মোকাদ্দেস-এ-রাব্বী
ছড়া দিয়ে যিনি শিশুদের হাসান, গল্পে ভর করে কল্পনার ডানা মেলান, আবার প্রকাশনা ও সাংবাদিকতার মাধ্যমে সাহিত্যের নতুন পথ তৈরি করেন; তিনি ছড়াকার, গল্পকার, প্রকাশক ও সাংবাদিক কাদের বাবু। ‘ঝিঁঝি পোকা ঝিঁঝি, আপনি কি খুব বিজি?’ কিংবা ‘দেশ বাঁচাতে নদী বাঁচাই’—এমন সহজ, ছন্দময় অথচ গভীর বার্তাবহ ছড়ার স্রষ্টা কাদের বাবু। ১৯৮৪ সালের ২৪ জানুয়ারি কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নের রসুলপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাবা আবদুল হাকিম ও মা রাবেয়া বেগম। প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম হলেও তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে রংপুরের জুম্মাপাড়ায়। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখি ও সংস্কৃতি অঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত থাকা কাদের বাবু খুব অল্প বয়সেই শব্দের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন। মাত্র ১১ বছর বয়সে ১৯৯৫ সালে দৈনিক যুগের আলো পত্রিকার মাধ্যমে তার লেখালেখি শুরু। এরপর থেকে নিয়মিত লিখে চলেছেন বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকায়। একইসঙ্গে দেড় যুগেরও বেশি সময় যুক্ত ছিলেন সাংবাদিকতায়। দৈনিক ইত্তেফাক, সমকাল, অর্থনীতি প্রতিদিন, পাক্ষিক আনন্দ আলো, সাপ্তাহিক খবরের অন্তরালে, পাক্ষিক উনিশকুড়ি, পর্যটন বিচিত্রা, সাপ্তাহিক বৈচিত্র, সাপ্তাহিক ঠিকানা, মাসিক মদীনাসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করেছেন তিনি। এ ছাড়া কাজ করেছেন অনলাইন নিউজ পোর্টাল নয়াযুগ ও বাংলামেইলে। বর্তমানে তিনি ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকতা করছেন। শিশুসাহিত্যই কাদের বাবুর মূল পরিচয় ও ভালোবাসার জায়গা। তার প্রথম ছড়ার বই ‘মিষ্টি প্রেম ডট কম’ প্রকাশের পর পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এরপর প্রকাশিত হয় গল্পের বই ‘ভূতের বন্ধু টুত’, ‘পরীবাগের পরী’ এবং ছোটদের ছড়ার বই ‘মেঘ ছুটিতে লাটিম ফোটে’। শিশুদের মনোজগৎ বোঝার ক্ষমতা এবং সহজ ভাষায় ভাব প্রকাশের দক্ষতা তার লেখাকে আলাদা করে চিহ্নিত করেছে।
লেখালেখির পাশাপাশি প্রকাশনা জগতেও কাদের বাবুর অবদান উল্লেখযোগ্য। তিনি ছোটদের জন্য আনন্দময় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বাবুই-এর প্রকাশক। তার সম্পাদনায় প্রকাশিত সাহিত্যকাগজ বাবুই পাঠকমহলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। পাশাপাশি তিনি অনিয়মিতভাবে সম্পাদনা করেন ছড়ার কাগজ ‘ছড়াআনন্দ’। সম্পাদনা করেছেন বাংলাদেশের টিনএজ পত্রিকা ‘টিন@টিন’। এ ছাড়া বাংলা ভাষার প্রথম ই-বুক প্রকাশনা সংস্থা সেইবই ডটকমের সঙ্গে যুক্ত থেকে লেখকদের ডিজিটাল প্রকাশনার নতুন জগতে প্রবেশে ভূমিকা রাখেন। অমর একুশে বইমেলায় আনন্দ আলোর বইমেলা বুলেটিন সম্পাদনা করতেন। পরে তিনি ‘টিন@টিন বইমেলা বুলেটিন’ প্রকাশ করে প্রকাশনা অঙ্গনে ব্যাপক আলোচিত হন। সম্পাদনা কাজেও তিনি রেখেছেন দৃঢ় অবস্থান। বাংলাদেশের লেখক ডিরেকটরি তার একটি মৌলিক একক সম্পাদনাকর্ম। এ ছাড়া এককভাবে সম্পাদনা করেছেন বাংলাদেশের সায়েন্স ফিকশন গল্প ও ছোটদের চিরকালীন মজার ছড়া। যৌথ সম্পাদনায় রয়েছে বাংলাদেশের সেরা ছড়া, বাংলাদেশের সেরা গল্প, বাংলাদেশের ভালোবাসার ছড়া এবং বাংলাদেশের ভ্যালেনটাইন ছড়া।করোনাকালে প্রকাশিত ক্যারিয়ার ও উদ্যোক্তাবিষয়ক বই ‘২০০ বিজনেস আইডিয়া: বেকার নয় ব্যবসায়ী হোন’ পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং একাধিক সংস্করণ প্রকাশ করা হয়। এ বইয়ের মাধ্যমে তিনি সাহিত্যের বাইরে গিয়েও বাস্তবমুখী চিন্তায় পাঠকদের অনুপ্রাণিত করেন। শিশুসাহিত্য নিয়ে তার ভাবনা অত্যন্ত স্পষ্ট। কাদের বাবুর মতে, ‘শিশুদের মোবাইল ও ট্যাবের আসক্তি থেকে সরাতে না পারলে ভবিষ্যতে সাহিত্য টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।’ তিনি মনে করেন, শিশুসাহিত্য লেখার জন্য শিশুদের মনস্তত্ত্ব বোঝা জরুরি। বয়সভেদে সাহিত্য ভিন্ন হওয়া দরকার—একদম ছোট শিশু, কিশোর ও টিনএজারদের জন্য আলাদা আলাদা ধাঁচে লেখা প্রয়োজন। বর্তমান প্রজন্মের শিশুরা এখন বিজ্ঞান, মহাকাশ, প্রকৃতি ও বিষয়ভিত্তিক কনটেন্টে আগ্রহী, তাই লেখকদের আরও গভীরে গিয়ে কাজ করতে হবে। একইসঙ্গে বইকে হতে হবে রঙিন ও আকর্ষণীয়, কারণ শিশুরা বেশি ছবি দেখতে চায়।
শিশুদের পাঠাভ্যাস গড়ে তোলাকে তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। তার মতে, ‘শিশুদের মধ্যে যদি পড়ার অভ্যাস তৈরি না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে পাঠকশ্রেণি গড়ে উঠবে না।’ এ লক্ষ্যেই বাবুই প্রকাশনা নিয়মিত মানসম্পন্ন শিশুসাহিত্য প্রকাশ করে যাচ্ছে। লেখালেখির স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৬ সালে কাদের বাবু পেয়েছেন ‘রঙধনু তরুণ ছড়াকার সম্মাননা’। তবে তার কাছে পুরস্কারের চেয়েও বড় আনন্দ মানুষের জন্য কাজ করতে পারা। তিনি বলেন, ‘মানুষের জন্য ভালো কাজ করতে পারলেই জীবন সার্থক। এ আনন্দ আজীবন সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই।’ কাদের বাবু থেমে নেই। ছড়া, শিশু, বই আর পাঠক—এই চারকে কেন্দ্র করেই তার নিরবচ্ছিন্ন পথচলা। দীর্ঘসময় তিনি শিশুদের জন্য, সাহিত্যের জন্য কাজ করে যাবেন।

