মিঠুন দত্ত, অভয়নগর
যশোরের অভয়নগরে আইন শৃংখলার ব্যাপক অবনতি হয়েছে। গত তিনমাসে নয়টি লাশ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় এলাকার মানুষের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়েছে। এরমধ্যে চারটি খুন ও পাঁচটি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গত ২০ মে থেকে গত ১২ আগষ্ট পর্যন্ত এসব ঘটনা ঘটে। হত্যাকান্ডের মধ্যে আলোচিত নওয়াপাড়া পৌর কৃষকদলের সভাপতি তরিকুল ইসলাম, কুয়েত ফেরৎ এস এম হাসানের গলাকাটা লাশ উদ্ধার, সিদ্দিপাশা গ্রামের ৪ বছরের শিশু নাদিয়া হত্যা, সর্বশেষ গত ১২ আগষ্ট প্রতিবন্ধী ভ্যান চালক লিমনকে হত্যা করে গাছের সাথে ঝুলিয়ে রাখা হয়। পুলিশ ও নিহতদের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, অভয়নগরে আলোচিত নওয়াপাড়া পৌর কৃষকদলের সভাপতি তরিকুল ইসলাম (৫০) কে ২২ মে দুর্বৃত্তরা উপজেলার ডহর মশিয়াহাটী গ্রামে একটি বাড়িতে পরিকল্পিত ভাবে ডেকে নিয়ে গুলি করে এবং কুপিয়ে হত্যা করে। মাছের ঘের সংক্রান্ত বিরোধের কারণে এ হত্যাকান্ড সংগঠিত হয় বলে নিহতের ভাই রফিকুজ্জামান টুলু অভিযোগ করেন। এ ঘটনায় নিহতের ভাই রফিকুজ্জামান টুলু বাদি হয়ে যুবদলের দুই নেতাসহ ৮ জনের নামে ২৪ মে অভয়নগর থানায় মামলা করেন। হত্যাকান্ডের পর ডহর মশিয়াহাটী এলাকায় সনাতন ধর্মাবলম্বী প্রায় ২০ টি বাড়িতে দুর্বৃত্তরা অগ্নিসংযোগ করে। এসময় দুর্বৃত্তরা ওই বাড়িগুলোতে লুটপাট চালায় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ মামলায় ৭ জনকে পুলিশ আটক করেছে। গত ১১ আগষ্ট এ মামলায় আটক মো: পলাশ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি মুলক জবানবন্দী দিয়েছে। আটক পলাশ উপজেলার বেদভিটা গ্রামের আব্দুল মল্লিকের ছেলে। গত ১৫ জুন উপজেলার নাউলী গ্রামের একটি ঘেরের পাড় থেকে পুলিশ কুয়েত ফেরৎ এস এম হাসানের (৩০) গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে। তিনি উপজেলার নাউলি গ্রামের শেখ হাবিবুর রহমানের পূত্র। নিহত এস এম হাসানের বড় ভাই মুন্না হোসেন জানান, হাসান সাত বছর ধরে কুয়েতে ছিল। প্রতিদিনের ন্যয় ওইদিন বন্ধুদের সঙ্গে নাউলী বাজারে চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছিল। ওইদিন রাতে হাসান বাড়ি ফেরেনি। রোববার সকাল ছয়টার দিকে প্রতিবেশীরা চান্দের বিলের একটি মাছের ঘেরের পাশে তার গলাকাটা লাশ দেখতে পায়। টাকা লেনদেনকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে পুলিশ জানায়। পুলিশ এ পর্যন্ত ছয়জন জনকে গ্রেফতার করেছে। ২১ জুন শনিবার বিকাল চারটার সময় পুলিশ উপজেলার সিদ্দিপাশা গ্রামের একটি ডোবা থেকে নাদিয়া ইসলাম (৪) নামের এক শিশুর লাশ উদ্ধার করে। সে উপজেলার সিদ্দিপাশা গ্রামের রাজিব মোল্যার মেয়ে। নাদিয়া ইসলামের ফুফু সাদিয়া বেগম জানান, ১৯ জুন বৃহস্পতিবার বেলা এগারটার পর থেকে নাদিয়াকে বাড়িতে পাওয়া যাচ্ছিল না। শনিবার (২১ জুন) বেলা তিনটার সময় বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে একটি ডোবার ভিতর থেকে পুলিশ শিশুটির লাশ উদ্ধার করে। পরিবারের অভিযোগ তাকে হত্যা করা হয়েছে। গত ১২ আগষ্ট উপজেলার বুইকরা গ্রামের প্রতিবন্ধী