সুদান ও দক্ষিণ সুদানের মধ্যবর্তী আবেই এলাকায় জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে কর্মরত অবস্থায় বর্বরোচিত ড্রোন হামলায় শাহাদাতবরণকারী ছয় বাংলাদেশি বীর সেনানীর মরদেহ গত শনিবার দেশে ফিরেছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যখন তাঁদের কফিনগুলো এসে পৌঁছে, তখন পুরো জাতি এক গভীর শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার মহান ব্রত পালন করতে গিয়ে এই বীর সন্তানদের আত্মত্যাগ যেমন আমাদের হৃদয়ে বেদনার সৃষ্টি করে, তেমনি দেশের জন্য বয়ে আনে এক অনন্য মর্যাদা ও গৌরব।গত ১৩ ডিসেম্বর কদুগলি লজিস্টিক বেইসে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীর এই ড্রোন হামলা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়।করপোরাল মো. মাসুদ রানা, সৈনিক মো. মমিনুল ইসলাম, সৈনিক শান্ত মণ্ডল, সৈনিক শামীম রেজা, মেস ওয়েটার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম এবং লন্ড্রি কর্মচারী মো. সবুজ মিয়া—যাঁরা বিদেশের মাটিতে প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁরা মূলত বিশ্বমানবতা ও শান্তি রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী ছিলেন। একই ঘটনায় আরো ৯ জন শান্তিরক্ষী আহত হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর।বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে দীর্ঘ সময় ধরে সাফল্যের সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। ১৯৮৮ সালে ইরাক-ইরানে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে সূচনা হওয়া এই যাত্রা আজ বিশ্বের ৪৩টি দেশ ও স্থানে ৬৩টি মিশনে সফলতার রথযাত্রা টেনে নিয়েছে।দীর্ঘ ৩৭ বছরে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের বিভিন্ন দুর্গম ও সংঘাতময় অঞ্চলে সাহসিকতা ও পেশাদারির যে স্বাক্ষর রেখেছেন, তা আজ বিশ্বস্বীকৃত। বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ সর্বোচ্চ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশগুলোর অন্যতম। তবে এই অর্জনের পথ কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত জাতিসংঘ শান্তি মিশনে ১৭৪ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী জীবন উৎসর্গ করেছেন।তাঁদের এই আত্মত্যাগ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক অমূল্য অধ্যায়। এই রক্তস্নাত ইতিহাস প্রমাণ করে যে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অবদান কতখানি নিঃস্বার্থ ও গভীর।
এই মর্মান্তিক ঘটনা একটি বড় প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে—শান্তিরক্ষীদের নিরাপত্তা কি বর্তমান সময়ের উন্নত যুদ্ধকৌশল ও প্রযুক্তির কাছে অরক্ষিত হয়ে পড়ছে? জাতিসংঘের একটি সুরক্ষিত ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালানোর সক্ষমতা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাতে থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। জাতিসংঘ মহাসচিবের বক্তব্য অনুযায়ী, শান্তিরক্ষীদের লক্ষ্য করে এ ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে গণ্য হতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় ও জাতিসংঘকে এই হামলার নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।আমরা শহীদদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। এই দুঃসময়ে শহীদ পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রীয় কর্তব্য। তাঁদের আর্থিক সুরক্ষা, সম্মান ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে চলমান মিশনগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থার আধুনিকায়ন প্রয়োজন। বিশ্বশান্তিতে বাংলাদেশের অঙ্গীকার অবিচল। এই ছয় বীরের আত্মত্যাগ সেই অঙ্গীকারকে আরো দৃঢ় করেছে। রক্তে লেখা শান্তির ইতিহাস বাংলার গর্ব হয়ে থাকবে। আমরা বিশ্বাস করি, তাঁদের আত্মত্যাগ কখনো বৃথা যাবে না। তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, চিরকৃতজ্ঞতা।

