বিশেষ প্রতিবেদক
শনিবার (৬ জুলাই) মুষলধারে টানা সময় বৃষ্টি হয়েছে। এতে শহরের নিম্নাঞ্চল পানির নিচেই তলিয়ে গেছে। মাঝারি বৃষ্টিপাত হলেও জলাবদ্ধতা দূর হতে সময় লাগে দুই-তিনদিন। ভারি বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতা দূর হতে সপ্তাহখানেক সময় লাগে। কয়েক বছর ধরে চলছে এ অবস্থা। শনিবার যশোর রেলস্টেশন রোডে কোমরপানিতে ডুবতে দেখা গেছে। শহরে খড়কি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, শাহ আবদুল করিম সড়কের সরকারি মাইকেল মধুসূদন (এমএম) কলেজের দক্ষিণ ফটক (গেট) থেকে খড়কি মোড় হয়ে পীরবাড়ী, কবরস্থান ও আপন মোড়ে বৃষ্টির পানি জমেছে। ওই এলাকার বাসিন্দা যশোর সরকারি এমএম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হামিদুল হক শাহিন বলেন, ‘খড়কি এলাকাটা তুলনামূলক নিচু। রাস্তার পাশে পয়োনিষ্কাশনের নালা দিয়ে অন্য এলাকার পানি আসে। ওই পানি বের হতে পারছে না। পানি জমে থাকায় বিটুমিনের আস্তরণ উঠে রাস্তার মধ্যে বড় বড় খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। পৌরসভার কাছে পানি নিষ্কাশন ও সড়ক সংস্কারের দাবি জানানো হয়েছে। কিন্তু কোনো কাজ হয় না। ভারি বৃষ্টি হলে শহরের নিম্নাঞ্চলের পানি ড্রেন উপচে রাস্তার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।’ শহরের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একটু বৃষ্টি হলেই শহরের অন্তত ১৫টি সড়কে পানি জমে যায়। এর মধ্যে টিবি ক্লিনিকপাড়া, শংকরপুর চোপদারপাড়া, ষষ্টিতলার বসন্ত কুমার রোড, পিটিআই, নাজির শংকরপুর, খড়কি রূপকথা মোড় থেকে রেললাইন, বেজপাড়া চিরুনিকল, মিশনপাড়া, আবরপুর ক্যান্টনমেন্ট, বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন সড়কে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। অনেক বাড়ি-ঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। দুর্ভোগে পড়েছেন পথচারী থেকে শুরু বস্তিবাসীও। যশোর পৌরবাসীর গলার কাটা হয়ে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। ৮০ কোটি টাকা ব্যয় করার পরও এই দুর্ভোগ থেকে পরিত্রাণ মেলেনি। ফের ৪০ কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এবারও পৌরবাসী ভরসা পাচ্ছেন না। তাদের অভিযোগ স্বস্তি দিতে নানা প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে আসছে যশোর পৌরসভা। কিন্তু কোনো উদ্যোগই কাজে আসছে না। একটু ভারি বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতার কবলে পড়তে হচ্ছে শহরবাসীকে। তলিয়ে যাচ্ছে রাস্তা, মার্কেট ও অলিগলি। নেপথ্য কারণ অপরিকল্পিতভাবে নেয়া এসব প্রকল্পে কেবল অর্থের অপচয় হয়েছে। সমানতালে চলেছে অনিয়ম-দুর্নীতি। পৌরসভার তথ্যমতে, জলাবদ্ধতা নিরসনে বিশেষ করে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে ২০০৯ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ৮০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে তারা। এরপরও জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি মেলেনি। এবার জলাবদ্ধতা নিরসনের পথ খুঁজতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ৪০ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। প্রায় দেড় দশকে এত রাস্তাঘাট ও ড্রেনের উন্নয়নের পরও পানি নিষ্কাশন না হওয়াকে অপরিকল্পিত উন্নয়নকেই দায়ী করছে সচেতন মহল। কয়েকদিন ধরে ভারি ও হালকা বৃষ্টিপাত হচ্ছে যশোরে। জানা যায়, শহরের ভেতর দিয়ে ভৈরব ও মুক্তেশ্বরী নামে দুটি নদ-নদী প্রবাহিত হয়েছে। এর মধ্যে ভৈরব নদ দিয়ে শহরের উত্তরাংশ ও মুক্তেশ্বরী নদী দিয়ে শহরের দক্ষিণাংশের পানি নিষ্কাশিত হয়। কিন্তু গত দেড় দশক শহরের দক্ষিণাংশের পানি মুক্তেশ্বরী নদী দিয়ে নামতে পারছে না। পয়োনিষ্কাশন নালার মাধ্যমে শহরের পানি হরিণার বিল দিয়ে মুক্তেশ্বরী নদীতে যেত। কিন্তু ২০১০ সালে হরিণার বিলে যশোর মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হয়। এরপর আশপাশে আরো অনেক স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এতে বিল দিয়ে পানি আগের মতো নিষ্কাশিত হতে পারছে না। যশোর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম শরীফ হাসান জানান, খড়কি অঞ্চলে রেলের কালভার্ট দখল ও ভরাটের কারণে পানি নিষ্কাশিত হচ্ছে না। আবার খালও ভরাট হয়ে গেছে। আমরা দুটি দপ্তরকেই চিঠি দিয়েছি। তারা আন্তরিক না হলে সমস্যার সমাধান হবে না। তিনি আরও জানান, শহরবাসীর অসচেতনতার কারণেও নালার পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। রাস্তা ও নালা সংস্কার, এবং নির্মাণের জন্য এমজিএসপি প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। পৌরসভার মেয়র হায়দার গণী খান পলাশ বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে আমরা কাজ করছি। মুক্তেশ্বরীর সঙ্গে সংযোগখাল স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছি। ৪০ কোটি টাকার প্রকল্পটি অর্থায়ন করছে বিশ্বব্যাংক। প্রকল্পের কাজ শুরু হলে শহরের জলাবদ্ধতা দূর হবে।’