ভ্যান চালক লিমনের (২৫) লাশ পুলিশ উদ্ধার করা হয়। লিমনকে হত্যা করে গাছের সাথে ঝুলিয়ে রাখা হয়। পুলিশের ধারনা দুবর্ৃৃত্তরা তার ইঞ্জিন চালিত ভ্যানটি নিতে এ হত্যা কান্ড ঘটাতে পারে। এ ঘটনায় নিহতের বাবা কাশেম শেখ বাদি হয়ে অভয়নগর থানায় মামলা করেছেন। পুলিশ এখনো পর্যন্ত কাউকে আটক করতে পারেনি। এ ঘটনার প্রতিবাদে ভ্যান ও রিক্সা শ্রমিকেরা লিমন হত্যাকান্ডের বিচারের দাবিতে নওয়াপাড়ায় বিক্ষোভ মিছিল করে।
গত ২২ জুন উপজেলার চেঙ্গুটিয়া গ্রামের ওমর আলী (৬০) নিজ মাছের ঘেরে কাজ করতে যেয়ে নিখোঁজ হন। ওইদিন তিনি আর বাড়ি ফেরেননি। পরদিন পরিবারের লোকজন মাছের ঘেরে তার লাশ ভাসতে দেখে পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ খবর পেয়ে নিখোঁজের ১৮ ঘন্টা পর সোমবার (২৩ জুন) সকাল ১১টার দিকে তার লাশ উদ্ধার করে। ওমর আলী চেঙ্গুটিয়া গ্রামের মোসলেম গাজীর ছেলে। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়। গত ১১ জুন বুধবার সকাল সাড়ে আটটার সময় উপজেলার বুইকরা গ্রামের বউবাজার এলাকার একটি ভাড়াবাড়ি থেকে জেসমিন খাতুন (৩৪) নামের এক গৃহবধুর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি ওই এলাকার বিল্লাল হোসেনের স্ত্রী। ওই নারীর গলায় ফাঁসের দাগ ছিল না। এলাকাবাসীর ধারণা এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। এর আগে ২০ মে সকালে উপজেলার ভাঙ্গাগেট এলাকার লক্ষিপুর গ্রাম থেকে মোঃ শাকিল হোসেন (২৯) নামের এক ঘাট শ্রমিকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই যুবকের মরদেহটি একটি গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় ছিল। নিহত শাকিল কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর গ্রামের মৃত আমিনুর ইসলামের ছেলে। নিহতের স্ত্রী সিনতিয়া খাতুন জানান, ১৯ মে রাতে আমার স্বামী ভাত খেয়ে মোবাইল ও আমার কাছ থেকে ২ হাজার টাকা নিয়ে রাত সাড়ে ১০ টার দিকে বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফেরেনি। পরের দিন গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় তার লাশ পাওয়া যায়। গত ৫ জুলাই নওয়াপাড়া কাঁচাবাজার সংলগ্ন একটি ঘরের মধ্যে থেকে ইমরান হোসেন (২০) নামে এক যুবকের মরদেহ ঘরের আড়ার সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় পুলিশ উদ্ধার করে। হত্যা না আত্মহত্যা তা পুলিশ নিশ্চিত করে বলতে পারেনি। সে উপজেলার শংকরপাশা গ্রামের বাবু খাঁর ছেলে। গত ২৯ জুলাই মঙ্গলবার দুপুরে রাজঘাট (জেজেআই) বর্তমানে আকিজ গ্রুপের লিজে পরিচালিত কোয়াটার থেকে মনিরুল ইসলাম (২৫) নামে এক শ্রমিকের ঝুলন্ত লাশ পুলিশ উদ্ধার করে। সে কুড়িগ্রাম বুড়িঙ্গামারী উপজেলার কাশেমবাজার এলাকার আব্দুল হাই মন্ডলের ছেলে। অভয়নগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল আলিম বলেন, দুইটি হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতদের গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃত আসামিরা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে। শিশু নাদিয়ার হত্যাকান্ডের ব্যাপারে তথ্য উৎঘাটন করা যায়নি। তদন্ত চলছে। বাকিগুলোর ব্যাপারেও তদন্ত চলছে।
