আব্দুল বায়েস
(পূর্বপ্রকাশের পর, পর্ব-তিন)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পে উলাপুর গ্রামটি বর্ণনা করেছেন এভাবে—‘অন্ধকার আটচালা, পানা-পুকুর এবং তাহার চারিপাড়ে জঙ্গল; সন্ধ্যার সময় গ্রামের গোয়ালঘরে কুণ্ডলায়িত ধোঁয়া, ঝোপে ঝোপে ঝিল্লির ডাক এবং দূরে গ্রামের নেশাখোর বাউলের খোল-করতাল বাজানো উচ্চস্বরে গান; অন্ধকার দাওয়া ও গাছের কম্পন….। …যদি আরব্য উপন্যাসের কোনো দৈত্য আসিয়া এক রাত্রের মধ্যে এই শাখাপল্লব-সমেত গাছগুলো কাটিয়া পাকা রাস্তা বানাইয়া দেয়, এবং সারি সারি অট্টালিকা আকাশের মেঘকে দৃষ্টিপথ হইতে রুদ্ধ করিয়া রাখে, তা হইলে এই আধমরা ভদ্র সন্তানটি পুনশ্চ নবজীবন লাভ করিতে পারে।’
আমার গ্রামখানি অবশ্য অতটা অনুন্নত ছিল না। উন্নত রাস্তাঘাট ছিল না বটে, তবে নৌপথে ঢাকা আসতে লাগত দুই ঘণ্টা। এ জন্য মতলবমুখী না হয়ে সুগন্ধির মানুষ নারায়ণগঞ্জমুখী হয়ে সুখী থাকত বেশি।
তারপরও সুগন্ধি ছিল নিরেট কৃষিনির্ভর একটি গ্রাম; কৃষি ব্যবস্থাপনা ছিল সনাতনী এবং প্রকৃতিনির্ভর। লাঙল-জোয়াল কাঁধে হালের বলদ, সেকেলে বীজ, ঢেঁকির ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ, কুলায় করে দক্ষিণা হাওয়ায় ধান ঝাড়া ইত্যাদি ছিল নিত্যদিনের চিত্র। জমিতে পানি বলতে আল্লাহর আশীর্বাদপুষ্ট বৃষ্টির পানি—‘তুমি খাওয়াইলে আমি খাই আল্লাহ।’
প্রধান খাদ্যশস্য হিসেবে শুষ্ক মৌসুমে মাঠে থাকত আউশ আর কাউন এবং বর্ষাকালে পানির সঙ্গে বেড়ে ওঠা গভীর জলের আমন। এক হাতে বাঁশের ঝুড়ি (ওড়া) কোমরে রেখে অন্য হাতে ছিটানো সনাতনী বীজে বিঘাপ্রতি ধান আসত বড়জোর ৬ মণ। অথচ খানা প্রতি খানেওয়ালা ৮-১০ জন, খিলানেওয়ালা মাত্র একজন।এতদঞ্চলের সনাতনী ধানের বাহারি নাম শুনলে মনে হবে কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন! আউশ তথা খরা মৌসুমে মাঠে ছিল লক্ষ্মীলতা, চালাকি, সাইটা, ফুলবাদাম, চিনাটিঙরি। অন্যদিকে আমন তথা বর্ষা মৌসুমে মাঠ ভরে থাকত লক্ষ্মীবিলাস, দুধজাল, কার্তিকশাইল, মধুসাইল, খামা, আছমতি, বন্দিসাইল, লাইচ্চা, খোদমতি প্রভৃতি।
বোরো ধান বলতে নদীর তীরে কিংবা খাল-বিলের কিনারে পলিপড়া মাটিতে জন্মানো দেশি বোরো। মাঠে আরও থাকত মিষ্টি আলু, সরিষা, তিল, আখ ইত্যাদি। ও, বলতে ভুলে গেছি—অর্থকরী ফসল হিসেবে সোনালি আঁশ বলে খ্যাত পাট হতো প্রচুর। এখন সেই রামও নেই, অযোধ্যাও নেই। পাটের সূর্য গেছে পাটে; সোনালি আঁশ নাকি গলার ফাঁস।
