স্বজনদের অপেক্ষায় ধ্বংসস্তূপের পাশে হাজারো মানুষ, ভেনেজুয়েলায় নিহত বেড়ে ৯২০

প্রতিদিনের ডেস্ক:
ভয়াবহ ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত ভেনেজুয়েলায় ধ্বংসস্তূপের পাশে প্রিয়জনের ফিরে আসার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন হাজারো মানুষ। কেউ খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে স্বজনদের খোঁজ করছেন, কেউ আবার উদ্ধারকর্মীদের দিকে তাকিয়ে আছেন শেষ আশায়। এদিকে শুক্রবার পর্যন্ত দেশটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৯২০ জনে পৌঁছেছে। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন ৫১ হাজারের বেশি মানুষ, আর উদ্ধারকাজে সরকারি সহায়তা অপ্রতুল বলে অভিযোগ করেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর বাসিন্দারা জানান, বুধবার গভীর রাতে আঘাত হানা ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর থেকে প্রতিবেশী, স্বজন ও স্বেচ্ছাসেবীরাই মূলত উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। সরকারের পক্ষ থেকে বড় ধরনের জরুরি তৎপরতার দাবি করা হলেও বাস্তবে উদ্ধারকারী দলের উপস্থিতি খুবই সীমিত বলে অভিযোগ করেন তারা।ভূমিকম্পের প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পার হওয়ার পরও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া জীবিতদের উদ্ধারের আশা ছাড়েননি স্বজনরা। মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো বলছে, বড় ধরনের ভূমিকম্পের পর প্রথম দুই থেকে তিন দিন জীবিত উদ্ধার অভিযানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে খাবার ও পানির ব্যবস্থা থাকলে এর পরও কেউ কেউ বেঁচে থাকতে পারেন।শুক্রবার রাতে কর্তৃপক্ষ জানায়, উদ্ধারকাজ ব্যাহত হওয়ায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা এলাকায় প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বিশেষ অনুমতি ছাড়া সেখানে প্রবেশ করা যাবে না।একই সময়ে আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়তে থাকে। বিভিন্ন দেশ থেকে উদ্ধারকারী দল ভেনেজুয়েলায় পৌঁছেছে বা পৌঁছানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ বলেন, “প্রতিটি উদ্ধার হওয়া জীবনই একটি অলৌকিক ঘটনা।”তিনি দুর্যোগের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে সরকার স্বচ্ছ থাকবে বলেও আশ্বাস দেন।
স্বজনদের অনুসন্ধানে মরিয়া
উত্তর ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন এলাকায় পরিবারগুলো ভেঙে পড়া কংক্রিট ও লোহার স্তূপের মধ্যে স্বজনদের খুঁজে বেড়াচ্ছে। একই সঙ্গে তারা তাদের ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িঘরের যা কিছু অবশিষ্ট আছে, তা উদ্ধারেরও চেষ্টা করছেন।
লা গুয়াইরার বাসিন্দা নাজারেথ হিমেনেজ দেখেছেন, প্রতিবেশীরা হাতুড়ি ও বৈদ্যুতিক যন্ত্র দিয়ে কংক্রিট ভেঙে তার ভাই-বোন, ভাগ্নে-ভাগ্নি ও বন্ধুদের উদ্ধারের চেষ্টা করছেন।তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমরা কীভাবে তাদের বের করব?” ধ্বংসস্তূপ সরাতে ভারী যন্ত্রপাতি পাঠানোর জন্য তিনি ভেনেজুয়েলা সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান।তিনি বলেন, “এখনো ভেতরে জীবিত মানুষ আছে।”সরকারি কর্মীরা দুর্গতদের মধ্যে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করছেন।
দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ বলেন, “জীবিত উদ্ধারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সরকার নিবিড় উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে।” তিনি আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল ও ত্রাণ সহায়তাকে স্বাগত জানান এবং জানান, আরো সহায়তা পথে রয়েছে।
সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
গত জানুয়ারিতে সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দায়িত্ব নেন ডেলসি রদ্রিগেজ। অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেই তাকে এ দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। নাগরিকদের তৈরি বিভিন্ন অনলাইন ডাটাবেজে কয়েক হাজার নয়, নিখোঁজদের তালিকা আরো দীর্ঘ। যদিও যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় কিছু তথ্য পুনরাবৃত্তি বা যাচাইবিহীন হতে পারে।
শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত ৩ হাজার ৩০০ জনের বেশি আহত এবং ২৪৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
লাখ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) ধারণা করছে, এ দুর্যোগে ভেনেজুয়েলার প্রায় ৬৭ লাখ ৬০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। এর মধ্যে রাজধানী কারাকাসের প্রায় ২০ লাখ বাসিন্দাও রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আরো বেড়ে যায়।আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের আমেরিকা অঞ্চলের পরিচালক লয়েস পেস বলেন, “অনেক মানুষ এখনো আতঙ্কে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িতে ফিরতে সাহস পাচ্ছেন না।”আশা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে এলেও অসংখ্য পরিবার খোলা আকাশের নিচে আরেকটি রাত কাটিয়েছে। অন্যদিকে, অনেকেই স্বজন হারানোর শোক করছেন।
ওমর রেয়েস নামে এক ব্যক্তি বলেন, “আমি একা হয়ে গেছি।” তার দুই সন্তান এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। তিনি জানান, তার ২০ জন স্বজন অন্তত নিহত হয়েছেন।
ত্রাণসংকট
মাইকেতিয়া শহরে সুপারমার্কেট, ফার্মেসি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকানের সামনে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। এক পর্যায়ে ডায়াপারের একটি প্যাকেট নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে।ভারী যানজট ও মোটরসাইকেলের কারণে উদ্ধারকাজ বারবার ব্যাহত হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে কোনো শব্দ শোনার জন্য উদ্ধারকারীরা নীরবতা বজায় রাখার আহ্বান জানালেও অনেক চালক হর্ন বাজাতে থাকেন।ভেনেজুয়েলার প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে কাতিয়া লা মার এলাকায় কিছু মানুষ দোকান থেকে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য লুট করে। পরে নিরাপত্তা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। কাছেই একটি ওষুধের দোকানের পার্কিং এলাকাকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়েছে।সেখানে ২৮ বছর বয়সী ইউলেইদি কাদেনাস ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে তার ছেলে, মা ও ভাইয়ের জীবিত ফিরে আসার অপেক্ষা করছেন।তিনি বলেন, “আমি ধ্বংসস্তূপে উঠে তাদের নাম ধরে ডাকছিলাম, কিন্তু কেউ সাড়া দেয়নি। আমি এখনো তাদের অপেক্ষায় আছি।”কিছুক্ষণ পর উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে আরো একটি মরদেহ উদ্ধার করেন। তবে সেটি তার মায়ের ছিল না।
আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ছে
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র, এল সালভাদর, সুইজারল্যান্ড ও কলম্বিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ৮৬১ জন বিদেশি উদ্ধার বিশেষজ্ঞ উদ্ধার অভিযানে যোগ দিয়েছেন। আগামী কয়েক দিনে আরো দল ভেনেজুয়েলায় পৌঁছাবে।
জাতিসংঘও জানিয়েছে, ২৫টি আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলের প্রায় এক হাজার সদস্যকে ভেনেজুয়েলায় মোতায়েন করা হচ্ছে।ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানান, তিনি শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা অতিরিক্ত উদ্ধারকর্মী ও জরুরি সরঞ্জাম পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়