৮ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ  । ২২শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

ব্যবসা মন্দা, রাজস্বে ধস

দেশের অর্থনীতি নানামুখী সংকটে জর্জরিত। নতুন বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা চলছে। চালু কলকারখানাও একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বেকারের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। অর্থনীতির এমন নেতিবাচকতার প্রভাব পড়ছে কর আদায়ে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে ৪৬ হাজার কোটি টাকা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। উচ্চ সুদহার, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থানের সংকট—এই তিন চাপে বাংলাদেশের অর্থনীতি সবচেয়ে বেশি ধুঁকছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শুরুতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যে শ্লথগতি দেখা দিয়েছিল, তার রেশ এখনো চলছে। শিল্প-বিনিয়োগের এমন দুরবস্থার জন্য অর্থনীতি বিশ্লেষকরা মূলত দায়ী করছেন ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার এবং ঋণপ্রবাহ অস্বাভাবিক হারে কমে যাওয়াকে। এ ছাড়া রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, মুদ্রাস্ফীতি, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটসহ আরো অনেক কারণেই দেশের শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য ধুঁকছে। অর্থনীতি ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। এনবিআরের বরাত দিয়ে কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল দুই লাখ ৩১ হাজার ২০৫ কোটি টাকা। অথচ এ সময় রাজস্ব আয়ের তিনটি খাতে রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে ৪৫ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা। সবচেয়ে বড় ঘাটতি হয়েছে আয়কর খাতে। এই খাতে ঘাটতি ২৩ হাজার ৫৩২ কোটি টাকা। আমদানি পর্যায়ে ঘাটতি হয়েছে ১২ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। ভ্যাট খাতে ঘাটতি হয়েছে ১০ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারের রাজস্ব আয়ের এমন চিত্র ভোগাবে পরবর্তী রাজনৈতিক সরকারকেও। তথ্য-উপাত্ত বলছে, মানুষের আয় বাড়ছে না। সরকারি হিসাবে বিদায়ি বছরের ডিসেম্বর মাসেও মূল্যস্ফীতি আগের মাসের তুলনায় বেড়েছে। নভেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮.২৯ শতাংশ ছিল, ডিসেম্বরে যা আরো বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৪৯ শতাংশে। অর্থাৎ মাসিক ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। বাসাভাড়া, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যয়ের চাপ বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচ্চ সুদহার বহাল রেখে মূল্যস্ফীতি কমানোর যে নীতি, তা কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি। এমন পরিস্থিতিতে দেশের ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা বলছেন, সার্বিক অর্থনীতির গতিই মন্থর। এখানে প্রবৃদ্ধি কমবে, রাজস্ব কমবে—এটিই স্বাভাবিক। একটি অস্থির সময়ের অর্থনীতি স্বাভাবিক সময়ের মতো উচ্চ বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির পথে হাঁটবে—এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। তাঁরা জানান, সামনেই নির্বাচন। ওই সময় পর্যন্ত সবাই অপেক্ষা করছে। রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সার্বিক ব্যবসা ও অর্থনীতিতে একটা গতি আসতে পারে। তখন রাজস্ব আয়ও বাড়বে। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের টার্নওভার বাড়বে, রাজস্ব আদায়ও বাড়বে। আয় না বাড়লে ট্যাক্স আসবে কিভাবে? দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না থাকলে বিনিয়োগ হয় না। নতুন রাজনৈতিক সরকার এলে ব্যবসার ক্ষেত্রে করনীতি, বিদ্যুৎ-জ্বালানি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ সব বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয় সে বিবেচনায় বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে।’ চরম প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্বে কোনো দেশের অর্থনীতি একবার পিছিয়ে গেলে সেখান থেকে পুনরায় উঠে আসা প্রায় অসম্ভব। তাই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বাভাবিকতা রক্ষা করতে হবে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার কর্মসংস্থান ও আয়-রোজগারের ব্যবস্থা করতে হবে। নীতিনির্ধারকদের এ বিষয়ে ভাবতে হবে, পদক্ষেপ নিতে হবে।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়