পুরো বর্ষাকালে, বিশেষত মাঠপর্যায়ে কৃষকদের হাতে কোনো কাজ থাকত না। অ-কৃষি কর্মকাণ্ডের তোড়জোড় তেমন চোখে পড়ার মতো ছিল না, তবে বেশ কজন চাকরিজীবী ছিলেন। গ্রামে মোট খানার প্রায় অর্ধেক ছিল অসচ্ছল। গরিব খানাগুলোর জীবন-জীবিকা চলত কৃষিশ্রম, নৌকায় যাত্রী পারাপার কিংবা মাছ ধরে। কেউ আবার ব্যাপারীদের সঙ্গে বড় বড় নৌকায় করে বরিশাল কিংবা সিলেট যেত ধান কাটতে। শুধু যেতে-আসতেই লেগে যেত কয়েক দিন। ‘আল্লাহ আল্লাহ বল রে মমিন…’ বলে পাল তুলে যাত্রা; নৌকায় খাওয়া, নাওয়া, গাওয়া—সবই চলত একসঙ্গে।
গরিবদের কেউ কেউ আবার সচ্ছল খানায় স্থায়ী কামলা থাকত—গ্রামের ভাষায় যাকে বলে ‘মুনি’। মালিক এদের ভরণপোষণ, খাবারদাবার, বিয়ে-শাদি, এমনকি প্রয়োজনে সেই বাড়িতেই মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিতেন। বাকিরা দিনমজুর বা ক্যাজুয়াল লেবার—পেটেভাতে কিংবা সামান্য পারিশ্রমিকে অন্যের জমিতে কাজ করা ছিল তাদের পেশা।অসচ্ছলদের মধ্যে ‘বদলি শ্রম’-এর ব্যবস্থা ছিল। তুমি আমার জমিতে কাজ করার বিনিময়ে আমি তোমার জমিতে শ্রম দেব; তোমার একটি হালের বলদের বিনিময়ে পাবে আমার একটি হালের বলদ। এই ধরনের বোঝাপড়া আজকাল হয়তো উঠে গেছে। কেউ কেউ জমি বর্গায় চাষ করত এবং একমাত্র ব্যবস্থা ছিল ভাগচাষ পদ্ধতি—জমি আমার, উপকরণ তোমার, কিন্তু ফসল আধাআধি।
গ্রামটিতে অভাব ছিল, কিন্তু শান্তির সুবাতাসও ছিল। মারামারি-কাটাকাটির কথা খুব একটা কানে আসত না। রাজনৈতিক পরিচয়ে বিভাজন ছিল না বললেই চলে। প্রবীণদের প্রাধান্যে গঠিত সালিশি ব্যবস্থা অভিযোগ নিষ্পত্তিতে বেশ শক্তিশালী ভূমিকা পালন করত। আজ অবশ্য ওসব কথা কারও মনে আছে বলে মনে হয় না।
ডেনমার্কের যুবরাজ ছাড়া যেমন ‘হ্যামলেট’ নাটক হয় না, তেমনি পল্লীবধুর প্রসঙ্গ ব্যতীত গ্রামের বয়ানও বিশ্বাসযোগ্য হয় না। সুগন্ধি গ্রামে তেমন কোনো রক্ষণশীল সমাজ ছিল না। গ্রামের মধ্যে নারীদের চলাফেরা ছিল ঘোমটা টেনে, আর গ্রামের বাইরে গেলে বোরখা পরে। মনে পড়ে আমার গ্রামের দিনরাত খেটে খাওয়া ক্ষমতাহীন নারীদের কথা। সবার আগে কাকডাকা ভোরে ঘুম থেকে ওঠা এবং সবার শেষে নাওয়া-খাওয়া সেরে বিছানায় যাওয়া। গড়পড়তা ৬-৭টি সন্তানের জন্ম দিচ্ছে এবং সন্তানসম্ভবা অবস্থাতেও হাড়ভাঙা খাটুনি খাটছে; রান্নাবান্নার পাশাপাশি কলসি কাঁখে পুকুর থেকে পানি টানছে, ঢেঁকিতে ধান ভানছে। ছেলেমেয়ে ছাড়াও হাঁস-মুরগি আর গবাদিপশুর পরিচর্যা তো আছেই। বিনিময়ে কপালে তিলক জোটে না, জোটে তিরস্কার—
