প্রতিদিনের ডেস্ক:
ভারতে পাসপোর্টকে ঘিরে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল, পাসপোর্ট শুধু বিদেশ ভ্রমণের নথি নয়, এটি একজন ব্যক্তির ভারতীয় নাগরিকত্বেরও প্রমাণ। তবে সম্প্রতি ভারত সরকারের এক বক্তব্য সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেছেন, পাসপোর্ট মূলত একটি ভ্রমণ নথি (ট্রাভেল ডকুমেন্ট)। এটি নাগরিকত্বের চূড়ান্ত বা আইনি প্রমাণ নয়। ফলে শুধু পাসপোর্ট থাকলেই কোনো ব্যক্তি নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত সব সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হয়ে যান না।সরকারের এই অবস্থান সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, সরকার নিজেই কঠোর যাচাই-বাছাই ও পুলিশ ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে পাসপোর্ট ইস্যু করে, তাহলে সেটি কীভাবে নাগরিকত্বের প্রমাণ না হয়?ভারতের খ্যাতনামা গীতিকার জাভেড আখতার সরকারের অবস্থানকে ‘অযৌক্তিক’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি পাসপোর্টধারীকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে পাসপোর্ট ইস্যুর ভিত্তিই বা কী?একই ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন আদিত্য ঠাকরে। তার মতে, এ ধরনের বক্তব্য বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর কাছে ভারতীয় পাসপোর্টের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।তবে সরকারের দাবি, আইনগতভাবে পাসপোর্ট কখনোই নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়নি। সরকারি সূত্রগুলোর মতে, পাসপোর্ট আইন, ১৯৬৭ অনুযায়ী বিশেষ পরিস্থিতিতে অ-নাগরিক ব্যক্তিকেও পাসপোর্ট দেওয়া সম্ভব। এ কারণে শুধু পাসপোর্টের মালিক হওয়া নাগরিকত্বের অকাট্য প্রমাণ নয়।এ বিষয়ে ২০১৩ সালে বোম্বে হাইকোর্টের একটি রায়ও উল্লেখ করা হচ্ছে। আদালত তখন বলেছিল, পাসপোর্ট থাকলেই কাউকে নাগরিক হিসেবে চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করা যায় না।সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নাগরিকত্ব নির্ধারণের বিষয়টি নিয়ন্ত্রিত হয় সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট, ১৯৯৫ বা নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে। এই আইন অনুযায়ী একজন ব্যক্তির নাগরিকত্ব যাচাই করা হয়।সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক নিরুপামা মেনন রাও বলেছেন, পাসপোর্ট ও নাগরিকত্ব নিয়ে জনসাধারণের ধারণা এবং আইনি বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তার মতে, একটি আইন পাসপোর্ট ইস্যু নিয়ন্ত্রণ করে, আরেকটি আইন নাগরিকত্ব নির্ধারণ করে।তবে বাস্তবে পাসপোর্টকে এখনও বিশ্বের অধিকাংশ দেশ একজন ব্যক্তির নাগরিকত্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরিচয়পত্র হিসেবে গ্রহণ করে। ফলে অনেকের মতে, আইনি ব্যাখ্যা যাই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের কাছে পাসপোর্টের গুরুত্ব কমছে না।এদিকে বিতর্কের মধ্যেই নতুন প্রশ্ন উঠেছে—তাহলে ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রকৃত প্রমাণ কী?সরকারি সূত্রগুলোর মতে, জন্মসূত্রে নাগরিক হলে জন্মসনদ, আর নাগরিকত্ব অর্জনের মাধ্যমে নাগরিক হলে নাগরিকত্ব সনদ হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি নথি।তবে সমালোচকদের বক্তব্য, আধার কার্ড, প্যান কার্ড, ভোটার পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট—এত ধরনের সরকারি পরিচয়পত্রের যুগে সাধারণ মানুষের জন্য নাগরিকত্ব প্রমাণের বিষয়টি আরও স্পষ্ট ও সহজ হওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় এই বিতর্ক ভবিষ্যতেও চলতেই থাকবে।
