আনিছুর রহমান, বেনাপোল
যশোরের শার্শা উপজেলার বেনাপোল সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক ঠেলে পাঠানো (পুশইন) দশজন নারী, পুরুষ ও শিশু দ্বিতীয় দিনের মতো ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের শূন্যরেখায় (জিরো লাইন) অবস্থান করছে। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও মঙ্গলবার (২ জুন) দুপুর পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সমাধান না হওয়ায় মানবেতর পরিস্থিতিতে দিন কাটছে তাদের। মঙ্গলবার বিকেলে যশোর-৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি সীমান্তে দায়িত্ব পালনরত বিজিবি সদস্যদের সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন এবং সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। স্থানীয় ও বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, রোববার (৩১ মে) গভীর রাতে ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার জয়ন্তীপুর সীমান্ত এলাকা থেকে কাঁটাতারের গেট খুলে দশজন নারী, পুরুষ ও শিশুকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে আগে থেকেই সতর্ক অবস্থানে থাকা বিজিবি সদস্যরা তা প্রতিহত করলে তারা সীমান্তের জিরো লাইনে আটকে পড়ে। দ্বিতীয় দিনের মতো খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করায় তাদের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ওই দলের মধ্যে নয় মাস বয়সী একটি শিশুও রয়েছে বলে জানা গেছে। খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে তাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটছে বলে সীমান্ত সূত্রে জানা গেছে। তবে তারা ভারতীয় অংশে অবস্থান করায় বিজিবির পক্ষে সরাসরি কোনো সহায়তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিএসএফ তাদের খাদ্য বা চিকিৎসা সহায়তা দিচ্ছে কি না, সে বিষয়েও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। একাধিক সূত্র জানায়, গত শনিবার সন্ধ্যায় কয়েকটি ট্রাকে করে অতিরিক্ত বিএসএফ সদস্যের উপস্থিতিতে প্রায় ১২০ জন নারী, পুরুষ ও শিশুকে সীমান্ত এলাকায় নিয়ে আসা হয়। পরে তাদের ছোট ছোট দলে ভাগ করে বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়। প্রথমে বেনাপোলের সাদিপুর-রঘুনাথপুর সীমান্তের বিপরীতে ভারতের জয়ন্তীপুর এলাকা দিয়ে পুশইনের চেষ্টা চালানো হয়। বিজিবির বাধার মুখে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হলে রাতভর সীমান্তের বিভিন্ন কাঁটাতারের গেট ব্যবহার করে একাধিকবার একই চেষ্টা চালায় বিএসএফ। অভিযোগ রয়েছে, পুশইনের সময় সীমান্ত এলাকার কয়েকটি সার্চলাইটও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিজিবির বাড়তি টহল, সার্চলাইট, মাইকিং ও সতর্ক নজরদারির কারণে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি বিএসএফ। পরে রাত প্রায় সাড়ে ৩টার দিকে সীমান্ত পিলার ১৯/এস-৬ এর কাছে দশজন নারী, পুরুষ ও শিশুকে কাঁটাতারের বেড়ার কাছে নিয়ে আসা হলেও তারা বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে পারেনি। এরপর থেকেই তারা ভারতের জয়ন্তীপুর সীমান্তসংলগ্ন জিরো লাইনে একটি গাছের নিচে অবস্থান করছে। ঘটনার পর বেনাপোলসহ আশপাশের সীমান্ত এলাকায় বিজিবি সতর্কতা ও টহল জোরদার করেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন করতে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে মাইকিংও করা হচ্ছে। যশোর-৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান বলেন, বিএসএফের ঠেলে পাঠানো নারী-পুরুষ ও শিশুদের অবস্থানস্থল আমি এবং আমার জওয়ানরা মঙ্গলবার দুপুরে পরিদর্শন করেছি। সোমবার সন্ধ্যায় বিএসএফ ও বিজিবির মধ্যে একটি পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু কোনো সমাধান ছাড়াই বৈঠক শেষ হওয়ায় দশজন নারী-পুরুষ ও শিশু দ্বিতীয় দিনের মতো ভারতের জয়ন্তীপুর সীমান্তের জিরো লাইনে অবস্থান করছে। তিনি বলেন, বিজিবি আন্তর্জাতিক আইন ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নীতিমালা অনুসরণ করে দায়িত্ব পালন করছে। যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে সীমান্ত দিয়ে ঠেলে পাঠানোর সুযোগ নেই। বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধানে আমরা কূটনৈতিক ও সীমান্ত পর্যায়ের সব ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছি। বিজিবি’র একাধিক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, বেনাপোলসহ দেশের বিভিন্ন সীমান্তে এর আগেও একাধিকবার পুশইনের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে ভারত থেকে কথিত বাংলাদেশি পরিচয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুদের সীমান্তে এনে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিজিবির বাধার মুখে তারা জিরো লাইনে আটকে পড়ে এবং পরে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি হয়। সম্প্রতি ভারতজুড়ে অবৈধ অভিবাসী শনাক্তকরণ ও অভিযান জোরদার হওয়ার পর সীমান্ত এলাকায় পুশইনের আশঙ্কা বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ কারণে যশোর-৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়ন বেনাপোল সীমান্তসহ জেলার সব সীমান্ত পয়েন্টে নজরদারি বাড়িয়েছে।

