২০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ৩রা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

পাবলিক বনাম প্রাইভেট: তুলনার মানদণ্ড কী?

শাহানা হুদা রঞ্জনা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা, ল্যাব ও খাবারের মান, পরিবেশ, শিক্ষকদের আচরণ ও যোগ্যতা, শিক্ষক রাজনীতি, সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অনেক অভিযোগ আছে। কিন্তু আমরা যারা এখানে পড়েছি, তারা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি কটূক্তি বা তির্যক সমালোচনা শুনলে এখনো মন খারাপ করি। এই শিক্ষাপীঠকে নিজের মনে করি বলেই মন খারাপ হয়। অনেক অব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও এই বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে এবং স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠা ও চলাফেরা করার স্পেস দিয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে উঠে আসা অসংখ্য শিক্ষার্থীর মধ্যে মেলবন্ধন ঘটিয়েছে, সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতিকে বুঝতে সাহায্য করেছে।
তাই যখন গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে তুলনা করলেন, তখন ব্যথিত হয়েছি। যদিও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহার করেছেন। বিভিন্ন কারণে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমালোচনা করতে পারেন, কিন্তু তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘কোচিং সেন্টার’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং বলেছেন, নর্থ সাউথ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে ভালো গবেষণা হয়, যা অনভিপ্রেত।
প্রতিমন্ত্রী মহোদয় কি জানেন, এসব প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ গড়েই উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দ্বারা? ম্যানেজমেন্টের বেশিরভাগই এখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। পার্ট-টাইম শিক্ষকদেরও প্রায় সবাই বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শিক্ষক। যারা রিসোর্স পারসন হিসেবে পড়াচ্ছেন, তাঁরাও বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্রছাত্রী ছিলেন। সে কারণেই প্রতিমন্ত্রীর উচিত হয়নি এ ধরনের হঠকারী মন্তব্য করা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অনেক পুরোনো। দেশের ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান বটগাছের মতো। ১৯২১ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ইতিহাস, গবেষণা ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনো শীর্ষস্থানীয়।
গত কয়েক বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের লেখাপড়ার মান নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা সংস্কারের বিষয়টি সেভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে না। বলা যেতে পারে, শিক্ষার মান উন্নয়নে যেভাবে বা যে পরিসরে কাজ করা দরকার, তা হচ্ছে না। ইচ্ছামতো কারিকুলাম পরিবর্তন, দলীয় শিক্ষক নিয়োগ, অদক্ষ উপাচার্য নিয়োগ এবং সরকারের সুবিধামতো নীতিনির্ধারণের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পড়াশোনার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কিন্তু প্রতিকূলতার মধ্যেও যেসব ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করতে চান, উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে চান, তাঁরা যাচ্ছেন এবং বিদেশে ভালো ফলও করছেন। অনেকে চাকরি নিয়ে সেখানেই থেকে যাচ্ছেন। নানা প্রতিকূলতার মাঝেও অনেকে দেশেই বসে গবেষণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রায় ৫৬টি সক্রিয় ও বিশেষায়িত গবেষণা ব্যুরো ও কেন্দ্র রয়েছে। প্রতি বছর বিদেশি সাময়িকীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গবেষণাপত্র প্রকাশিত হচ্ছে। কাজেই জানতে ইচ্ছা করে, গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী যে বলেছেন নর্থ সাউথ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় যে গবেষণা করে, তার কানাকড়িও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় করে না—এই তথ্য তিনি কোথায় পেলেন? একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি চাইলেই একটি শতবর্ষী প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করতে পারেন না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গেও এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কত বড় বড় মানুষ এখানে পড়াশোনা করেছেন ও পড়িয়েছেন। লীলা নাগ, ড. কাজী মোতাহার হোসেন, অধ্যাপক ড. আবদুর রাজ্জাক, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ফজিলাতুন্নেসা জোহা, অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হক, জহির রায়হান, আবু সাঈদ চৌধুরী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, ভাষা শহীদ আবুল বরকত—এরকম আরও অনেকে। এমনকি মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাউমুন আব্দুল গাইয়ুমও এখানে পড়েছেন। এখনো অনেক বিদেশি শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসেন।
