চিকিৎসা পেশা একসময় ছিল মহৎ মানবসেবার প্রতীক। বাংলাদেশে সেই পেশার বড় একটি অংশ এখন অর্থ উপার্জনের প্রতিযোগিতায় মত্ত। কালের কণ্ঠের সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের শীর্ষস্থানীয় বহু চিকিৎসক বিপুল পরিমাণ আয় গোপন করে সরকারের রাজস্ব থেকে কোটি কোটি টাকা ফাঁকি দিচ্ছেন। এটি কেবল কর আইনের লঙ্ঘন নয়, সমাজের প্রতি গভীর এক নৈতিক বিশ্বাসভঙ্গ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে অন্তত ১০ হাজার ডাক্তার আছেন, যাঁরা প্রতিবছর ছয় হাজার ২৫০ কোটি টাকারও বেশি কর ফাঁকি দিচ্ছেন। অনুসন্ধানে দুজন শীর্ষস্থানীয় ডাক্তারের আয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাঁরা তাঁদের প্রকৃত আয় কোটি কোটি টাকা কম দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছেন। রোগীর ফি, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার কমিশন এবং ওষুধ কম্পানির কাছ থেকে পাওয়া সুবিধা—এসব মিলিয়ে তাঁদের আয় দেখানো আয়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। অথচ আয়কর নির্দেশিকা অনুযায়ী, একজন ডাক্তারের সব ধরনের আয় করনথিতে উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক।দেশের ১৭ কোটিরও বেশি মানুষের জন্য ডাক্তার আছেন মাত্র দেড় লাখ। ফলে রোগীর লম্বা লাইন এবং উচ্চ ফি স্বাভাবিক। তবে উচ্চ ফি নিলেও সেই আয়ের সঠিক হিসাব না দেওয়াটা চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও ফৌজদারি অপরাধ।জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান ঘোষণা দিয়েছেন, কর ফাঁকিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এটি অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে কেবল বক্তব্য নয়, প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ—পেশাভিত্তিক ডিজিটাল নিবন্ধন, হাসপাতালভিত্তিক আয়ের স্বচ্ছ অডিট এবং কর রিটার্নে স্বয়ংক্রিয় তথ্য যাচাই ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সিনিয়র গবেষণা সহযোগী তামীম আহমেদের মতে, করব্যবস্থায় তদারকির দুর্বলতা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে আয় কম দেখানোর মতো ফৌজদারি অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি না দেওয়া এই সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।এই বাস্তবতা শুধু কর প্রশাসনের দুর্বলতা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার অবক্ষয়েরও প্রতিফলন। আইন অনুযায়ী ইচ্ছাকৃত কর ফাঁকি ফৌজদারি অপরাধ, যার শাস্তি সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড।কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো উচ্চপদস্থ চিকিৎসককে সেই আইনে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে দেখা যায়নি।চিকিৎসা পেশা মানুষের জীবন রক্ষার শপথে আবদ্ধ। সেই পেশার মানুষ যদি কর ফাঁকির মতো অসততায় জড়িয়ে পড়েন, তবে তা শুধু রাজস্ব ক্ষতি নয়, নৈতিক মূল্যবোধেরও মৃত্যু। সমাজে সম্মান ধরে রাখতে হলে চিকিৎসকদেরই আগে সৎ ও দায়বদ্ধ হতে হবে।