‘কোন এক গাঁয়ের বধুর কথা তোমায় শোনাই,
শোন, রূপকথা নয় সে নয়।
জীবনের মধুমাসের কুসুম ছিঁড়ে গাঁথামালা,
শিশিরভেজা কাহিনি শোনাই শোন…।’
এই মুহূর্তে মনে পড়ছে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘উপেক্ষিতা’ গল্পের কথাঃ
“ওগো লক্ষ্মী, ওগো স্নেহময়ী পল্লীবধূ, তুমি আজও কি আছো?…… আজও তুমি কি সেই পুকুরের ভাঙা ঘাটে সেই আবার জল আনতে যাও?….. আজ সে কত কালের কথা হলো, তারপর জীবনে আবার কত কী দেখলুম, আবার কত কী পেলুম….. আজ কতদিন পরে আবার তোমার কথা মনে পড়ল….. মনে আসছে, অনেক দূরের যেন কোনো খড়ের ঘর…. মিটমিটে মাটির প্রদীপের আলো…. মৌন সন্ধ্যা…. নীরব ব্যথার অশ্রু…. শান্ত সৌন্দর্য…. স্নেহমাখা রাঙা শাড়ির আঁচল।”
বোনা আমন ও আউশ ধানের উৎপাদন ছিল খুব কম—বিঘাপ্রতি বড়জোর ৫-৬ মণ। বড় কিংবা মাঝারি কৃষক না হলে এ দিয়ে গড়পড়তা সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি খানার ভাতের অভাব পূরণ হতো না। সুগন্ধি গ্রামের অনেক খানায় তাই কাউন-মিশ্রিত ভাত খাওয়া হতো। সকালের নাশতার মধ্যে থাকত মিষ্টি আলু, গুড়-মুড়ি অথবা লাল মরিচের ভর্তা দিয়ে কাউনের জাউ।
এদিকে জনমিতির চাপ ছিল ভয়ংকর—প্রতি ঘরে গড়পড়তা ৫-৭ সন্তান। শিশু ও বৃদ্ধ জনগোষ্ঠী নিয়ে প্রতি খানায় নির্ভরতার হার ছিল বেশি। সেই কালে কোনো বাড়িতে পাকা পায়খানা কিংবা দালান ছিল—এমন তথ্য আমার জানা নেই। ছোটবেলায় দেখেছি, কুটিরশিল্প বলতে গ্রামের দু-একটি ঘরে তাঁতের ঠাসঠাস আওয়াজ। নাপিত বাড়ি বয়ে এসে চুল কেটে দিয়ে যেতেন, কিন্তু বছরের শেষে ধান দিয়ে তার মজুরি পরিশোধ করা হতো।
হাতুড়ে ডাক্তার কিংবা কবিরাজ বাড়ি এলে ভিজিট হিসেবে কিছু পেতেন কি না জানি না, তবে একটি লাউ, কুমড়া কিংবা কয়েকটি ডিম তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হতো। গরিবের ছনের ঘরে কুপি আর স্বচ্ছলদের টিনের ঘরে হ্যারিকেনের সাহায্যে পথচলা কিংবা পড়াশোনা করতে হতো। পাদুকা বলতে কাঠের স্যান্ডেল কিংবা খড়ম—যেন বৃষ্টির জন্য সৃষ্টি।
প্রত্যেক বাড়িতে কাছারিঘর যেমন ছিল, তেমনি ছিল বড় বড় গোয়ালঘর। সেই আমলে গরিব-ধনী কিংবা খানদানি খানা বিবেচনা করা হতো তিনটি আলামত দেখে—পুকুর, কাছারিঘর ও গোয়ালঘর। যবে পুকুরভরা মাছ আর গোয়ালভরা গরু, তবে আত্মীয়তার শুরু।
তিন
