৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ২১শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

৮ ঘণ্টার কারখানা শ্রমিক উনদাভই এখন জার্মানির আশা-ভরসার প্রতীক

প্রতিদিনের ডেস্ক
জীবন নাটকের চেয়ে অতি নাটকীয়। সুখ কিংবা দুঃখ, দুই গল্পেই এই উক্তি ব্যবহার হয় হরহামেশাই। চারপাশের এত এত গল্প, তাতে এই উক্তির ব্যবহার যুগের পর যুগ ধরে বেড়েই চলেছে চক্রবৃদ্ধি হারে। যেমন আজ সেই উক্তিটা ব্যবহার করতে হচ্ছে জার্মানির ফরোয়ার্ড দেনিজ উনদাভের জন্য। এতক্ষণে সবারই জানা দীর্ঘ এক যুগ তথা ১২ বছর পর বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে পা রেখেছে জার্মানি। আর ম্যাচে পিছিয়ে পড়ার পরও সেটি সম্ভব হয়েছে উনদাভের জোড়া গোলের নৈপুণ্যে।
২০১৪ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর সবশেষ দুই আসরে গ্রুপ পর্বের বাধাই উতরোতে পারেনি জার্মানি। দুই আসরেই আবারও শিরোপা জেতার স্বপ্ন ধুলস্যাৎ হয়েছে কোনো না কোনো ভুলে। তবে এবার আর সেই ভুল হতে দিতে চান না উনদাভরা। তাই তো আইভরি কোস্টের বিপক্ষে ২-১ গোলের জয়ে করলেন জোড়া গোল। আর আসরে এখন পর্যন্ত বদলি নেমে রেখেছেন ৫ গোলে অবদান। ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপে কোনো বদলি খেলোয়াড়ের জন্য এটি যৌথভাবে সর্বোচ্চ রেকর্ড। যা ১৯৯০ সালে ক্যামেরুনের রজার মিল্লার কীর্তির সমান।
পারফরম্যান্সের গল্প শুনে বা ম্যাচ দেখে নিজেকে উনদাভের জায়গায় কল্পনা করার শখটা আপনার জাগতেই পারে। কিন্তু পেছনের গল্পটা এতটাও সহজ ছিল না জার্মানির এই ফরোয়ার্ডের। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, প্রকাশ্যে তার সমালোচনা করেছিলেন জার্মানির কোচ ইউলিয়ান নাগেলসম্যান। ফলে অনিশ্চিত হয়ে যায় বিশ্বকাপে তার জায়গা। অথচ, সময় পাল্টে তিনিই এখন জার্মানির প্রধানতম অস্ত্র বলা চলে।গত মার্চে ঘানার বিপক্ষে ম্যাচে বদলি নেমে শেষ মুহূর্তে জয়সূচক গোল করে শুরুর একাদশে খেলার ইচ্ছা পোষণ করেন কোচের কাছে। যা পছন্দ হয়নি নাগেলসম্যানের। ফলে দেখা দেয় প্রকাশ্যে মতবিরোধ। তবে বিশ্বকাপে এমন পারফরম্যান্সের পর কোচ নিজেই এখন বদল করতে যাচ্ছেন নিজের সিদ্ধান্ত। বনে গেছেন উনদাভের ভক্তও সম্ভবত। ইকুয়েডরের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে উনদাভকে খেলানো হবে কি না, এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘অবশ্যই। কেন আমি তার ছন্দ নষ্ট করতে যাবো? সে দুবার বদলি হিসেবে নেমেছে, দুবারই গোল করেছে।’
আইভরি কোস্টের বিপক্ষে জোড়া গোল করে আরও একটি কীর্তি গড়েছেন তিনি। মিরোস্লাভ ক্লোসার পর বিশ্বকাপের নিজের প্রথম দুই ম্যাচেই গোল করার দিক দিয়ে দ্বিতীয় জার্মান ফুটলাবর বনে গেছেন তিনি। ক্লোসা এই কীর্তি গড়েছিলেন ২০০২ এর বিশ্ব আসরে।