১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বের কেন্দ্র ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়। এ ছাড়া স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ১৯৯০ সালের এরশাদবিরোধী গণআন্দোলন, ১/১১-পরবর্তী অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং ২০২৪ সালেও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও বিভিন্ন আর্থসামাজিক অবস্থা থেকে আসা শিক্ষার্থীরা খুব স্বল্প খরচে এখানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বৈচিত্র্য হচ্ছে, একদিকে ধনী পরিবারের সন্তানরা যেমন এখানে পড়তে আসেন, অন্যদিকে দরিদ্র পরিবারের সন্তানরাও এখানে পড়ার সুযোগ পান। খুব স্মার্ট, ভালো পোশাক পরা, চোস্ত ইংরেজি জানা ও চৌকস শিক্ষার্থীরা যেমন এখানে পড়েন, তেমনি সাধারণ পোশাক পরা, আঞ্চলিক উচ্চারণে কথা বলা এবং মাঝারি মেধার শিক্ষার্থীরাও এখানে আসেন।
অনেক শিক্ষার্থীকে চিনতাম, যারা টিউশনি করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন এবং বাড়িতেও টাকা পাঠিয়েছেন। কেউ কেউ হলের ডাইনিংয়ের খাবারও নিয়মিত কিনে খেতে পারতেন না। রুমে ডাল, ভাত ও আলুভর্তা রান্না করে খেয়ে দিন পার করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া বরাবরই অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক ছিল এবং এখনো আছে। টাকা বা ক্ষমতা দিয়ে এখানে ভর্তি হওয়া যায় না। এইচএসসিতে ভালো ফল করার পর ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হতে হয়। এমনকি এখনো শুধু জিপিএ-৫ পেলেই যে এখানে ভর্তির সুযোগ পাওয়া যাবে, তাও নয়।
এখন আসি গবেষণা প্রসঙ্গে। আমরা কি জানি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য বাজেট কত? ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে গবেষণা খাতে প্রায় সাড়ে ২১ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, যা মোট বাজেটের মাত্র ২.০৮ শতাংশ। অথচ চার-পাঁচ বছর আগেও গবেষণা খাতে বরাদ্দ ছিল মাত্র ১১ কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়ের ১.৩২ শতাংশ।
গবেষণা খাতটি যদি বাজেটে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেত, শিক্ষক ও ছাত্ররাজনীতির প্রভাব যদি কম থাকত, তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে হয়তো আরও এগিয়ে যেতে পারত। দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি করা যে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব, সেই বিশ্ববিদ্যালয় খুঁড়িয়ে চলতে বাধ্য হচ্ছে দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও অপর্যাপ্ত বাজেটের কারণে। এ ছাড়া আর্থিক টানাপোড়েন, সরকারের উদাসীনতা, দলীয় কোন্দল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ ও ছাত্ররাজনীতি—সব মিলিয়ে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়, যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তোলে।
তবে ববি হাজ্জাজ সাহেব গবেষণার যে বিষয়টি তুলেছেন, তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিং নির্ধারণের সূচকগুলোর মধ্যে বিশেষ করে মৌলিক গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের উন্নয়ন না ঘটলে বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান এগোবে না; বরং আরও পিছিয়ে যেতে পারে। শুধু বয়সের হিসেবে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বমানের হয়ে ওঠে না; এর জন্য প্রয়োজন পেশাদারিত্ব, জবাবদিহি ও দায়িত্ববোধ। আমরা সবাই চাই, এই বিশ্ববিদ্যালয় একটি প্রকৃত গবেষণাধর্মী বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে উঠুক। তবে খুব সীমিত শিক্ষা বাজেট এবং বিভিন্ন সরকারের চাপ ও পরিচালনাগত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও যে বিশ্ববিদ্যালয়টি শিক্ষা ও গবেষণায় অবদান রেখে চলেছে, সেটিও স্বীকার করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দুর্বলতা আছে—এটি যেমন সত্য, তেমনি এ কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘কোচিং সেন্টার’-এর সঙ্গে তুলনা করা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন অনেক শিক্ষক ছিলেন, যাঁরা জ্ঞান বিতরণের মাধ্যমে অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন। তাঁদের কাছ থেকে আমরা শুধু পাঠ্যজ্ঞানই নয়, জীবনবোধও শিখেছি।তারপরও শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, শিক্ষক নির্বাচন ও শিক্ষণব্যবস্থায় নানা দুর্বলতা রয়েছে। যদি প্রশ্ন করা হয়, এই দুর্বলতা সৃষ্টির জন্য দায়ী কে, তাহলে উত্তর সহজ নয়। এর জন্য দায়ী সরকার, রাজনৈতিক দল, ত্রুটিপূর্ণ ছাত্ররাজনীতি এবং দলকানা প্রশাসনিক সংস্কৃতি।
অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিক্ষা ও গবেষণায় উৎকর্ষ সাধনের লক্ষ্যে বৈশ্বিক র‌্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ধারাবাহিকভাবে অগ্রগতি অর্জন করে চলেছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশন (THE) প্রকাশিত এশিয়া ইউনিভার্সিটি র‌্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ৩০১-৩৫০ অবস্থানে স্থান পেয়েছে। এর আগের বছর বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান ছিল ৪০১-৫০০-এর মধ্যে। সর্বশেষ এই র‌্যাঙ্কিংয়ে এশিয়ার ৩৬টি দেশের ৯২৯টি বিশ্ববিদ্যালয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ২৮টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে শীর্ষস্থান অর্জন করেছে।তবে এসব তথ্য-উপাত্ত দিয়ে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। এর পাশাপাশি দেখতে হবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাঁরা গবেষণার সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে কতটা প্রকাশিত হচ্ছে এবং সেগুলোর প্রভাব কতটা। গবেষণাকর্ম তখনই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যখন তা অন্য গবেষকেরা ব্যবহার করেন, উদ্ধৃত করেন এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে। তখনই বোঝা যায়, সেই গবেষণা বাস্তব অর্থে মানুষের কাজে লাগছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অসংখ্য গবেষণা হচ্ছে, কিন্তু যদি সেই গবেষণার ফলাফল সমাজ, রাষ্ট্র বা জ্ঞানচর্চার কোনো ক্ষেত্রে কার্যকর অবদান রাখতে না পারে, তাহলে সেগুলো কেবল আনুষ্ঠানিক গবেষণাকর্ম হিসেবেই থেকে যায়। অনেক সময় গবেষণা হয় ডিগ্রি অর্জন বা পদোন্নতির প্রয়োজন মেটানোর জন্য; কিন্তু গবেষণার প্রকৃত উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং সমাজের বাস্তব সমস্যার সমাধান খোঁজা।আধুনিক বিশ্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়াতে হলে ভিজিটিং টিচার হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অধ্যাপক ও গবেষকদের আরও বেশি করে যুক্ত করা প্রয়োজন। তাঁরা দেশীয় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যৌথ গবেষণায় অংশ নিলে গবেষণার মান ও গ্রহণযোগ্যতা উভয়ই বৃদ্ধি পাবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা যারা পড়েছি এবং এখনো যারা পড়ছি, তাঁদের কাছে এই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে একটি আবেগ কাজ করে। তবে আবেগের পাশাপাশি বাস্তবতাকেও মেনে নিতে হবে। বিশেষ করে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, গবেষণায় অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা এবং গাইড শিক্ষকের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ—এসব বিষয় গবেষণার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক কাবেরী গায়েন তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ আমাদের দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কেবল পড়ানোর জন্য বেতন পান; গবেষণার কাজও তাঁদের নিজ দায়িত্বে করতে হয়। এজন্য আমি আমার সহকর্মীদের স্যালুট জানাই। অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় গত কয়েক বছরে আমাদের শিক্ষকদের আন্তর্জাতিক প্রকাশনা বেড়েছে—এ কথাটিও আমি গর্বের সঙ্গে বলতে চাই। তাই বলে কি অনিয়ম নেই? অবশ্যই আছে। কিন্তু আমি ভাবি, যে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ নেই, কোনো কার্যকর প্রণোদনা নেই, বরং জাতীয় রাজনীতির কুৎসিত প্রভাবে গুণী শিক্ষক নয়, রাজনৈতিক আনুগত্যই ক্ষমতার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে যেসব শিক্ষক দাঁতে দাঁত চেপে গবেষণা চালিয়ে যান, তাঁরা কেন তা করেন? নিশ্চয়ই তাঁদের মধ্যে জ্ঞানচর্চার প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা কাজ করে।”
