জি বি এম রুবেল আহম্মেদ
জ্যৈষ্ঠ মাস। গ্রীষ্ম যেন বিদায়ের আগে শেষ উত্তাপ ছড়িয়ে দিচ্ছে চারদিকে। গাছে মধুমাখা ফল পেকে আছে। কয়েক বছর পর এবার জ্যৈষ্ঠের শুরু থেকেই কালবৈশাখীর দাপট। তেরো তারিখে গ্রাম্যভাষায় যাকে বলে ‘ত্যারাব্যারা’ অবস্থা হয়ে গেল। প্রচণ্ড ঝড়ে আধাপাকা টিনের ঘর উড়ে গেছে। গাছ ভেঙে টিনের চালসহ অর্ধশতাধিক ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৃষ্টির ফোঁটা পড়লেই লোডশেডিং। ঝড় হলে তো পুরো এলাকা দুই-এক দিন বিদ্যুৎবিহীন থাকে।
ভরদুপুরে বিরতিতে অরুণ কুমার একা হাঁটছে। ট্রেনিং করতে বগুড়ায় এসেছে দুদিন হলো। এক ব্যাচে মোট বিশজন–দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এসেছে। সেখানেই প্রথম দেখায় অরুণের দৃষ্টি কাড়ে প্রিয়াঙ্কা দাশ। অরুণ ভীষণ লাজুক। দুদিন পেরিয়ে গেলেও প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে পরিচিত হতে পারেনি। সে আর নাজিম একই রুমে উঠেছে। বিকেলে বগুড়া শহরে ঘুরতে বের হবে তারা। গেটে এসে অরুণ নাজিমকে বলল, ‘আপনার সঙ্গে পরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলব।’
নাজিমের আর ধৈর্য ধরছে না। সে সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘কী কথা? এখনই বলেন।’
কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে নাজিম। অরুণ কিছুক্ষণ ইতস্তত করল। চারপাশে দুপুরের রোদ যেন গলে গলে পড়ছে।
দূরের কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে কয়েকজন রিকশাওয়ালা অলস ভঙ্গিতে বসে আছে। বাতাসে কাঁঠালের মিষ্টি গন্ধ। পায়ের নিচে টসটসে একটি হলুদ পাকা আম পড়ে আছে। অরুণ সেটা কুড়িয়ে নিয়ে নাজিমের হাতে দিলো। নিচু স্বরে বলল, ‘আচ্ছা, প্রিয়াঙ্কা দাশ সম্পর্কে কিছু জানেন?’
নাজিম প্রথমে চুপ করে থাকল। তারপর হো হো করে হেসে উঠল—‘এই কথা! আমি তো ভাবলাম কী না কী!’
অরুণ অপ্রস্তুত হয়ে গেল—‘না মানে… এমনি জানতে চাইলাম।’
নাজিম দুষ্টুমি ভরা চোখে তাকিয়ে বলল, ‘দুদিন ধরে দেখছি, ক্লাসে ঢোকার আগে আপনি একবার দরজার দিকে তাকান, বের হওয়ার সময়ও তাকান। ব্যাপারটা বুঝতে আমার বেশি সময় লাগেনি।’
অরুণ লজ্জায় মাথা নিচু করল। গরমের মধ্যেও তার কপালে চিকচিক ঘাম জমেছে।
নাজিম এবার গম্ভীর হলো—‘প্রিয়াঙ্কা খুলনা থেকে এসেছে। খুব ভদ্র মেয়ে। সবার সঙ্গে সহজে মেশে, সব সময় হাসিখুশি থাকে। আপনি চাইলে আমি পরিচয় করিয়ে দিতে পারি।’
অরুণ কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল, ‘হ্যাঁ, কিন্তু সাহস পাই না।’
ঠিক তখনই হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। আশেপাশের দোকান থেকে বিরক্তির শব্দ ভেসে এলো—‘আবার কারেন্ট নাই!’
