কর্মকর্তারা হ্যারাজ করছে পাসপোর্টযাত্রীদের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

বেনাপোল চেকপোষ্টে কাস্টমস মানছে না সরকারী প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনা

সুন্দর সাহা
মরার ওপর খাড়ার ঘা বলতে যা বোঝাই। সেটিই করছেন বেনাপোল চেকপোষ্টে দায়িত্বরত কাস্টমস কর্তারা। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য সরকারি প্রজ্ঞাপনকে তারা কেয়ারই করছেন না। কর্তারা যেন বেনাপোল চেকপোষ্টে মগের মুল্লুক কায়েম করেছেন। খেয়াল খুশিমত নিয়ম চালু করে অহেতুক পাসপোর্ট যাত্রীদের হয়রাণী করা হচ্ছে। একইভাবে ল্যাগেজ রুলের তোয়াক্কা না করে পাসপোর্ট যাত্রী হয়রানি, স্বজনপ্রীতি উৎকোচ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। ল্যাগেজ রুলের বাইরে অতিরিক্ত কোন পণ্য আনলে ডিএম-এর পরিবর্তে আইন অনুযায়ী স্পট ট্যাক্সের দাবি পাসপোর্টযাত্রীদের। যা অগ্রাহ্য করে কর্তারা নিজেদের ইচ্ছেমত যাত্রীদের পণ্য আটক জব্দ করে পণ্যর ডিএম স্লিপ আবার অনেক পণ্য স্লিপ বাদে রেখে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ পাসপোর্টযাত্রীদের। এদিকে বেনাপোল চেকপোষ্টে সরকারী প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনা কাস্টমস কর্তারা মানছেন না। ফলে কাস্টমস কর্মকর্তারা ইচ্ছামত হ্যারাজ করছে পাসপোর্টযাত্রীদের। যাতে সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।


সূত্র জানায়, ভারতের ভিসা জটিলতার কারনে বেনাপোল ইমিগ্রেশন চেকপোষ্ট দিয়ে পাসপোর্ট যাত্রী যাতায়াত হ্রাস পেয়েছে। আর সেই সাথে নেমেছে এ খাতে রাজস্ব আদায়ে ধ্বস। ইতিপূর্বে বেনাপোল ইমিগ্রেশন চেকপোষ্ট দিয়ে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ হাজার পাসপোর্ট যাত্রী ভারত-বাংলাদেশে যাতায়াত করত। সে অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকারের কমপক্ষে গড়ে অন্তত: এক কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হতো। গত বছর থেকে ভারত ট্যুরিষ্ট ভিসা বন্ধ এবং মেডিকেল ও বিজনেস ভিসাও শিথীল করায় বেনাপোল দিয়ে বর্তমানে পাসপোর্ট যাত্রী তলানীতে গিয়ে ঠেকেছে। আবার ভারতীয় পাসপোর্ট যাত্রীদের অধিকাংশ বিজনেস ভিসা থাকলেও তারাও বেনাপোল কাস্টমসের খামখেয়ালীপনার কারনে বাংলাদেশে আসা বন্ধ করে দিয়েছে। কাস্টমস স্কানিংয়ের পরও অদৃশ্য কারনে তাদের ব্যাগ খুলে পুনরায় দেখা ওজন করাসহ নানা ধরনের টালবাহানা করছে কাস্টমস কর্তারা। আর এসব কাহিনীর জন্য ভারতীয় যাত্রী আসাও অনেক কমে যাওয়ায় রাজস্ব আদায়ে আরেকে দফা ধস্ নেমেছে। বেনাপোল চেকপোষ্ট ল্যাগেজ রুলস ব্যতিরেকে পাসপোর্ট যাত্রী হয়রানি, স্বজনপ্রীতি উৎকোচ আদায়ের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। যদি ল্যাগেজ রুল বহির্ভূত পণ্য থাকে তবে আইন অনুযায়ী ডিএম-এর পরিবর্তে স্পট ট্যাক্সের