বাড়ছে বেকারত্ব, বাড়ছে অপরাধ

শিল্পনগরী গাজীপুরের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। প্রকাশিত খবরে দেখা যায়, জেলার দুই শতাধিক স্থানে মাদকের হাট বসে, পাঁচ শতাধিক পাইকারি বিক্রেতাই রয়েছে, মাসে শতকোটি টাকার বেশি মাদক বেচাকেনা হয়। প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে গাজীপুর জেলা ও মহানগরে ১০৩টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। চলতি মাসেই সেখানে একজন সাংবাদিককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
আরেকজন সাংবাদিকের হাত-পা ইট দিয়ে থেঁতলে দেওয়া হয়। ডাকাতি, চুরি, ছিনতাইয়ের কারণে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। যাদের সামর্থ্য আছে, তারা গাজীপুর ছেড়ে ঢাকায় এসে থাকছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গাজীপুরের এমন অবস্থার পেছনে একটি বড় কারণ কলকারখানা বন্ধ হয়ে হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হওয়া।বেকার শ্রমিকদের অনেকেই বিভিন্ন অপরাধীচক্রের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছেন।
প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত ছয় মাসে শুধু গাজীপুর মেট্রোপলিটন এলাকা থেকেই এক হাজার ৬০০ ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে আট শতাধিকই হচ্ছেন বন্ধ হয়ে যাওয়া পোশাক বা অন্যান্য কারখানার শ্রমিক। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর এবং শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে গত ২৯ জুলাই পর্যন্ত গাজীপুরে ৭২টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, কারখানা বন্ধ হওয়ার ফলে জেলায় বেকার হয়েছেন প্রায় ৭৩ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী। তাঁদের অনেকে কাজ না পেয়ে পেশা পরিবর্তন করেছেন, আবার অনেকে জড়াচ্ছেন অপরাধে। গাজীপুর মহানগর পুলিশ (জিএমপি) কমিশনার নাজমুল করিম খান জানান, বেকার শ্রমিকদের বিভিন্ন অপরাধে জড়ানোর তথ্য পাওয়া গেছে। গত ছয় মাসে গাজীপুর মহানগর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা ছিনতাইকারীদের মধ্যে ৫০ শতাংশই বেকার হওয়া শ্রমিক। তা ছাড়া শিল্প এলাকা হওয়ায় বিপুলসংখ্যক ভাসমান মানুষ রয়েছে।
তাদেরও অনেকে নানা অপরাধে জড়িত। সাংবাদিক তুহিন হত্যায় যে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তারা এসেছে পাঁচটি জেলা থেকে।
শুধু গাজীপুর নয়, সারা দেশেই বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে অপরাধ। মানুষ রাতে ঘুমাতে পারে না ডাকাতের উপদ্রবে। প্রকাশিত অপর এক খবরে বলা হয়, রাজনৈতিক নেতা, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, এমনকি পুলিশ, সেনা সদস্যের বাড়িতেও ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। গত শুক্রবার রাতে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে শিকদার গ্রুপের ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন পাওয়ার প্লান্টে দুর্ধর্ষ ডাকাতি সংঘটিত হয়েছে। ডাকাতরা কয়েক কোটি টাকার যন্ত্রাংশ ও মালপত্র নিয়ে গেছে। শুক্রবার পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলায় ১৫ দিন বয়সের শিশুকে ধারালো অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ডাকাতরা কয়েক লাখ টাকার মালপত্র নিয়ে যায়। এমন ঘটনা অহরহ ঘটে চলেছে। বিভিন্ন এলাকায় মানুষ রাতভর দল বেঁধে পাহারা দিচ্ছে, কিন্তু তার পরও রেহাই মিলছে না। ডাকাতদের আগ্নেয়াস্ত্রের মুখে প্রতিরোধ টিকছে না।
দেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু কর্মসংস্থান বাড়ছে না। উল্টো শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে, বেকারত্ব বাড়ছে। এটি সামাজিক স্থিতিশীলতা, ব্যবসা-বাণিজ্য কোনো কিছুর জন্যই অনুকূল নয়। কেবল পুলিশের পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয় বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় সরকারকেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়