গরম বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। দূরে কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে, বিকেলের আগেই আবার ঝড় নামবে।
নাজিম হালকা হেসে অরুণের কাঁধে হাত রাখল—‘জীবনে সবকিছু এত ভয় পেলে চলে? চলেন, আজ সন্ধ্যায় শহরে গিয়ে অন্তত পরিচয়টা করে ফেলবেন।’
অরুণ কিছু বলল না। শুধু দূরের জমে ওঠা কালো মেঘের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হচ্ছিল, আকাশের ভেতরেও বুঝি কোনো অদ্ভুত অস্থিরতা জমছে–ঠিক তার বুকের ভেতরের মতো।
প্রায় পাঁচদিন কেটে গেল। বাকি আর মাত্র নয়দিন। তারপর সবাই যে যার কর্মস্থলে ফিরে যাবে। কিন্তু অরুণের মনে জমে আছে না বলা অনেক কথা। প্রশিক্ষণে তার মনোযোগ নেই। পেছনে বসে সারাক্ষণ প্রিয়াঙ্কার দিকে তাকিয়ে থাকে–যেন চাতক পাখি এক পসলা বৃষ্টির অপেক্ষায়। লাঞ্চের বিরতিতে সে ডাইনিংয়ে যায় না। সোজা চলে যায় নির্জন পুকুরপাড়ে। ডিনারের পর রাত বারোটা-একটা পর্যন্ত সেখানেই বসে থাকে। চোখেমুখে বিষণ্ণতার ছাপ। যেন অব্যক্ত কথাগুলো মেঘ হয়ে জমে আছে বুকের ভেতর। নাজিম ইদানীং তার কার্যকলাপ লক্ষ্য করছে। সে সিদ্ধান্ত নিলো, আজ সন্ধ্যায় অরুণ ও প্রিয়াঙ্কাকে নিয়ে বাইরে চায়ের আড্ডা দেবে।
তিনজন একসঙ্গে হাঁটছে, কিন্তু কেউ কিছু বলছে না। হঠাৎ অরুণের চোখে পড়ে অপূর্ব দৃশ্য। চায়ের স্টলের পাশেই সারি সারি বকুল গাছ। রাতের হালকা জোছনায় মনে হচ্ছে, থোকা থোকা ফল ধরে আছে। কিন্তু গভীরভাবে তাকিয়ে দেখা গেল– বাবুই পাখিরা পাতায় পাতায় ঘুমিয়ে আছে।
অরুণ বিস্মিত হাসিতে প্রিয়াঙ্কাকে বলল—‘ম্যাডাম, বলুন তো গাছে এগুলো কী?’
প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে এটাই তার প্রথম কথা। প্রিয়াঙ্কা অবাক হয়ে পাখিদের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মুগ্ধ কণ্ঠে বলল, ‘থ্যাংকস স্যার। এত সুন্দর একটা দৃশ্য দেখানোর জন্য।’নাজিম মুচকি হেসে বলল, ‘আপনার সঙ্গে অরুণ স্যার একটু আলাদা করে কথা বলতে চান। প্লিজ, চা হাতে একটু ওদিকে যাবেন?’
