২১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ৪ঠা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

‘মব’, না ‘প্রেসার গ্রুপ’

দেশে সাম্প্রতিক সময়ে ‘মব জাস্টিস’ বা ‘মব ভায়োলেন্স’ বেশ আলোচিত ঘটনা। যে নামেই ডাকা হোক না কেন- মব সন্ত্রাসের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, যা শুধু ব্যক্তির নিরাপত্তা নয়, সামগ্রিকভাবে আইনের শাসন ও সমাজব্যবস্থার জন্যও বড় হুমকি। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্যানুযায়ী, গত ৯ মাসে ১৩১ জন নিহত এবং দেড় শতাধিক আহত হয়েছেন মব সন্ত্রাসে। সম্প্রতি সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার নুরুল হুদার ওপর প্রকাশ্যে যে হামলা হয়েছে, তা আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক শিষ্টাচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এই ধরনের মবকে ‘প্রেসার গ্রুপ’ হিসেবে অভিহিত করলেও বাস্তবতা হলো, এটি একটি উচ্ছৃঙ্খল, সহিংস প্রবণতা, যা আইনকে অবমূল্যায়ন করছে। তবে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবের বক্তব্যটি তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি মবকে প্রেসার গ্রুপ বলার কারণ হিসেবে ‘আগের সাংবাদিকতার ব্যর্থতা’ এবং গত ১৫ বছরের ‘ন্যূনতম নাগরিক স্বাধীনতা না থাকা’কে দায়ী করছেন। তাঁর মতে, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষজনের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভ থেকেই এই প্রেসার গ্রুপ তৈরি হচ্ছে।
তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল করা ভুল ছিল এবং অপসাংবাদিকতায় ক্ষতিগ্রস্তদের আইনি সুরক্ষা দরকার। প্রেস সচিব এক নতুন বিতর্ক উসকে দিয়েছেন—মব সন্ত্রাস কি কেবল স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষ, নাকি এর পেছনে কোনো সুসংগঠিত চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর ইন্ধন রয়েছে? অপরাধের বিচার আদালতে হওয়ার কথা থাকলেও মবের হাতে সেই বিচার এখন রাস্তায় সংঘটিত হচ্ছে। এতে নাগরিক নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে এবং সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে।এখানে সরকার, রাজনৈতিক দল ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর দায়িত্বের প্রশ্নটি জোরালোভাবে সামনে আসে।
বিএনপি ‘মব সন্ত্রাস’ বিরোধী কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ‘মব’কে ‘হিংস্র উন্মাদনা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। অন্যদিকে সেনাবাহিনী প্রধানও ‘মব ভায়োলেন্স’ দমনে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে যে এই বিশৃঙ্খলা কেবল রাজনৈতিক মতানৈক্য নয়, বরং দেশের সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর এক গুরুতর আঘাত। তবে রাজনৈতিক দল ও সেনাবাহিনীর এই কঠোর অবস্থানের ঘোষণার বাস্তব প্রতিফলন খুব স্পষ্ট নয়, কারণ মব সন্ত্রাস থামছে না। সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে, সরকারের তরফ থেকেও কিছু বিবৃতি ছাড়া কার্যকর ও দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপের অভাব রয়েছে।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, অপরাধীরা মবের অংশ হয়ে প্রকাশ্যে হামলা করলেও পুলিশ নির্বিকার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মব সন্ত্রাসকে জামিন অযোগ্য অপরাধ ঘোষণা করে এর নেতৃত্বদানকারীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা জরুরি। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের কর্মীদের প্রতি কঠোর নজরদারি চালিয়ে দলীয় স্বার্থে এ ধরনের বর্বরতাকে প্রশ্রয় না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ দিতে হবে।
মব সন্ত্রাস শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি সমাজের সহিষ্ণুতা, ন্যায়বিচার এবং মানবাধিকারের প্রতি চরম অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ। এই গুরুতর সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে হলে কেবল বিবৃতি নয়, সরকারকে দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে হবে। এ ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সক্রিয় ভূমিকা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। নতুবা আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়বে এবং জনমনে আতঙ্ক আরো বাড়বে, যা একটি সভ্য সমাজের জন্য অশোভনীয়।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়