যে উনদাভের পারফরম্যান্স নিয়ে বিশ্ব মিডিয়া এখন প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সেই উনদাভের কৈশোরে আছে এক প্রত্যাখ্যান ও কঠোর পরিশ্রমের গল্প। অবশ্য এমন প্রত্যাখ্যান দুয়েকবার জীবনে না এলে বৃহৎ কোনো সফলতা ধরাও দেয় না। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি গায়ের ছোটখাটো গড়নের কারণে বাদ পড়েন ওয়ার্ডার ব্রেমেনের দল থেকে। অর্থ্যাৎ তার দল থেকে বাদ পড়া বা বাদ পড়ার অনিশ্চতার গল্পের শুরুটা কৈশোরেই।আর্থিক টানাপোড়েনে হতে পারছিলেন না পুরোদমে পেশাদার ফুটবলারও। ১৭ বছরে ১২০ ইউরো সাপ্তাহিক বেতনে জার্মানির সেমি-প্রফেশনাল চতুর্থ বিভাগের ক্লাব এইচভি হ্যালেভেলসে যোগ দিয়ে ফুটবল খেলা চালিয়ে যান কারাখানায় ৮ঘন্টা কাজের সঙ্গে ভারসাম্য ঠিক রেখে। যেখানে তিনি লেজার মেশিন পরিচালনা করতেন।
ফুটবল ও কারখানার সেই দীর্ঘ ৮ ঘন্টার কাজ, দুটো মিলে কতটা সীমাহীন পরিশ্রম তাকে করতে হয়েছে এটি সহজেই অনুমেয়। সেই সময়কে স্মরণ করে এক সাক্ষাৎকারে উনদাভ বলেন, ‘ভোর ৪টায় ঘুম থেকে উঠতাম, কারখানায় কাজ করতাম, তারপর অনুশীলনে যেতাম। রাত ৮টার দিকে বাসায় ফিরতাম। পরদিন আবার একই রুটিন। শুধু ফুটবলের টাকায় বাঁচা সম্ভব ছিল না, তাই কাজ করতেই হতো।’কারখানার কাজ ও ফুটবল দুটোই একাগ্রতার সঙ্গে চালিয়ে যান উনদাভ। একসময় দেখেন ফুটবলার হিসেবে সেই পরিশ্রমের সফলতার মুখও। ২০২০ সালে যোগ দেন বেলজিয়ামের ক্লাব ইউনিয়ন সেন্ট-গিলেইসে। ক্লাবটিকে শীর্ষ লিগে তুলতে রাখেন অনবদ্য ভূমিকা। দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে সেই মৌসুমে ২৫ গোল করে সবার নজর কাড়েন। সেই পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবে ডাক পান ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ব্রাইটনে।তবে ইংল্যান্ডে হতাশ করেন প্রথম মৌসুমে। ২২ ম্যাচে করেন মাত্র ৫ গোল। পরে তাকে ধারে পাঠানো হয় স্টুটগার্টে। ক্লাবটি তাকে স্থায়ীভাবে দলে ভেড়ায়। ২০২৫-২৬ মৌসুমে বুন্দেসলিগায় ১৯ গোল করে গোলদাতাদের তালিকায় দ্বিতীয় হন তিনি। তার ওপরে ছিলেন কেবল হ্যারি কেইন। আর সেই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সই তাকে এনে দেয় জার্মানির বিশ্বকাপ দলে জায়গা।
জীবনের প্রতিটি ধাপেই থাকে মানুষের থাকে কঠোর পরিশ্রম ও সংগ্রামের গল্প। উনদাভের গল্পটা ঠিক যেন তেমনই। কৈশোরের কারখানার শ্রমিক হয়েও সেমি-প্রফেশনাল লিগে খেলা চালিয়ে নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখা ও পেট চালানো উনদাভই এখন বনে গেলেন চলমান বিশ্বকাপে জার্মানির টানা দুই ম্যাচেরই জয়ের নায়ক। আর তাতেই এক যুগের অচলায়তন ভেঙে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠেছে জার্মানরা।
দেনিজ উনদাভের এই গল্প নিশ্চিতভাবেই অনুপ্রাণিত করবে তরুণ ফুটবলারদের। বার্তা দেয়, সফল হতে প্রত্যাখ্যানেরও প্রয়োজন আছে। তবে পরিশ্রমের সঙ্গে করা যাবে না আপস। কেবল ফুটবলার নয়, যেকোনো পেশার মানুষের কাছেই উনদাভ বিরাট অনুপ্রেরণা হয়েই থাকবেন নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার জন্য।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়