শাহ বিলিয়া জুলফিকার
যে মহৎ উদ্দেশ্যে বাংলা, ইতিহাস বা দর্শন পড়ানো হয় (মনুষ্যত্বের বিকাশ, শেকড়ের সন্ধান, বিবেকের জাগরণ); সেই উদ্দেশ্যে এখন প্রায় কেউই পড়তে আসেন না। সবাই দেখেন কোনটায় শিক্ষা ক্যাডার আছে, কোনটা দিয়ে বিসিএস দেওয়া যায়, চাকরির পরীক্ষায় কোন বিষয়ে এগিয়ে থাকা যাবে। বিষয়গুলোর আত্মিক মূল্যের চেয়ে তাদের কাছে বড় হয়ে উঠেছে বাজারমূল্য। ফলে যারা নীতি নির্ধারণ করেন; তারাও নির্বিকার। যাদের জন্য নীতি, তারাও উদাসীন। দুপক্ষই মেনে নিচ্ছেন যে, শিক্ষা মানে চাকরির সিঁড়ি, আলোকিত হওয়ার সোপান নয়। এ বাস্তবতায় ভাষা-ইতিহাস-দর্শনের গুরুত্ব সংকুচিত হয়ে আসাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এ ‘স্বাভাবিকতাই’ আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ।
আমরা যখন বলি ‘নিজের ভাষা’; তখন শুধু একটা যোগাযোগের মাধ্যমের কথা বলি না। বলি আত্মার কথা, ভেতরের মানুষটার কথা। মাতৃভাষায় পাণ্ডিত্য মানে শুধু ব্যাকরণ আর সাহিত্যের ইতিহাস গলাধঃকরণ করা নয়; এটা অনেক গভীরের ডাক। নিজের ভাষাকে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে একসময় দেখবেন, আপনার চিন্তার জগৎটা কখন যেন প্রশস্ত হয়ে গেছে, জটিল থেকে জটিলতর অনুভূতিকে আপনি শব্দ দিতে পারছেন। গবেষণাও তাই বলছে। নিজের ভাষায় গভীর পাণ্ডিত্য মস্তিষ্কের ভেতরের কাঠামোটা বদলে দেয়, চিন্তার নমনীয়তা বাড়ায়। এটা সেই শেকড়, যার ওপর দাঁড়িয়ে আপনি ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, জার্মান বা পাইথন যে কোনো ভাষাই দ্রুত আয়ত্ত করে ফেলতে পারবেন।
এই শেকড়টা কেবল ভাষার নয়, এটা ইতিহাসেরও। ইতিহাস কোনো সন-তারিখের কারখানা নয়, ইতিহাস হলো মানব অভিজ্ঞতার এক জীবন্ত ল্যাবরেটরি। আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র, সভ্যতা এসব তো আকাশ থেকে পড়েনি। এসবের পেছনে রক্ত, ঘাম, চোখের জল আর বুকভরা স্বপ্নের এক সুবিশাল বুনন আছে। ইতিহাস পড়া মানে সেই বুননের সুতোয় সুতোয় হাত বোলানো। যখন আপনি পড়বেন, কীভাবে একটা ক্ষুদ্র ভাষা আন্দোলন থেকে রক্তস্নাত এক স্বাধীন দেশের জন্ম হলো; তখন সেটা শুধু তথ্য থাকবে না, হয়ে উঠবে আত্মপরিচয়ের অমোঘ এক দর্পণ। নিজের শেকড়ের গল্প না জানলে আমরা দিশেহারা পথিক ছাড়া কিছুই না।
দর্শন নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা
কিন্তু শুধু তথ্য আর ঘটনা জানলেই তো মনুষ্যত্ব তৈরি হয় না। দরকার হয় দর্শনের সেই চিরন্তন আলো, যা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়। দর্শন হলো সব জ্ঞানের জননী। এটা সেই শিক্ষা, যে শিক্ষা আপনাকে শেখায় কীভাবে ভাবতে হয়, কীভাবে যুক্তির ফাঁদ এড়িয়ে চলতে হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পারফর্ম করতে পারে, কিন্তু চিন্তা করতে পারে না। আর চিন্তার এই উৎসভূমি হলো সাহিত্য, ইতিহাস আর দর্শন। দর্শনের চর্চা আমাদের মুক্তমনা করে, সহিষ্ণু করে, গোঁড়ামি আর অন্ধবিশ্বাসের গলিপথ থেকে সরিয়ে এনে মুক্তির রাজপথে দাঁড় করিয়ে দেয়। আইন, প্রযুক্তি কিংবা অর্থনীতির মতো পেশাদার জগতে যারা ছক ভেঙে চিন্তা করতে পারে, তারাই সেরা। আজকের এআই-নির্ভর দুনিয়ায়, যেখানে নৈতিক সংকটগুলোই মুখ্য হয়ে উঠছে, সেখানে তথ্য-উপাত্ত আর অ্যালগারিদমের বাইরেও মানুষের যে এক বিবেক আছে, সেই বিবেকের ঠিকানা কিন্তু দর্শনই।
এখন প্রশ্ন হলো, আমরা যদি বাংলা, ইতিহাস, দর্শনের মতো বিষয়গুলোকে অপ্রয়োজনীয় মনে করি, তাহলে আগামী প্রজন্ম কী শিখবে? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কি ইতিহাস বোঝা যাবে? অ্যালগারিদম দিয়ে কি দর্শনের গভীরতা উপলব্ধি করা যাবে? মেশিন লার্নিং দিয়ে কি কবিতার রস আস্বাদন করা সম্ভব? নিশ্চয়ই না। প্রযুক্তি আমাদের জীবনের মানোন্নয়ন ঘটাতে পারে, কিন্তু জীবনের অর্থ শেখাতে পারে না। আর সেই অর্থের সন্ধান দিতে পারে একমাত্র সাহিত্য, ইতিহাস আর দর্শন। এই সত্যটা বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত।
