গণমাধ্যম রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় সহযোগিতা করে। উন্নত বিশ্বে গণমাধ্যমে স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা রক্ষায় রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যাপক সহযোগিতা করা হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য যে বাংলাদেশে অতীতে নানাভাবে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পর গণমাধ্যমকে বস্তুনিষ্ঠ, স্বচ্ছ, জবাবদিহি ও বিশ্বমানের করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং একটি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। ওই সংস্কার কমিশন সমপ্রতি প্রধান উপদেষ্টার কাছে গণমাধ্যম সংস্কারে যেসব সুপারিশ ও প্রস্তাবসহ প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, তা সবার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এর কিছু কিছু প্রস্তাব অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য। তবে বেশ কিছু প্রস্তাব গণমাধ্যমের সঙ্গে জড়িত অনেককে বিস্মিত, শঙ্কিত ও ভীত করেছে।
অনেক ক্ষেত্রে মনে হয়েছে, কমিশনের কিছু প্রস্তাব বাস্তবতাবিবর্জিত।
স্বাধীনতার পর অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে নানা প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে এগিয়ে এসেছে আমাদের সংবাদপত্রশিল্প। কিন্তু এখনো অনেক প্রতিকূলতা রয়েছে। রয়েছে আর্থিক সংকট, গুণগত মান ও পেশাদারির অভাব।
রয়েছে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। এমন পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার গণমাধ্যম উন্নয়নে যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা প্রশংসনীয়। কিন্তু কমিশন এমন কিছু সুপারিশ করেছে, যা এই শিল্পের বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। তাদের কিছু প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে গেলে গণমাধ্যমে ধস নামবে। হাজারো সংবাদকর্মী চাকরি হারাবেন।
বন্ধ হয়ে যাবে বেশির ভাগ গণমাধ্যম। জানা যায়, এমন অবাস্তব সুপারিশের পেছনে গণমাধ্যমেরই একটি স্বার্থান্বেষী মহল জড়িত। কমিশন ‘ওয়ান মিডিয়া, ওয়ান হাউস’ ধারণা বাস্তবায়নের কথা বলেছে। এ ধরনের চিন্তাকে অনেকেই স্বেচ্ছাচারমূলক, অন্যায্য ও আপত্তিকর বলে উল্লেখ করেছেন। একক মালিকানায় বা কোন গ্রুপে কয়টি প্রতিষ্ঠান থাকবে, লোকসানি প্রতিষ্ঠান চালানো হবে কি না—এমন সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার উদ্যোক্তাদেরই থাকা প্রয়োজন। ‘ওয়ান মিডিয়া, ওয়ান হাউস’ ধরনের স্লোগানে কাউকে ‘টার্গেট’ করা হলে তা হবে খুবই দুঃখজনক। গণমাধ্যমের লক্ষ্য হলো সেবা। তাকে পুঁজিবাজারে নিয়ে মুনাফাকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানের কাতারে দাঁড় করানোও কাঙ্ক্ষিত নয়। এ ছাড়া শিক্ষাগত যোগ্যতা, বেতন স্কেল, গ্রেড নির্ধারণসহ এমন আরো কিছু বিষয়ে এমন কিছু সুপারিশ করা হয়েছে, যেগুলো বাস্তবতাবিবর্জিত।
আমরা মনে করি, কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। এমন কিছু করা উচিত হবে না, যা দেশের বিকাশমান গণমাধ্যমকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