দাবি তুলেছে পাসপোর্টযাত্রীরা। নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে ইচ্ছামত যাত্রীদের পণ্য আটক কিছু পণ্যর ডিএম স্লিপ আবার অনেক পণ্য স্লিপ বাদে রেখে দেওয়ারও অভিযোগ করেছে পাসপোর্টযাত্রীরা। ভারতীয় ভিসা জটিলতায় পাসপোর্ট যাত্রী হ্রাস পাওয়ায় সরকারেরও কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হ্রাস পেয়েছে। ব্যাগেজ রুল অনুযায়ী একজন পাসপোর্ট যাত্রী স্থলপথে বছরে একবার একটি নতুন মোবাইল ফোন আনতে পারবেন। একই নিয়মে বছরে দুটি ব্যবহৃত মোবাইল আনতে পারবেন। সাকুল্যে ৪০০ ডলারের পণ্য কোন প্রকার শুল্ক ছাড়াই আনতে বা নিতে পারবেন। বিদেশী পাসপোর্টযাত্রীরা এক লিটার পরিমাণ মদ নিতে পারবেন। যা বাংলাদেশী পাসপোর্টযাত্রীদের জন্য প্রযোজ্য নয়। সরেজমিনে দেখা গেছে, বৃহস্পতিবার (১১ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১ টার সময় ভারতীয় কয়েকজন পাসপোর্টযাত্রী বাংলাদেশে প্রবেশ করার পর তাদের কেউ কেউ মাত্র একটি শাড়ী এনেছেন এদেশের কোন নিকট জনকে উপহার দিতে। বেনাপোল চেকপোস্টের হাভাতে কাস্টমস কর্তারা একজন নারী যাত্রীর সেই শাড়িটা ও কিছু ফল রেখে দেন। বেচারী পাসপোর্টযাত্রী সকাল ৮ টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত ঠাই দাঁড়িয়ে থাকেন রেখে দেয়া শাড়ীটি ফেরত পাওয়ার প্রত্যাশায়। দীর্ঘ ৫ ঘন্টা স্কানিং মেশিন রুমের বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেও তাকে শাড়িটি ফেরত দেননি করিৎকর্মা কর্মকর্তারা। এমন অভিযোগের শেষ নেই। নারী-পুরুষ যাত্রীদের কাছ থেকে ব্যাগেজ রুলের তোয়াক্কা না করে ইচ্ছামত জিনিষ-পত্র রেখে দেয়া হয়। তারপর দীর্ঘ সময় দাঁড় করিয়ে রেখে নগদ নারায়ণের বিনিময়ে ছেঢ়ে দেয়া হয়। আবার অনেকে অভিযোগ করেছে তাদের পাসপোর্ট ও আটকে রাখেন কাস্টমস সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এ আর ও) সিরাজুল ইসলাম। পাসপোর্ট যাত্রী অনিমা ঘোষ বলেন, আমি একটি শাড়ী ও ৫ কেজি ফল নিয়ে বাংলাদেশে এসেছি। কিন্তু কাস্টমস তা রেখে দিয়েছে সকাল ৮ টার সময়। এখন বেলা ১ টা বাজে আমাকে ফল ও শাড়ী ফেরত দেয়নি। আমার মত এখানে প্রায় ভারত থেকে আসা বাংলাদেশী ও ভারতীয় যাত্রী ৪০ জন এর মত দাড়িয়ে আছে। আরেক ভারতীয় পাসপোর্ট যাত্রী বলেন, আমার কাছে একটি মাত্র শাড়ি ছিল তা কাস্টমস ডিএম করে আমার হাতে স্লিপ ধরিয়ে দিয়েছে। আমি ওই শাড়ি কাস্টমস হাউস থেকে ছাড় করাতে জরিমানা দিতে হবে বলে কাস্টমস কর্তা জানান। এরপর আবার টেবিল খরচ ও ভ্যাট আছে। আমার শাড়ির দাম ভারতীয় মাত্র ৭০০ রুপীতে কেনা। যা বাংলাদেশী টাকায় আসে ১০০০ টাকা। আর ওই শাড়ি ছাড় করাতে গেলে লাগবে ৫ হাজার টাকারও বেশি। ভারতীয় পাসপোর্ট যাত্রী ওয়াসীম রাজা বলেন, বাংলাদেশে আসার মত অবস্থা নেই। কাস্টমসের হয়রানি চরমে উঠেছে। এর চেয়ে দুই দেশে যাত্রী আসা