আমি যখন বেড়ে উঠি, তখন গ্রামের সার্বিক পরিবেশ ছিল শান্ত, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধমিশ্রিত এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের। গ্রামে অভাব ছিল, কিন্তু মানুষের স্বভাব কখনো বদলায়নি। মোট কথা, সেকালের সুগন্ধি গ্রামের রাজনীতিতে ‘পলিটিক্স’ ঢুকতে পারেনি।
তবে কালের আবর্তে মেঘনা-ধনাগদা বাঁধ নির্মিত হয়। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি তথা গণ-অবকাঠামোর বিকাশ ঘটার ফলে গ্রামের চেহারা পাল্টাতে থাকে। আসে আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি—ব্রি ধান-২৮, ব্রি ধান-২৯, যান্ত্রিক চাষাবাদ এবং নিয়ন্ত্রিত পানি প্রবাহ। সবুজ বিপ্লবের কাঁধে ভর দিয়ে প্রতিবিঘায় কম করেও ২০ মণ ধান পেয়ে ধেই ধেই করে নাচতে থাকে গ্রামবাসী।
এখন প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছেছে। ঢাকা থেকে গাড়ি করে প্রায় প্রতিটি বাড়িতে যাওয়া যায়। সুগন্ধি গ্রাম ধীরে ধীরে শহুরে রূপ ধারণ করেছে; জীবন-জীবিকায় এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। অবশ্য এর সঙ্গে সঙ্গে এমন অভিযোগও উঠতে থাকে যে বহমান আধুনিকায়ন চিরায়ত মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও ক্ষমতার কাঠামোকে সজোরে ধাক্কা দিয়েছে। আধুনিকায়নের আশীর্বাদ ও অভিশাপে সিক্ত সুগন্ধি এসব পরিবর্তন নিয়েই বেঁচে আছে।
পাঁচ
এবং তাই স্বাভাবিক। উন্নয়ন কোনো গোলাপশয্যা নয়। এতে সুবাসের সঙ্গে কাঁটাও থাকে। ভালো-মন্দ মিলিয়েই উন্নয়ন। কবি বলেছেন—
‘কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে,
দুঃখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহীতে।’
জানালা খুলে দিলে নির্মল বাতাস যেমন আসে, তেমনি প্রবেশ করে মশা-মাছিও। তাই বলে দরজা-জানালা বন্ধ করে থাকা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। খোলা জানালা, নির্মল বায়ু, মশা-মাছি—এসব নিয়েই সুগন্ধি সমাজের গল্প।
সুগন্ধির জীবনে আগত আলো-বাতাস, হাসি-গান, পড়াশোনা ইত্যাদি লক্ষ করে নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ‘বাদশাহ নামদার’ বই থেকে একটি ‘শের’ স্মরণে আসে—
রোজেগারে সিয়াহ খাস্তেম বুদ বে গেরিয়ে আভারদ মারা,
মান উরা বে গেরিয়ে আভারদাম বা খান্দেয়ে মারা।
[দুর্দিন ভেবেছিল সে আমাকে কাঁদাবে, উল্টো হাসিমুখে আমি তাকে কাঁদিয়েছি।]
(চলবে)
লেখক : অর্থনীতিবিদ, কলামিস্ট। সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