আমরা বলতে চাই, পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সরাসরি তুলনা করা যায় না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও বাস্তবতার সঙ্গে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশের বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার খরচ অত্যন্ত কম। এত কম যে অনেক সময় বিস্মিত হতে হয়—এত অল্প ব্যয়ে উচ্চশিক্ষা প্রদান কীভাবে সম্ভব হচ্ছে।
বাজেট স্বল্পতার কারণে আবাসিক হলের খাবারের মান, শ্রেণিকক্ষ ও ল্যাবরেটরির সুবিধা, টয়লেট ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা এবং সামগ্রিক অবকাঠামো প্রায়ই প্রশ্নের মুখে পড়ে। একই কারণে গবেষণার সুযোগ-সুবিধাও সীমিত থাকে। ফলে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী তাঁদের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সুযোগ পান না।
অন্যদিকে ব্র্যাক, নর্থ সাউথ, আইইউবি-ধরনের উচ্চ ব্যয়সম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে উন্নত অবকাঠামো, আধুনিক ল্যাবরেটরি, আন্তর্জাতিক মানের বিভিন্ন সুবিধা এবং অধিকতর সুশৃঙ্খল একাডেমিক পরিবেশ পেয়ে থাকেন। অন্যান্য অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়াশোনার ব্যয় উল্লেখযোগ্য। ফলে সাধারণ পরিবারের কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর পক্ষে ফল ভালো হলেও এসব প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পাওয়া প্রায়ই কঠিন হয়ে পড়ে।
অনেক ক্ষেত্রে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছরের শিক্ষাব্যয় বিদেশের কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার ব্যয়ের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। ফলে অর্থনৈতিক সামর্থ্য এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।
তবে প্রশ্ন হলো, অভিভাবকদের বিপুল অর্থ ব্যয় করে, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও দক্ষ শিক্ষকদের সান্নিধ্যে থেকে যাঁরা পড়াশোনা করছেন, তাঁদের সবাই কি সমানভাবে ভালো ফল করছেন? সবাই কি কাঙ্ক্ষিত চাকরি পাচ্ছেন? সবাই কি বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ, গবেষণা অনুদান বা বৃত্তি অর্জন করছেন? বাস্তবতা কিন্তু তা বলে না।এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত মেধা, পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং লক্ষ্যবোধ। শুধু উন্নত অবকাঠামো থাকলেই সাফল্য নিশ্চিত হয় না। আবার সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও অনেক শিক্ষার্থী অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেন। এটিও মনে রাখতে হবে যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া সব শিক্ষার্থীর গবেষক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকে না। অনেকের প্রধান লক্ষ্য একটি ভালো চাকরি বা পেশাগত দক্ষতা অর্জন। ফলে গবেষণার পরিমাণ বা মান বিচার করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক কাঠামো, উদ্দেশ্য, শিক্ষার্থী প্রোফাইল এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে কত কম খরচে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন, কত প্রতিকূলতার মধ্যে নিজেদের গড়ে তোলেন এবং কত সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে পৌঁছান—সেটিও মূল্যায়নের অংশ হওয়া উচিত। একইভাবে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যে উচ্চ টিউশন ফি প্রদান করে উন্নত সুবিধা ভোগ করেন, সেই বাস্তবতাও বিবেচনায় রাখতে হবে।
কাজেই পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতা তৈরি করার পরিবর্তে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত দেশের সামগ্রিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন। এক পক্ষকে ছোট করে অন্য পক্ষকে বড় করার মধ্যে কোনো ইতিবাচক ফল নেই। বরং প্রয়োজন পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা এবং উচ্চশিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য সমন্বিত উদ্যোগ।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক অবস্থার উন্নয়ন সম্ভব হবে তখনই, যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা যাবে, গবেষণায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করা হবে, শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও জ্ঞানচর্চার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই প্রতিষ্ঠানকে ভালোবাসার অর্থ এর দুর্বলতাগুলো অস্বীকার করা নয়; বরং সেগুলো চিহ্নিত করে উন্নয়নের পথ খোঁজা। সমালোচনা অবশ্যই হবে, হওয়া উচিতও। কিন্তু সেই সমালোচনা যেন তথ্যভিত্তিক, দায়িত্বশীল এবং গঠনমূলক হয়—এ প্রত্যাশাই সবার।
লেখক : যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়