২১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ৪ঠা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

কমরেড আবদুল হক-এর ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক
কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রবাদ পুরুষ মহান বিপ্লবী কমরেড আবদুল হক-এর ৩০তম মৃৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে কমরেড আবদুল হক-এর মৃত্যুবার্ষিকী পালন জাতীয় কমিটির উদ্যোগে আজ ২২ ডিসেম্বর সোমবার সকাল ৮টায় মিরপুর সমাধিস্থলে পুস্পমাল্য অর্পণ ও কেন্দ্রীয়ভাবে জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আলোচনা সভাসহ দেশব্যাপি স্মরণসভা করা হবে। দেশব্যাপী কর্মসূচীর অংশ হিসেবে ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ সোমবার বিকাল ৩টায় জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট ঝিনাইদহ জেলা কমিটির উদ্যোগে ঝিনাইদহ পাঁয়রা চত্বরে স্মরণ সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভায় সংগঠনের জেলার সকল নেতা-কর্মীদের যথাসময়ে উপস্থিত হওয়ার জন্য বিশেষভাবে আহ্বান জানানো হল। কমরেড আবদুল হক ১৯২০ সালের ২৩ ডিসেম্বর যশোর জেলার সদর থানার খড়কিতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম: শাহ মুহম্মদ আবুল খায়ের, মায়ের নাম: আমেনা খাতুন। আবদুল হক ছিলেন সাম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। অথচ সেই সাম্ভ্রান্ত ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই তিনি লড়াইয়ে নেমেছিলেন। জনগণের মুক্তির জন্য শ্রেণীচ্যুত হতে তার বাঁধেনি। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন তিনি। ভাল ফল করেছিলেন প্রবেশিকা পরীক্ষায়। কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ (মৌলানা আজাদ কলেজ), প্রেডিডেন্সি কলেজ সর্বএই তিনি তার মেধার স্বাক্ষর রাখেন। কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে অর্থনীতিতে বি.এ অনার্স পড়ার সময় তিনি ১৯৪১ সালে ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টির প্রার্থী সভ্যপদ লাভ করেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি পার্টির রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিচালিত ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্ট ফেডারেশনের বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটির দায়িত্ব পালন করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ ভর্তি হলে তিনি পার্টির ডাকে সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৪১ সালে যশোর জেলার বনগাঁয়ে তৃতীয় কৃষক সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। এই সম্মেলনে “লাঙ্গল যার জমি তার” এবং ঐতিহাসিক তে-ভাগা আন্দোলনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যশোর জেলার কৃষকের তে-ভাগা আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দানকারীর ভূমিকা পালন করেন। পাকিন্তান আমলে তিনি ১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত পুর্ব পাকিস্তান কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। বৃটিশ আমল, পাকিস্তান আমল ও বাংলাদেশের সময়কালে তিনি অনেক আন্দোলন প্রত্যক্ষভাবে গড়ে তোলেন ও অংশ নেন- যেমন: ১৯৩৯ সালে হলওয়ের মনুমেন্ট ভাঙ্গার আন্দোলন, ১৯৪২ সালে দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ আন্দোলন, হাটের তোলা আদায় বন্ধ আন্দোলন, ১৯৫০ সালে রাজশাহী জেলে খাপড়া ওয়ার্ড আন্দোলন, বিভিন্ন কৃষক আন্দোলনসহ ১৯৬৯ সালে গণআন্দোলন ও গণঅভ্যূত্থান, ১৯৭১ এ যুদ্ধ ও পরবর্তীকালে বাংলাদেশের বিপ্লবী আন্দোলন ইত্যাদি। এই সাম্রগ্রিক সময়কালে তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনে অগ্রণী বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। কমিউিনিষ্ট আন্দোলনের ক্ষেত্রে তিনি সংশোধনবাদের সকল প্রকাশের বিরুদ্ধে মতাদর্শগত সংগ্রাম চালিয়ে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের লাল পতাকা সমুন্নত রেখেছেন। ১৯৫৩ সালে কমরেড স্তালিনের মৃত্যুর পর সংশোধনবাদী ক্রুশ্চেভ চক্র সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার পার্টি ও রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে এবং ১৯৫৬ সালের ২০তম কংগ্রেসের মধ্য দিয়ে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়াকে পুঁজিবাদী রাশিয়ায় পরিণত করে। ক্রুশ্চেভ সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে তিনি প্রথম থেকেই আদর্শগত সংগ্রাম চালান। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ক্রুশ্চেভ চক্র বিরোধী সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে ১৯৬৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিষ্ট পার্টি (এম.এল) গঠনে তিনি নেতৃত্ব দানকারীর ভূমিকা পালন করেন। ক্রুশ্চেভ চক্রের নেতৃত্বে ১৯৫৬ সালে রাশিয়ায় যে পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, ১৯৯০ এর দশকে রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপে তার নগ্ন পুঁজিবাদের পরিণতি লাভ করেছে। সংশোধনবাদী ক্রুশ্চেভ-ব্রেজনেভ চক্রের বিরুদ্ধে এই আদর্শগত সংগ্রামের সঠিকতা আজ দিবালোকের মত স্পষ্ট। ‘সমাজতন্ত্র ব্যর্থ’ সাম্রাজ্যবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীলদের এই প্রচার অভিযানের ঝড় যখন মার্কসবাদ-লেনিনবাদের কালজয়ী ভাবাদর্শ উৎপাটিত করতে প্রবাহিত তখন কমরেড আবদুল হক একজন দৃঢ় মাকর্সবাদী-লেনিনবাদীর মত অটল অবিচল ছিলেন। তিনি ছিলেন বিপ্লবী আশাবাদ ও তৎপরতায় উজ্জল। এদেশের কমিউনিষ্ট আন্দোলনে শ্রমিক শ্রেণীর প্রকৃত বিপ্লবী পার্টি গঠনে তিনি ছিলেন সদা তৎপর। ষাটের দশকে এদেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার তথা কৃষি ব্যবস্থার চরিত্র নির্ধারণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক সংগ্রাম করেন। মতিন-আলাউদ্দিন উপস্থাপিত কৃষিতে ধনতন্ত্র বক্তব্য খন্ডন করে তিনি ১৯৬৯ সালে রচনা করেন পূর্ব বাংলা আধাউপনিবেশিক আধাসামন্তবাদিী পুস্তক। পরবর্তীতে জাসদের আখলাকুর রহমানের জবাবে লেখেন- কৃষি ব্যবস্থা আধাসামান্ততান্ত্রিক পুস্তক। চীনা পার্টি কর্তৃক উপস্থাপিত তিন বিশ্বতত্ত্ব যা প্রতিবিপ্লবী, শ্রেণী সমন্বয়বাদী ও বেঠিক প্রমাণিত হয়েছে- এই তিন বিশ্বতত্ত্বের বিরুদ্ধে কমরেড আবদুল হক পরিচালনা করেন দৃঢ় মতাদর্শগত সংগ্রাম। তিনি বরাবরই শান্তিপূর্ণ পার্লামেন্টারি পথে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংশোধনবাদী তত্ত্বের বিরুদ্ধে উর্ধ্বে তুলে ধরেন বল প্রয়োগে ক্ষমতা দখলের মার্কসাবাদী-লেনিনবাদী নীতি। তিনি ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৯১ সালের অষ্টম কংগ্রেস পর্যন্ত প্রায় সমগ্র সময়কালে বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিষ্ট পার্টির (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ২২ ডিসেম্বর ১৯৯৫ শুক্রবার রাত ১০টা ৫ মিনিটে বার্ধক্যজনিত অসুস্থ্যতায় কমরেড আবদুল হক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।

 

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়