উন্নত বিশ্বের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘লিবারেল আর্টস’-এর ধারণা আজ আর পুরোনো দিনের বিলাসিতা নয়। তারা জানে, চিকিৎসক যদি ইতিহাস আর সাহিত্য না পড়েন, তবে তিনি দেহ সারাতে পারবেন, মন ছুঁতে পারবেন না। প্রকৌশলী যদি দর্শন না বোঝেন, তবে তিনি সেতু বানাতে পারবেন, জীবনকে ধারণ করার সেতু বানাতে পারবেন না। নিজস্ব ভাষা, ইতিহাস আর দর্শনের ওপর গভীর চর্চা শুধু দেশপ্রেম বা নস্টালজিয়ার জন্য জরুরি নয়। এগুলো ‘সফট স্কিল’-এর মহাশক্তিশালী কারখানা। কোডিং বা হিসাবরক্ষণের কাজ হয়তো কাল রোবট করে দেবে, কিন্তু যে মানুষটা জটিল পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে, যে মানুষটা অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন মতের মধ্যে সাঁকো বাঁধতে পারবে, যে মানুষটা নতুন একটা নৈতিক কাঠামো দাঁড় করাতে পারবে; সেই মানুষটাকে কোনো এআই কখনো প্রতিস্থাপন করতে পারবে না। আর সেই মানুষটা গড়ে ওঠে সাহিত্যের নন্দনতত্ত্বে ডুবে, ইতিহাসের পথরেখায় হেঁটে আর দর্শনের কঠিন প্রশ্নগুলোর সঙ্গে মল্লযুদ্ধ করে।
দুঃখজনক সত্য হলো, বর্তমানে শিক্ষাব্যবস্থা যেন সবকিছুকে অর্থনৈতিক উৎপাদনক্ষমতার মাপকাঠিতে মাপছে। যে বিষয় সরাসরি চাকরি বা অর্থ উপার্জনের সঙ্গে যুক্ত নয়, তাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করা হচ্ছে। অথচ একটি জাতির প্রকৃত উন্নয়ন কখনোই কেবল অর্থনৈতিক সূচক দিয়ে মাপা যায় না। জাতির মানসিক উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি, নৈতিকতার উৎকর্ষ—এগুলোও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। একটি দেশের নাগরিক যখন নিজের রাষ্ট্রভাষায় সাহিত্য-সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকে না, তখন সে দেশ কীভাবে অন্য দেশের সাংস্কৃতিক আধিপত্য মোকাবিলা করবে? ইতিহাসই তো একটি জাতিকে বাঁচিয়ে রাখে। প্রশ্ন হলো, সেই বাঁচিয়ে রাখার কাজটা করবে কে? যে জাতি নিজের ইতিহাস ভুলে যায়; সে জাতি ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যায়। সাহিত্য-সংস্কৃতির আধিপত্য মোকাবিলা করতে না পারলে দেশীয় রাজনীতির মৃত্যু অনিবার্য। আর রাজনৈতিক আধিপত্য হারালে পুনরুদ্ধার সম্ভব হলেও, সাহিত্য-সংস্কৃতির মৃত্যু ঘটলে কোনো পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। কারণ সংস্কৃতি হলো জাতির আত্মা, যা একবার হারিয়ে গেলে তা আর ফিরে পাওয়া যায় না।
আমরা একটা চরম বিপরীতমুখী সময়ে বাস করছি। একদিকে প্রযুক্তির উৎকর্ষ আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, অন্যদিকে মানবিকতার ভিত্তিমূল কাঁপছে। একজন শিক্ষার্থী যদি আইন না জানেন, তাহলে সে তার নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন হবে কী করে? প্রাথমিক চিকিৎসার জ্ঞান না থাকলে জরুরি পরিস্থিতিতে সে কীভাবে মানুষকে সাহায্য করবে? সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় না ঘটলে তার মননশীলতা, সহমর্মিতা আর মানবিক বোধের বিকাশ হবে কীভাবে?
শিক্ষার্থীরা এখন চাকরির বাজারের হিসাব-নিকাশ করেই বিষয় বাছবে, এটা সত্য। কিন্তু রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব তো ক্ষণিকের বাজারচাহিদার ঊর্ধ্বে উঠে ভবিষ্যতের রূপরেখা আঁকা। যে সমাজ শুধু তথ্যপ্রযুক্তিবিদ আর ব্যবসায়ী তৈরি করে; কিন্তু কবি, দার্শনিক আর ইতিহাসবেত্তা তৈরি করে না, সে সমাজ আত্মাহীন দৈত্য ছাড়া কিছু নয়। শিক্ষা কখনোই কেবল চাকরির জন্য নয়। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষ গড়া, মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটানো, আলোকিত মানুষ তৈরি করা। আমরা হয়তো যুগের ক্ষুধা মেটাতে পারবো, কিন্তু আমাদের আত্মার ক্ষুধাটুকু রয়েই যাবে চিরতৃপ্তিহীন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এই আত্মার ক্ষুধা মেটাবে একমাত্র সাহিত্যের নন্দন, ইতিহাসের পাঠ আর দর্শনের আলো—কোনো মেশিন লার্নিং মডেল নয়।