যাওয়া বন্ধ করে দেওয়া উচিৎ। তবে আমাদের দাবি আমরা বাংলাদেশে প্রবেশ করলে যদি মনে হয় আমাদের সাথে থাকা কোন পণ্য বেশী আছে সে পণ্য স্পট ট্যাক্স নিলে আমরা সরকারী নিয়ম অনুযায়ি দিব। বাংলাদেশ ও ভারতীয় পাসপোর্ট যাত্রীরা দাবি করে তাদের আনিত কোন পণ্য যদি ল্যাগেজ বহির্ভুত হয় তবে তা কাস্টমস স্পট ট্যাক্স নিয়ে ছেড়ে দিলে আমাদের কোন আপত্তি নেই। যদি কাস্টমস স্পট ট্যাস্ক নেয় তাহলে দেশে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পায়। কাস্টমস স্পট ট্যাক্স নিয়ে ভারতীয় কিছু পণ্য যা বাংলাদেশে উৎপাদন হয় না সে সব পণ্য ট্যাক্স নিযে আনার ব্যবস্থা করা হোক। কাস্টমস যে সব পণ্য ডিএম করে তা যাত্রীরা কাস্টমস থেকে ছাড় করিয়ে না নেওয়ায় অনেক পণ্য পচে যাচ্ছে। কাস্টমস হাউস থেকে পণ্য ছাড় করাতে গেলে ৩০০% জরিমানা দিতে হয়। এবং ফাইল খুলতে গেলে সাড়ে ৩ হাজার টাকা লাগে। এর জন্য যাত্রীরা তাদের পণ্য না নেওয়ায় সিন্ডিকেটের মাধ্যেমে নিলামে অর্ধেক টাকায় বিক্রি হওয়ায় সরকার বড় ধরনের রাজস্ব হারাচ্ছে। তাছাড়া অনৈকভাবে ল্যাগেজ রুলের তোয়াক্কা না মালামাল কেড়ে নেয়ায় দেশের ভাবমুর্তিও ক্ষুন্ন হচ্ছে। কারন এ পথে প্রতিদিন দেশী বিদেশী শত শত যাত্রী ভারত বাংলাদেশ আসা যাওয়া করে। তাছাড়া বেনাপোল কাস্টমস হাউসে জায়গা সংকটের কারনে চেকপোষ্ট কাস্টমসের গেষ্ট রুম সুপারের রুমসহ বারান্দায় পাসপোর্ট যাত্রীদের কাছ থেকে রাখা খাবারসহ বিভিন্ন পণ্য রাখায় সে ইদুরসহ পোকায় খায়। অনেক খাবার পঁচে নষ্ট হয়ে যায়। স্থান সঙ্কুলানের অভাবে এসব খাবার জাতীয় পণ্য পুড়িয়ে ফেলা হয়। যদি স্পট ট্যাক্সের ব্যবস্থা থাকতো তাহলে যাত্রীদের সুবিধার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয় বাড়তো। শুধু মাত্র কাস্টমস কর্তাদের একগুয়েমী ও ল্যাগেজ রুল না জানা এবং না মানার কারণে ভিসা থাকার পরও বেনাপোল দিয়ে কেউ বাংলাদেশে আসতে চাইছে না। বেনাপাল সোনালী ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত জুলাই মাসে যে রাজস্ব আদায় হয়েছে পাসপোর্ট যাত্রীদের নিকট থেকে তা নেমে আগষ্ট মাসে অর্ধেকে দাঁড়িয়েছে। মনে হয় সেপ্টেম্বরে আরো কমে যাবে। বেনাপোল চেকপোষ্ট কাস্টমস সুপার নাজমুল সিরাজীর কাছে একটি শাড়ী ডিএম করার নিয়ম আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন না একটি শাড়ি কোন যাত্রী আনলে তা ডিএম হবে না। তবে আজ কেন ১ টা শাড়ী ভারতীয় যাত্রীর নিকট থেকে ডিএম হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা করার কথা না। তবে যদি কোন অফিসার করে থাকে তবে সে ভুল করেছে । পরবর্তীতের যাতে একটি শাড়ী ডিএম না হয় সেদিকে আমরা খেয়াল রাখব। এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কাস্টমস কমিশনারের কাছে মুঠো ফোনে কল দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়