২৪শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

অভয়নগরে প্রশাসনের নাকের ডগায় কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরি : হুমকিতে পরিবেশ-জনস্বাস্থ্য

অভয়নগর সংবাদদাতা
প্রতিনিয়ত অবৈধ কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরির কারখানা ভেঙ্গে দেওয়া হলেও, কোন অজানা শক্তির বলে আবার প্রশাসনের নাকের ডগায় গড়ে উঠেছে এসকল কারখানা । সরকারি অনুমোদন ছাড়া কিভাবে এসকল কারখানা স্থাপন করছে তানিয়ে প্রশ্ন জনমনে। যশোরের অভয়নগর উপজেলার সিদ্দিপাশা ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামে অবৈধ চুল্লিতে অবাধে কাঠ পুড়িয়ে তৈরি করা হচ্ছে কয়লা। বিভিন্ন বনজ ও ফলজ গাছ কেটে এসব চুল্লিতে কাঠ সরবরাহ করা হচ্ছে। এসব চুল্লি থেকে নির্গত ধোঁয়ায় পরিবেশ ও জীববৈচিত্রের মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। ফলে হুমকিতে পড়ছে জনস্বাস্থ্য, কমে যাচ্ছে জমির উর্বরতা। অভিযান চালিয়ে ভেঙ্গে দিলেও আবার তৈরী করা চুল্লী। সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার সিদ্দিপাশা ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামে নদীর পাড় ঘেঁষে স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় গড়ে উঠেছে শতাধিক কয়লা তৈরির বিশেষ চুলা। দিন-রাত এই চুলায় আগুন দেয়া থাকে। চুলাগুলো রাস্তার পাশে হওয়ায় পথচারীদের চলাচলে অনেক কষ্ট হয়। কারণ একদিকে বনজ সম্পদ ধ্বংস হচ্ছে, অপরদিকে সৃষ্ট ধোঁয়ায় তৈরি হচ্ছে শ্বাসকষ্ট জনিত নানা ব্যাধি। পরিবেশ ও জীববৈচিত্রেরও মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।

জানা যায়, উপজেলার সিদ্দিপাশা ইউনিয়নের সিদ্দিপাশা গ্রামের কামরুল ইসলাম, আলাউদ্দিন আলী, হাবিব, তসলিম, হারুন মোল্যা, জিয়া মোল্যা, নুরুল ইসলাম শতাধিক কয়লা তৈরির চুলা নিয়ন্ত্রণ করেন। তারা সকলেই স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি। স্থানীয়রা জানায়, কারো কোনো কথার তোয়াক্কা তারা করেন না। রাস্তার পাশে কয়লা তৈরির কারখানা স্থাপন করে সারাদিন খোলা জায়গায় কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরি করছে। তারা প্রশাসনকে ফাঁকি দিয়ে এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছে। অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসব কয়লা কারখানায় দেদারছে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো অনুমোদন। অনুমোদন ছাড়াই এসব কয়লা তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে। শত বিধিনিষেধ থাকার পরও জনবসতি এলাকায় ও ফসলি জমি নষ্ট করে এসব কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। পথচারীরা জানান, মাটি, ইট ও কাঠের গুঁড়া মিশিয়ে তৈরি করা চুল্লিতে প্রতিদিন শত শত মণ কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। যার ফলে সৃষ্টি হচ্ছে ধোঁয়া। রাস্তার পাশ দিয়ে চলাচল করার সময় চোখ জ্বলতে জ্বলতে পানি চলে আসে। দেখা যায়, চুল্লির মধ্যে সারিবদ্ধভাবে কাঠ সাজিয়ে একটি মুখ খোলা রেখে অন্য মুখগুলো মাটি এবং ইট দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়। খোলা মুখ দিয়ে আগুন দেয়া হয় চুল্লিতে। আগুন দেয়া শেষ হলে সেটিও বন্ধ করে দেয়া হয়। প্রায় ১০ থেকে ১৫ দিন পোড়ানোর পর চুলা থেকে কয়লা বের করা হয়। প্রতিটি চুল্লিতে প্রতিবার ২৫০ বা ৩০০ মণ কাঠ পোড়ানো হয়। পরে এই কয়লা শীতল করে ব্যবসার উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। চুল্লি মালিক কামরুল ইসলাম জানান, কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরি অবৈধ হলেও কিছু করার নেই। তারা নিজেদের জমির ওপর ব্যবসা করে যাচ্ছে। কিছু লোকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে চুল্লি শ্রমিক জানান, একটি চুল্লিতে এক সপ্তাহে কমপক্ষে প্রায় ৪ শত মণ কাঠ পোড়ানো হয়। প্রতি বস্তা কয়লার দাম প্রায় ৪শ টাকা। হাজার হাজার টন কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। তারা না ভাবছে পরিবেশের কথা, না জনস্বাস্থ্যের। পথচারী জামাল হোসেন জানান, কয়লা তৈরির চুল্লির কালো ধোঁয়ায় শিশুসহ এলাকার মানুষের মধ্যে শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগ দেখা দিচ্ছে। দূষিত হচ্ছে এলাকার পরিবেশ। নষ্ট হচ্ছে ফসলি জমি। সেইসঙ্গে জীববৈচিত্রও হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত। বিভিন্ন গাছপালায় মড়ক দেখা দিয়েছে। গাছের ফল-মুকুল নষ্ট হয়ে যায়। নিয়মিত এভাবে চলতে থাকলে নানা প্রকার প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও রোগবালাই বৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন সচেতন এলাকাবাসী। কলেজ পড়ুয়া রায়হান বলেন, চুল্লির ধোঁয়ায় চোখ জ্বালাপোড়া করে, খুশখুশে কাশি হয়। সারাদিন প্রচন্ড গন্ধে রাস্তা দিয়ে চলাচল করা যায় না। অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডাঃ আলীমুর রাজিব বলেন, কয়লা তৈরিতে কাঁচা কাঠ পোড়ানোয় কার্বন ও সিসা নির্গত হয়। যে এলাকায় এসব চুলায় কাঠ পুড়িয়ে ধোঁয়ার সৃষ্টি করা হচ্ছে, সেখানে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। ফলে শিশুসহ বয়স্করাও ফুসফুসের সমস্যা, অ্যাজমা, শ্বাসকষ্টজনিত রোগ ও এলার্জির সমস্যার সম্মুখীন হবে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদী এই ধোঁয়া নিলে ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারে। অভয়নগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার কেএম আবু নওশাদ বলেন, আগে একবার ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছিল। পরিবেশ অধিদপ্তরের সাথে কথা হয়েছে। আমি আবারও যাব। সরকারি অনুমোদন ছাড়া কয়লার কারখানা স্থাপন করা যাবে না। খুলনা বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মোঃ ইকবাল হোসেন বলেন, আমরা ইতিপূর্বে চুল্লিগুলো তিনবার ভেঙ্গে দিয়েছি এবং জরিমানা করা হয়েছে। আবারও ভেঙ্গে দেবো।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়