সৈকত হোসেন
যশোরে চাঞ্চল্যকর আলী হোসেন হত্যাকাণ্ডে ৪দিনেও কোনো গ্রেফতার নেই। ঘটনার রাতেই খুনি ও তাদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল শনাক্তকরণে সমর্থ হয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। খুনিদের নাম লোকমুখেও ছড়িয়ে পড়ে। তবে এখন পর্যন্ত খুনিদের টিকনি ছুঁতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। তবে হত্যায় ব্যবহৃত কাটা রাইফেল-ম্যাগজিন ও বিপুল পরিমাণ গুলি উদ্ধার হয়েছে। শনিবার রাতে কোতয়ালি থানা পুলিশ এসব অস্ত্র-গোলা বারুদ উদ্ধার করে বাহাদুরপুর গ্রামের আবু সুফিয়ান নামে এক ব্যক্তির পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে। এই আবু সুফিয়ান আলোচিত সন্ত্রাসী নবাবের শ্বশুর। শনিবার রাতে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। তবে আজ রোববার ( ৯ জুন) পর্যন্ত আলী হোসেন হত্যায় মামলা হয়নি। মামলা নেই, গ্রেফতারও নেই (!)- পরিস্থিতিকে রহস্যঘেরা বলছেন স্থানীয়রা। একাধিক সূত্রের দাবি-আলী হোসেনের মা মঞ্জুয়ারা বেগমকে শনিবার রাতে থানায় দেখা যায় কিন্তু শেষ পর্যন্ত মামলা রেকর্ড হয়নি। কী কারণে মামলা হচ্ছে না-তা নিশ্চিত করেনি কোনো সূত্র। খোঁজ-খবরে জানা গেছে-কিসমত নওয়াপাড়ায় নবাব এখনো মূর্তিমান এক আতঙ্কের নাম। চরমপন্থী সংগঠন থেকে তার বিএনপি’র রাজনীতিতে প্রবেশ। তার বিরুদ্ধে হত্যা-মাদক ও অস্ত্র কারবারসহ নানা অপরাধের ডজনখানেক মামলা রয়েছে। আলী হোসেন হত্যাকাণ্ডের পর ফের আলোচনার শীর্ষে উঠে এসেছে কুখ্যাত সন্ত্রাসীর নাম। যশোর সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে এক নারী প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেন নবাব। কুখ্যাত দাগী চিহিৃত একজন সন্ত্রাসী কীভাবে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতে পারে-তা নিয়ে রয়েছে যেমন নানা জল্পনা-কল্পনা, তেমনি একটি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে রাতারাতি কীভাবে লাপাত্তা হতে পারে-তা নিয়েও রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ৬ জুন দিবাগত মধ্যরাতে যশোর-মাগুরা সড়কের বাহাদুরপুর তেঁতুলতলায় দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত মাটি ব্যবসায়ী আলী হোসেন। উপশহর ই-ব্লকে একটি খাওয়া-দাওয়ার অনুষ্ঠান শেষে মোটরসাইকেলযোগে বাহাদুরপুরের বাড়িতে ফিরছিলেন আলী। তিনি ড্রাইভ করছিলেন। সাথে ছিলেন তার আরেক সহযোগী যুবক। প্রথমদিকে চাউর হয়েছিল তারা এক মোটরসাইকেলে ৩ জন ছিলেন। ওই রাতেই একটি গোয়েন্দা সংস্থা নিহত আলীর দুই সহযোগীকে হেফাজতে নেয় বলে খবর রটে। যদিও একদিন পর শোনা যায়-তিন জন না, তারা দু’জন ছিলেন। আলী হোসেন সদর উপজেলার বাহাদুরপুর পশ্চিম পাড়া এলাকার আব্দুর রহমানের ছেলে। তিনি যুবলীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন। তবে পদ-পদবীতে ছিলেন না। নিহত আলী হোসেনের বিরুদ্ধে চাঁচড়ার ভাতুড়িয়ার আলোচিত সন্ত্রাসী ইমরোজ হত্যাসহ মাদক, মারামারি ও দ্রুত বিচার আইনে ৪টি মামলা রয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ সূত্রমতে-আলী হোসেনকে প্রথমে একটি গুলি করে সন্ত্রাসী নবাব কিন্তু সেটি লক্ষ্যভ্রস্ট হয়। এ সময় আলী ও সোয়ান শেখ দৌড় দেন। কিন্তু পিছু নেয়া মোটরসাইকেলের পেছনে থাকা কিসমত নওয়াপাড়ার নবাব আরও একটি গুলি ছুড়ে। যা আলী হোসেনের পা ভেদ করে। ঘটনাস্থলে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন মাটি ব্যবসায়ী আলী। এ সময় নবাব মোটরসাইকেল থেকে নেমে প্রথমে আলীর মাথায় গুলি করে একটি, পরে নবাব এবং সিরাজ আলীর পিঠে ৩টি গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে ফের মোটরসাইকেল করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। নবাব-সিরাজের সহযোগী সন্ত্রাসী টোকন রেফে টুকুন মোটরসাইকেল ড্রাইভ করছিলেন। নিহত আলী হোসেনের মোটরসাইকেলে থাকা সোহান শেখ চরম আতঙ্কিত। তিনি পুরো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। রীতিমত ট্রমায় ভুগছেন এই যুবক। যদ্দুর জানা গেছে-তাদের ফলো করছিল পেছন থেকে ছুটে আসা একটি মোটরসাইকেল। আলী হোসেন তাদের সন্দেহ করছিলেন। তিনিও দ্রুত মোটরসাইকেল চালিয়ে বাড়ি পৌঁছানোর চেষ্টা করেন কিন্তু বিধিবাম, ভাগ্য তার সহায় হয়নি। একটি গুলি পা ভেদ করলে লুটিয়ে পড়েন। এ সময় নবাব পেছনের মোটরসাইকেল থেকে নেমে বীরদর্পে আলীর কাছে ছুটে যায়। এ সময় আলী বাঁচতে আকুতি-মিনতি করছিলেন কিন্তু নবাবের মন গলেনি। রীতিমত কপালে অস্ত্র ঠেকিয়ে একটি ও পিঠে আরও ৩ রাউন্ড গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে ফের মোটরসাইকেল যোগে ঘটনাস্থল ছেড়ে যায়। তার ভাষ্যমতে-চোখের নিমিষে সব শেষ হয়ে যায়। মিনিটখানেক সময় লাগে মৃত্যু নিশ্চিত করতে। তিনি বলেন-ওরা চলে যাওয়ার পর আমি চিৎকার করি। তখন স্থানীয়রা এসে আলীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেন। ওই সময় জরুরী বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন ডা. সুজায়েত। তিনি আলীকে মৃত ঘোষণা করেন। সোহান শেখ ও নিহতের পরিবারের ভাষ্যমতে, রাজনৈতিক বিরোধ ছিল না। দু’জন তাদের পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে ভোট প্রচারণা চালান। আলী মোটরসাইকেল প্রতীক ও নবাব ঘোড়া প্রতীকের ভোট করেন। আলী হোসেনের পছন্দের প্রার্থী বিজয়ী হন। এ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার তিনি যে প্রীতিভোজের আয়োজন করেন, সেখানেও নবাবকে দাওয়াত দেন আলী। তবে নবাবকে অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি। দেখা হয় পথে, তখন নবাব ছিল মৃত্যুদূৎ। আলীর জীবন কেড়ে সটকে পড়েন নবাবসহ দুই সন্ত্রাসী।
নিহতের বৃদ্ধ পিতা আব্দুর রহমান বলেন, ঘটনার রাতেই বলেছিলেন শুনছি নবাব আমার ছেলেকে গুলি করে মেরেছে। তিনি দুই মেয়ে ও এক ছেলেন জনক। আলীর ছেলে মেয়ে নেই। ৮ মাস আগে তিনি বিয়ে করেন। এলাকায় মাটি-বালুর ব্যবসা নিয়ে বিরোধ থাকতে পারে উল্লেখ করে পুত্রহারা বাবা বলেন-বছর কয়েক ধরে আলী হোসেন এলাকায় বিচার শালিস করতেন। এ কারণে কেউ তার ওপর ক্ষুব্ধ থাকতে পারে। তবে উপজেলা নির্বাচন ঘিরে তাদের বিরোধ চরমে ওঠে। উপশহরে নবাব, তার সহযোগী সিরাজ ও টুকুনের সাথে আলীর বাকবিতন্ডাও হয়। অপর কয়েকটি সূত্রমতে-ঘটনার ২ থেকে ৩ দিন আগে আলী নবাবের বাড়িতে গিয়ে অশ্লীল ভাষায় গালি করে আসেন। পরে নিস্পত্তির জন্য তিনি প্রীতিভোজে নবাবকে দাওয়াতও দিয়েছিলেন কিন্তু নবাব আলীর গালাগাল হজম করতে পারেননি। হত্যা করেই প্রতিশোধ নিয়েছে নবাব। নিহত আলী হোসেনের স্ত্রী লুপা খানম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমাকে যারা বিধবা করেছে, তাদের শাস্তি চাই। আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই। এই হত্যায় আমাদের পরিবার পঙ্গু হয়ে গেছে-বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন নববধূ লুপা।

