১৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ২৯শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

ব্যাংক খাতে মূলধন ঘাটতি

ব্যাংক খাত মানুষের আস্থা, ভরসা ও নির্ভরতার প্রতীক। বিনিয়োগ-ব্যবসা-বাণিজ্য ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে অন্যতম সহায়ক হলো এই ব্যাংক খাত। কোনো দেশের অর্থনীতির রক্তপ্রবাহ হিসেবেও এই খাতকে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত কঠিন সংকট পার করছে। বিশেষ করে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে এসে ব্যাংক খাতে বড় অঙ্কের ঋণখেলাপি, আমানতের টাকা নামে-বেনামে লুটে নেওয়া, রাজনৈতিক প্রভাবে মাত্রাতিরিক্ত নৈরাজ্য সৃষ্টি করে মালিকানা বদল, স্বজনপ্রীতির নজিরবিহীন ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। সুশাসনের বদলে ব্যাংক খাতে অনিয়ম আর বিশৃঙ্খলার সীমাহীন রাজত্ব ছিল, যার ফলে পুরো ব্যাংক খাত আজ খাদের কিনারে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর নতুন গভর্নরের নেতৃত্বে বেশ কিছু ত্বরিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কঠিন সংকটে পড়া কয়েকটি ব্যাংককে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে টাকা ধার দেওয়া হয়। এর ফলে ব্যাংকগুলোতে যে ‘শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা’ ছিল, সেই পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে সংকট কাটেনি। মূলত খেলাপি ঋণ কিভাবে ব্যাংক খাতকে মূলধন ঘাটতির চোরাবালিতে নিয়ে যাচ্ছে সেই চিত্রই তুলে ধরা হয়েছে। গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ বেড়ে তিন লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকায় ঠেকেছে। এটি মোট ঋণের ২০.২০ শতাংশ। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি ব্যাংকের জন্য মন্দ বা লোকসান ক্যাটাগরির খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন হিসেবে রাখতে হয়। প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি হচ্ছে ব্যাংকগুলোর জন্য অবশ্য পালনীয় একটি নির্দেশনা, যার মাধ্যমে ব্যাংকে থাকা আমানতকারীর আমানতের সুরক্ষা দেওয়া হয়। অথচ এখন অনেক ব্যাংকেই প্রভিশন ঘাটতি বাড়তে দেখা যাচ্ছে। তথ্য বলছে, ভালো ও মন্দ ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রভিশন রাখতে পারছে না সরকারি ও বেসরকারি খাতের ১০টি ব্যাংক। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর শেষে এসব ব্যাংকে মোট প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ ৫৬ হাজার ৩৬ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। গত জুনে এটি ছিল ৩১ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা। অর্থাত্ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে ২৪ হাজার ৪৯২ কোটি টাকা। ১৬টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতিও ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি। অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক খাতে সুশাসন ফেরানোর এবং এই খাত থেকে লুটে নেওয়া টাকা ফেরানোর চেষ্টা করছে। একইভাবে পাচার হওয়া লাখ লাখ কোটি টাকা ফেরাতেও বিভিন্নমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু এসব পদক্ষেপ আরো ফলপ্রসূ ও জোরদার করতে হবে। ব্যাংক খাতে কঠোর নজরদারি করতে হবে। বিশেষ করে বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ আদায়ে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। লুটেরা ও পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ত্বরিত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। মোটকথা, ব্যাংক খাতকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে মানুষ আস্থা ফিরে পায় এবং তারা যেন ব্যাংকমুখী হয়। ব্যাংক খাতে আস্থা না ফিরলে অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য গতি পাবে না। এ বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের আরো বেশি কৌশলী ও জনবান্ধব নীতি গ্রহণ করতে হবে।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়