করেছে। এটি নিছক প্রযুক্তিবিরোধীআতঙ্ক নয়; বরং ডিজিটাল যুগে শিশুদের বেড়ে ওঠা নিয়ে গভীরসামাজিক উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ।
অদৃশ্য আসক্তির বিস্তার
আজকের শিশুর হাতে বইয়ের আগে পৌঁছে যাচ্ছে স্মার্টফোন।খেলাধুলার মাঠের জায়গা দখল করছে স্ক্রলিং স্ক্রিন। শিশুবলেন আর যুবক-বয়স্ক বলেন—তিনজন মানুষ একত্রে মিলিতহলেও তারা কেন জানি গল্পের চেয়ে মোবাইল ফোনকে প্রাধান্যদিয়ে আড্ডার আমেজকে অনেকটাই ফিকে করে তোলেন।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম শিশুর মনোযোগকেএমনভাবে আটকে রাখে, যা কেবল বিনোদন নয়—একধরনেরআচরণগত আসক্তিও তৈরি করে। অনন্ত স্ক্রল, অটোপ্লে ভিডিও, নোটিফিকেশন—সবকিছুই মানুষের মনস্তাত্ত্বিক পছন্দকে লক্ষ্যকরে নির্মিত।
ফলে শিশুরা ক্রমশ মনোসংযোগ হারাচ্ছে, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে, উদ্বেগ ও বিষণ্নতা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভার্চুয়ালস্বীকৃতির প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা শিশুদের আত্মমর্যাদাবোধকেদুর্বল করছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো—সহিংস, অশ্লীল বাআত্মবিধ্বংসী কনটেন্টে শিশুদের সহজ প্রবেশাধিকার রয়েছে। বহুক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, কিশোরদের মানসিক বিপর্যয়ের পেছনেঅনলাইন কনটেন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
“প্রমাণ নেই” যুক্তির সীমাবদ্ধতা
প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো প্রায়ই বলে—স্ক্রিন টাইমের ক্ষতির বিষয়েচূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো নেই। কিন্তু চিকিৎসকদের বক্তব্যভিন্ন। তারা বলছেন, প্রতিটি জনস্বাস্থ্য সংকটে নিখুঁত প্রমাণেরজন্য অপেক্ষা করলে ক্ষতি আরও গভীর হয়। ধূমপানের ক্ষতিকরপ্রভাবও একসময় “অপর্যাপ্ত প্রমাণ” বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।চিকিৎসকদের এই অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা প্রতিদিনশিশুদের বাস্তব পরিবর্তন দেখছেন। তারা গবেষণাগারের বাইরেরসমাজ দেখছেন—যেখানে শিশুদের ঘুম কমছে, সামাজিক সম্পর্কদুর্বল হচ্ছে, মনোযোগ ভেঙে পড়ছে। বিজ্ঞানের কাজ কেবলপরিসংখ্যান নয়; বাস্তবতার সতর্ক সংকেতও বিবেচনায় নেওয়া।
নিষেধাজ্ঞা কি সমাধান?
যুক্তরাজ্য এখন ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিকযোগাযোগমাধ্যম সীমিত করার বিভিন্ন উপায় বিবেচনা করছে।এর মধ্যে রয়েছে রাতের কারফিউ, কঠোরভাবে বয়স যাচাই, এমনকি অস্ট্রেলিয়ার মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধকরার ধারণাও। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকর হবে?
অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, শিশুরা অনেক সময় প্রযুক্তিগত ফাঁক ব্যবহার করে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে পারে। Ian Russell, যিনি অনলাইন নিরাপত্তাবিষয়ক দাতব্য সংস্থা Molly Rose Foundation-এর চেয়ারম্যান, ইতিপূর্বে বলেছেন—সরকারের উচিত নতুন করে “নিষেধাজ্ঞার মতো কঠোর ও ব্যাপক পদক্ষেপ” নেওয়ার বদলে বিদ্যমান আইনগুলো কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা। শিশু নিরাপত্তাবিষয়ক বিভিন্ন দাতব্য সংস্থার স্বাক্ষরিত এক খোলা চিঠিতে বলা হয়েছে, কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষার জন্য সরকারকে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে British Board of Film Classification (বিবিএফসি)-এর মানদণ্ড অনুসরণে বাধ্য করা উচিত। যুক্তরাজ্যের সিনেমায় মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রের বয়সভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস যেভাবে নির্ধারণ করা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষেত্রেও একই ধরনের উচ্চমানের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিবিএফসির প্রধান নির্বাহী David Austen বিবিসিকে বলেছেন, “ইতোমধ্যেই শত শত মিলিয়ন ওয়েবসাইট আমাদের মানদণ্ড অনুযায়ী শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটররা সেগুলো ফিল্টার করছে।” তিনি আরও বলেন, “তাহলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলো তাদের কনটেন্টের ক্ষেত্রে একই কাজ করতে পারবে না কেন? উত্তর হলো—অবশ্যই পারবে।” তবে যুক্তরাজ্যে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ বা সীমিত করার সরকারি প্রস্তাবের বিষয়ে কোন কোন প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
অর্থাৎ শুধু আইন নয়, প্রয়োজন ডিজিটাল সংস্কৃতির পরিবর্তন।পরিবার, স্কুল, রাষ্ট্র ও প্রযুক্তি কোম্পানিকে সমন্বিতভাবে কাজকরতে হবে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো তাদের ভিউয়ারশিপ বাড়াতে, অর্থাৎ ব্যবসা সম্প্রসারণের স্বার্থে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহারেরপক্ষে নানা যুক্তি তুলে ধরতেই পারে। কিন্তু আমরা তো এরফলাফল দেখছি। আগেই উল্লেখ করেছি, বইয়ের জায়গাটাঅনেকাংশে দখল করে নিয়েছে এই মাধ্যম।
তবে শিশুকে ফোন থেকে দূরে রাখতে চাইলে তাকে বিকল্প জগৎওদিতে হবে—খেলাধুলা, বই, শিল্পচর্চা, পারিবারিক সময় ও বাস্তবসামাজিক সম্পর্ক।
প্রযুক্তি কোম্পানির নৈতিক দায়
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সম্ভবত এখানে—প্রযুক্তিকোম্পানিগুলোর দায় কতটুকু? যখন কোনো প্ল্যাটফর্ম এমনভাবেডিজাইন করা হয়, যাতে ব্যবহারকারী দীর্ঘসময় আটকে থাকে, তখন সেটি কেবল প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নয়; এটি মানুষেরমনস্তত্ত্বের বাণিজ্যিক ব্যবহার। শিশুদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরওসংবেদনশীল।
একসময় সিগারেট কোম্পানিগুলোও জানত, তাদের পণ্যক্ষতিকর। তবু তারা ব্যবসা চালিয়ে গেছে। আজ সামাজিকযোগাযোগমাধ্যম নিয়ে “বিগ টোব্যাকো” তুলনা তাই একেবারেঅমূলক নয়। প্রযুক্তি যদি মানুষের জীবনকে উন্নত করার বদলেশিশুদের মানসিক স্থিতি দুর্বল করে, তবে সেটি কেবল বাজারেরবিষয় থাকে না; সেটি রাষ্ট্রীয় নীতি ও জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের জন্যও হতে পারে :
বাংলাদেশেও শিশু-কিশোরদের মধ্যে স্মার্টফোননির্ভরতা দ্রুতবাড়ছে। শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই ইউটিউব, টিকটক, ফেসবুকও গেমিং এখন দৈনন্দিন বাস্তবতা। অথচ এ বিষয়ে জাতীয়পর্যায়ে সুসংগঠিত গবেষণা, নীতিমালা বা জনসচেতনতা এখনোসীমিত।
আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ডিজিটাল সাক্ষরতারপাশাপাশি “ডিজিটাল সংযম” শেখানো জরুরি। অভিভাবকদেরওবুঝতে হবে—শিশুর হাতে ফোন তুলে দেওয়া সাময়িক স্বস্তি দিলেওদীর্ঘমেয়াদে তা মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।প্রযুক্তি থেকে শিশুদের বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই।প্রয়োজন প্রযুক্তির মানবিক ব্যবহার নিশ্চিত করা। কারণভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় লড়াই হয়তো প্রযুক্তির বিরুদ্ধে নয়—প্রযুক্তির অমানবিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে।
লেখক : ব্রিটেনপ্রবাসী কলামিস্টে

