১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ২৫শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

রূপপুর প্রকল্পের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও কারিগরিভাবে স্পর্শকাতর মেগাপ্রকল্প ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র’ এখন এক অনাকাঙ্ক্ষিত আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার মুখে। কালের কণ্ঠের খবর অনুযায়ী প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র এক দিন বাকি থাকলেও সংশোধিত ডিপিপি (আরডিপিপি) এখনো অনুমোদন পায়নি। ফলে প্রকল্পের কাজ চালিয়ে যাওয়া, দেশি-বিদেশি বিশাল জনবলের বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং অপারেশনাল ব্যয় মেটানো নিয়ে যে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা কোনোভাবেই কাম্য ছিল না। একটি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তিম মুহূর্তে এসে সংশোধনী অনুমোদনের জন্য দৌড়ঝাঁপ করা আমাদের নেতিবাচক উন্নয়ন সংস্কৃতিকেই প্রতিফলিত করে। পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) যেসব আপত্তি তুলেছে, তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে পরিবহন, জ্বালানি তেল বা নিরাপত্তা সেবার মতো খাতে ৯ বছরে যা ব্যয় হয়েছে, তার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি অর্থ অবশিষ্ট আড়াই বছরের জন্য চাওয়া হয়েছে, যা অত্যন্ত অস্বাভাবিক। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন একটি বাস্তব সমস্যা হলেও বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের এই ‘অসামঞ্জস্য’ খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। রূপপুর প্রকল্পের মতো জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ কেন প্রশাসনিক ‘শূন্যতার’ ঝুঁকিতে পড়বে? প্রায় এক দশক পার হলেও রাশিয়া থেকে নেওয়া ১১.৩৮ বিলিয়ন ডলারের ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা এবং বিদ্যুৎ বিক্রির মাধ্যমে এর আর্থিক সক্ষমতা নিশ্চিত করার বিষয়টি এখনো অস্পষ্ট থাকা দুঃখজনক। এ ছাড়া পারমাণবিক দুর্ঘটনার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও প্রকল্প-পরবর্তী টেকসই রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনার অভাব আমাদের নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শিতার অভাবকেই নির্দেশ করে। ২০১৬ সালে অনুমোদিত মূল ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্পের মেয়াদ ডিসেম্বর ২০২৫-এ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদিত না হলে এই তারিখের পর বেতন-ভাতা পরিশোধ, নতুন ব্যয় অনুমোদন বা নিয়মিত অপারেশনাল কর্মকাণ্ড পরিচালনার বৈধতা থাকবে না। প্রকল্পের মেয়াদ যত বাড়বে, সুদের বোঝা ও পরিচালনার ব্যয় ততই আকাশচুম্বী হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা মনে করি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা জেদাজেদিতে না গিয়ে দ্রুত একটি অন্তর্বর্তীকালীন সমাধান প্রয়োজন। প্রকল্পের কাজ যাতে থমকে না যায় সে জন্য অন্তত মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টি দ্রুত অনুমোদন দেওয়া জরুরি। তবে একই সঙ্গে প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে প্রতিটি পাই-পয়সার ব্যয়ের যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে হবে। জাতীয় এই সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। রূপপুর যেন কোনোভাবেই অব্যবস্থাপনার কারণে শ্বেতহস্তীতে পরিণত না হয়—সেটিই আমাদের প্রত্যাশা। এখন প্রয়োজন স্বচ্ছ ও বাস্তবসম্মত সংশোধিত ডিপিপি, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং দায়িত্বশীল সমন্বয়। একটি জাতীয় প্রকল্পকে প্রশাসনিক স্থবিরতায় জিম্মি করে রাখা কারো জন্যই কাম্য নয়।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়