প্রিয়াঙ্কা মৃদু হাসিতে রাজি হয়ে গেল। লজ্জায় অরুণের হাত-পা কাঁপছে।
পাঁচ মিনিট পর ফিরে এলো তারা। কিন্তু অরুণ কিছুই বলতে পারেনি। শুধু প্রিয়াঙ্কার বংশপরিচয় বা গোত্র সম্পর্কে কিছু কথা জানল। এভাবেই প্রশিক্ষণের শেষ সময় ঘনিয়ে এলো। কাল রাতেই সবাই চলে যাবে। হাতে আর মাত্র একদিন। অরুণের চোখে ঘুম নেই। রাতে ডাইনিং রুমেও আসেনি। নাজিম দিগ্বিদিক খুঁজছে তাকে। কোথাও নেই। সন্ধ্যা থেকে ফোনেও পাওয়া যাচ্ছে না। হঠাৎ তার মনে হলো, পুকুরপাড়ে যেতে পারে। দৌড়ে গিয়ে দেখে, সে পুকুরপাড়ের সিঁড়িতে বসে কাঁদছে। নাজিমকে দেখেই উঠে এসে জড়িয়ে ধরল—‘স্যার, আমি প্রিয়াঙ্কাকে খুব ভালোবাসি। ওকে জীবনসঙ্গী করতে চাই। কিন্তু সামনাসামনি বলার সাহস হয় না। আপনি বলেন, প্লিজ।’নাজিম অবাক হয়ে গেল। এ যুগেও কেউ নিজের মনের কথা বলতে পারে না! রাত পেরিয়ে ভোর হলেই সমাপনী অনুষ্ঠান। অনেক বুঝিয়ে নাজিম তাকে রুমে নিয়ে গেল।
সারারাত নির্ঘুমে কাটল। আজ দুপুরেই সমাপনী। সবাই বিদায় নিচ্ছে, স্মৃতিচারণ করছে, মনের অনুভূতি প্রকাশ করছে। অরুণ কিছুই বলল না। চুপচাপ বেঞ্চে বসে রইল। দুপুর ঘনিয়ে এলো। প্রিয়াঙ্কা সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অরুণের সামনে এসে দাঁড়াল। কিন্তু অরুণ অব্যক্ত কথাগুলো বলতে গিয়েও বলতে পারল না। ততক্ষণে রোদে ঘেমে শরীর ভিজে গেছে। খাতার পাতা ঘাম আর চোখের জলে নরম হয়ে উঠেছে। মাথার ওপর জ্বলন্ত সূর্য। প্রকৃতিতে যেন রোদ গলে গলে পড়ছে।
প্রিয়াঙ্কা চলে যাচ্ছিল। হঠাৎ তার ছায়া এসে পড়ল অরুণের গায়ের ওপর। প্রিয়াঙ্কা কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল। চারপাশে দুপুরের রোদ যেন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। বাতাসে গরম ধুলো উড়ছে। দূরে কোথাও কোকিল ডেকে উঠল ক্লান্ত স্বরে। অরুণ তখনো বেঞ্চে বসে। মাথা নিচু। হাতের খাতাটা ভিজে নরম হয়ে গেছে ঘাম আর চোখের জলে।হঠাৎ প্রিয়াঙ্কা ধীরে ধীরে ফিরে তাকাল। তার চোখে অদ্ভুত এক মায়া। যেন এতদিনের অব্যক্ত কথাগুলো শোনার মনের ভেতর তীব্র ইচ্ছা বাসা বেঁধেছে। কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অরুণের দিকে। তারপর মৃদু হেসে বলল, ‘সব কথা মুখে বলতে হয় না, স্যার।’
অরুণ বিস্মিত চোখে তাকাল। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। প্রিয়াঙ্কা আবার বলল, ‘কেউ যদি সত্যিই অপেক্ষা করতে জানে, সেটা বোঝা যায়।’
চারপাশে হঠাৎ দমকা বাতাস উঠল। কৃষ্ণচূড়ার শুকনো পাঁপড়ি উড়ে এসে পড়ল তাদের মাঝখানে। দূরের কালো মেঘ ধীরে ধীরে আকাশ ঢেকে দিচ্ছে। অরুণের ঠোঁট কাঁপছে। এতদিনের জমে থাকা কথাগুলো যেন একসাথে গলা পর্যন্ত উঠে এলো। কিন্তু তবুও সে কিছু বলতে পারল না। প্রিয়াঙ্কা এবার ব্যাগ থেকে ছোট্ট একটি কাগজ বের করে তার খাতার ভেতর গুঁজে দিলো—‘ভালো থাকবেন।’
তারপর ধীরে ধীরে চলে গেল। অরুণ অনেকক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল। পৃথিবীটা যেন হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। শুধু গরম রোদের ভেতর দূরে কোথাও মেঘ ডাকছে। কিছুক্ষণ পর কাঁপা হাতে কাগজটা খুলল সে। সেখানে লেখা—‘রোদ গলা দুপুরেরও একসময় বৃষ্টি নামে।’

