২১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ৪ঠা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর

ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ, উন্নয়ন প্রকল্পের নামে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ও লুটপাট। বলা হতো, সে সময়ে গৃহীত অনেক প্রকল্পের ব্যয় প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যেও সর্বোচ্চ। এমন পরিপ্রেক্ষিতে গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতা নেয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। তাদের অঙ্গীকার ছিল উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় কমানো, অপচয় ঠেকানো এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা বাড়ানো।
বাস্তবে হয়েছে উল্টোটা। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকের কার্যবিবরণী বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের মেয়াদে অন্তত ৬৫টি উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এতে অতিরিক্ত যোগ হয়েছে প্রায় ৭৯ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হারও অনেক কম।
অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেও আগের সরকারের অত্যধিক ব্যয়ের সমালোচনা করে প্রকল্পগুলোর ব্যয় কমানোর আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এই সময়ে একনেকের ১৯টি বৈঠকে মোট ৮৭টি চলমান প্রকল্প সংশোধন করা হয়েছে। প্রতি বৈঠকে গড়ে প্রায় পাঁচটি প্রকল্পে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র সাতটি প্রকল্পের ব্যয় কমানো হয়েছে, মোট সাশ্রয় হয়েছে ৯৫০ কোটি টাকা, যা সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর আগের ব্যয়ের মাত্র ২.৪৫ শতাংশ।
বিপরীতে ৬৫টি প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা। আরো ১৫টি প্রকল্পের ব্যয় অপরিবর্তিত রাখা হলেও কাজ শেষ করার সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। এই ৬৫টি প্রকল্পের প্রাথমিক মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল দুই লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকা। সংশোধনের পর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন লাখ চার হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ গড়ে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৩৫.৬৭ শতাংশ।
ইউনূস সরকারের প্রথম একনেক বৈঠকে সংশোধিত যে প্রকল্পগুলো অনুমোদন পায়, তার একটি ছিল গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্প। আগে যেখানে ব্যয় ছিল এক হাজার ৩০৫ কোটি টাকা, সেখানে তা বাড়িয়ে করা হয় এক হাজার ৫৭১ কোটি টাকা। একই বৈঠকে নারী ক্ষমতায়নের জন্য তথ্য-প্রযুক্তিভিত্তিক একটি কর্মসূচির ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় এক হাজার ৬৩০ কোটি টাকা। মেয়াদের শেষ দিকে অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমবারের মতো পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় সংশোধন করে এক লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করে। এই প্রকল্পটি ২০১৬ সালে অনুমোদিত হয়েছিল এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকায়। পরে তা বেড়েছে ২৫ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা অর্থাৎ প্রায় ২২.৬৩ শতাংশ।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আগের সরকারের দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হয়েছিল। গণ-অভ্যুত্থানেরও একটি প্রধান প্রত্যাশা ছিল দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়া। উপদেষ্টারাও নিয়মিত মানুষকে এমন আশ্বাস দিয়ে গেছেন। কিন্তু বাস্তবে অন্তর্বর্তী সরকারের গত দেড় বছরের চিত্র দেখে আমাদের হতাশই হতে হচ্ছে। প্রত্যাশা মার খেয়েছে। আশ্বাস পরিণত হয়েছে মূল্যহীন কথার তুবড়িতে। আমরা আশা করি, নির্বাচিত সরকার জনপ্রত্যাশা পূরণে আন্তরিক হবে এবং অস্বাভাবিক হারে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধান করে তা দেশবাসীকে জানাবে।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়