একই মায়ের উদরে জন্ম নেয় ছেলে ও মেয়ে সন্তান। কিন্তু সেখানে ছেলে সন্তানকে বেশি অগ্রাধিকার দেয়ার চর্চা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে আমাদের সমাজে। এই নিয়ে বিতর্কটা তখনই সামনে আসে, যখন অধিকারের কথা ওঠে। গতকাল ভোরের কাগজে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী পৈতৃক সম্পত্তিতে নারীর সমঅধিকার নিয়ে সমাজে বিভক্তির কথা উঠে এসেছে। তথ্যে বলা হয়েছে, সংবিধান থেকে শুরু করে বিভিন্ন আইন ও নীতিমালায় খুব জোরেশোরেই নারী-পুরুষের সমতার কথা বলা আছে। সমতা নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সনদ, আইনেও স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু সম্পদ-সম্পত্তিতে সমঅধিকারের ক্ষেত্রে সমাজ বিভক্ত। সরকারও এ ক্ষেত্রে পালন করছে নীরব ভূমিকা। ১৯৯৭ সালে নারী উন্নয়ন নীতিতে সম্পত্তির অধিকারের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমঅধিকারের কথা বলা হলেও পরে তা স্পষ্টাক্ষরে সংযুক্ত হয়নি; এমনকি নতুন আইনের উদ্যোগ নেয়া হয়নি ২৫ বছরেও। বিশ্বব্যাংকের এক রিপোর্টের তথ্যমতে, পৃথিবীর যেসব দেশে পুরুষের তুলনায় নারীর অর্থনৈতিক সুযোগ কম, বাংলাদেশ তার অন্যতম। বিভিন্ন আইনি বাধা এবং আইন না থাকাই এর কারণ। নারী ও মানবাধিকারকর্মীদের মতে, উত্তরাধিকারের বিষয়ে নারীর ক্ষেত্রে একেক ধর্মে একেকভাবে বলা আছে। যার কারণে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর কাছে এই উত্তরাধিকার আইন ভিন্ন। সম্পত্তিতে নারীর সমঅধিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে ধর্মীয় আইন যতটা না প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে, এর চেয়ে বেশি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সামাজিক নিয়ম; ধর্মান্ধতা। সেই ধর্মান্ধ জনগোষ্ঠীর চাপে পড়ে এ ক্ষেত্রে নীরব রয়েছে সরকারও। নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক বলেন, সম্পত্তিতে সমঅধিকার না থাকা নারীর অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আমরা দেখেছি, সম্প্রতি দুজন নারীর নিজস্ব ঠিকানা না থাকায় তারা সব পরীক্ষায় পাস করেও পুলিশের চাকরিতে নিয়োগ পাচ্ছিলেন না, যে কারণে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়েছিল। উত্তরাধিকারে সমান অধিকার না থাকায় বাল্যবিয়েসহ নানা ধরনের বৈষম্য-নির্যাতন যেমন বাড়ে, তেমনি জীবনভর নারীকে পরজীবী হিসেবে গণ্য হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করে। মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি বলেন, আমাদের দেশে নারীর ব্যক্তি অধিকার ধর্মীয় আচার-আচরণ দ্বারা নির্ধারিত। ধর্মের ভিত্তিতে নারীর অধিকার নির্ধারিত হলে নারী সমাজ বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। কাজেই সাংবিধানিক ধারার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তৃতীয় লিঙ্গ ও প্রতিবন্ধী নারীদের অধিকারসহ সব নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়ন জরুরি। অভিন্ন পারিবারিক আইনটি হবে অভিন্ন এবং অসাম্প্রদায়িক। এটি কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের জন্য হবে না। প্রকৃতপক্ষে জন্মকে কেন্দ্র করে কোনো মানুষকে বঞ্চিত করা একদম ঠিক নয়। কোনো পরিচয়েই কেউ বঞ্চনা ও বৈষম্যের স্বীকার যেন না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। এছাড়া এসব নিয়ে নানা দিক থেকে নানা মতামত উঠে আসছে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও পর্যায়ের মানুষ বিভক্ত হচ্ছে ব্যক্তিগত মতামত ও তর্কের সঙ্গে। এসব নিয়ে সামাজিক বিভাজন একেবারেই কাম্য নয়। বিভাজিত সমাজের সঙ্গে দেশকে সঠিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াও কঠিন বিষয়। তাই এই বিভাজন ঠেকাতে এবং সবাইকে এক অবস্থানে নিয়ে আসতে সরকারকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কঠিন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে হলেও এর সমাধান করতে হবে।
প্রসঙ্গ নারীর পৈতৃক সম্পত্তি
Previous article
Next article
আরো দেখুন
সূচকে তিন ধাপ পেছাল বাংলাদেশ
স্বাধীনতার ৫৫ বছর অতিক্রান্ত হলেও আমাদের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আজও অধরাই বলা যায়। বৈশ্বিক সূচকে তলানিতে পড়ে থাকে বাংলাদেশের নাম। কোনো সরকারের আমলেই এ ক্ষেত্রে...
ফসলের ব্যাপক ক্ষতি
হাওরাঞ্চলে ফসল বলতে একটাই—বোরো ধান। কৃষকের সারা বছরের খাদ্যের জোগান, আশা-ভরসা, স্বপ্ন—সবকিছু এই ফসল ঘিরে আবর্তিত হয়। মাত্র কয়েক দিনের বৃষ্টিতে সেই ধান এখন...

