উদ্যোক্তাদের জন্য বড় সুযোগ

আধুনিক অর্থনীতির গতিশীলতা বহুলাংশেই নির্ভরশীল সুস্থ-সবল ব্যাংকিং খাতের ওপর। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে দেশের ব্যাংক খাতের অবস্থা ভালো নয়।আকাশচুম্বী খেলাপি ঋণের কারণে বেশির ভাগ ব্যাংকের নতুন ঋণ প্রদানের সক্ষমতা কমে গেছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে এসেছে। আবার অনেক ব্যাংক তারল্য সংকটে ভুগছে। এমন পরিস্থিতিতে খেলাপি ঋণের বোঝা কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে।এর ফলে ব্যাংকগুলো চাইলে সুদ বাদ দিয়ে ঋণ বাবদ প্রদত্ত আসল অর্থ ফেরত নিয়ে খেলাপি ঋণ কমাতে পারবে।কয়েক বছর ধরে ব্যবসায়ীরা অত্যন্ত প্রতিকূল অবস্থা মোকাবেলা করছেন। করোনা মহামারির ভয়াবহ সময়ে টোটাল লকডাউনের মতো পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়েছে। এর পরপরই শুরু হয় ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ।সেই যুদ্ধ এখনো চলছে। সর্বশেষ ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিবেশকে ব্যাপকভাবে নাড়া দেয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, টাকার বিপরীতে ডলারের দর বৃদ্ধি ইত্যাদি কারণে বড় ধরনের লোকসানে পড়তে হয় অনেক ব্যবসায়ীকে। ফলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেক ব্যবসায়ী ঋণখেলাপি হয়ে পড়েছেন। তাঁদের জন্যও এটি একটি বড় সুযোগ হতে পারে।
সুদ ছাড়াই আসল ঋণ শোধ করা গেলে তাঁরা যেমন ঋণখেলাপির দায় থেকে মুক্ত হতে পারবেন, তেমনি নতুন করে ব্যবসায় গতি ফেরানোর পরিকল্পনা করতে পারবেন।বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত যাঁরা বিশেষ পুনঃ তফসিল সুবিধা পেয়েছেন, তাঁরাও এই সুদ মওকুফের সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হবেন। মন্দ ঋণ চিরতরে মুছে ফেলে ব্যাংকের ব্যালান্স শিট সাফসুতরো করতে এবং খেলাপিদের খেলাপি তকমা থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই নতুন কৌশল নিয়ে এসেছে বলে মত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। নতুন সার্কুলারের আওতায় খেলাপিরা শুধু ঋণের আসল টাকা পরিশোধ করে এককালীন নিষ্পত্তি করার সুযোগ পাবেন; যার অর্থ, তাঁদের কোনো সুদ দিতে হবে না। তবে এটি কোনো বাধ্যবাধকতা নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক সুদ মওকুফের সুযোগ দিয়েছে মাত্র, কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়নি। এক্সিট পলিসি অনুযায়ী, যেকোনো ব্যাংক তাদের খেলাপি ঋণ কমাতে চাইলে এই সুযোগ নিতে পারে। আবার না-ও নিতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল পাঁচ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা। কিন্তু এর বিপরীতে আরোপিত ও অনারোপিত সুদের পরিমাণ কত, তা বাংলাদেশ ব্যাংকও জানে না। কারণ এমন কোনো হিসাব ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে সংগ্রহ করে না বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান ৩০ জুন মুদ্রানীতি ঘোষণা অনুষ্ঠানে জানান, উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে খেলাপি ঋণ কমানো অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে খেলাপি ঋণের উচ্চহার ব্যাংকগুলোর সম্পদের গুণগত মান, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
আমরা আশা করি, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগ সফল হবে। ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের স্থবিরতার কারণ হয়ে ওঠা খেলাপি ঋণ থেকে ব্যাংকগুলোকে মুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়িয়ে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি সঞ্চার করতে হবে।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়