৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

ফসলি জমিতে নতুন করে লোনা পানির আগ্রাসন

আব্দুল আলিম, সাতক্ষীরা
সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদ আশাশুনিতে আবারো মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে লবণাক্ততার পুরোনো অভিশাপ। উপজেলার তেঁতুলিয়া ও প্রতাপনগর এলাকায় স্লুইস গেট ব্যবহার করে লোনা পানি তোলার অভিযোগ উঠেছে প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে। এতে ওই এলাকার কয়েকশো বিঘা জমির বোরো ধান চাষ হুমকির মুখে পড়েছে। স্থানীয় কৃষকদের দাবি, বর্ষার পানি নিষ্কাশনের জন্য নির্মিত গেট অপব্যবহার করে প্রভাবশালী ঘের মালিকরা বিলে লবণ পানি প্রবেশ করাচ্ছেন। এতে প্রায় ৮০০ বিঘা জমি সরাসরি ঝুঁকিতে রয়েছে, যার মধ্যে চলতি মৌসুমে ৮০ থেকে ১০০ বিঘা জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। পানি আরও বিস্তৃত হলে বিস্তীর্ণ আবাদি জমি, গাছপালা, পুকুরের মিঠা পানি ও স্থানীয় জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই ঘটনায় কৃষকেরা গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করে ইউনিয়ন পরিষদে অভিযোগ দিয়েছেন এবং সম্মিলিতভাবে পানি আটকাতে যাওয়ার চেষ্টা করলেও হুমকির মুখে পিছিয়ে আসতে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে অবৈধভাবে লোনা পানি তোলা বন্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডও স্লুইস গেটের অপব্যবহার প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানিয়েছে। লোনা পানি প্রবেশের আশঙ্কায় প্রতাপনগর ও তেঁতুলিয়া এলাকার কৃষকদের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। তাদের আশঙ্কা, পানি ধানের জমিতে পৌঁছালে শুধু চলতি মৌসুমের ফলনই নষ্ট হবে না, মাটির উর্বরতা কমে গিয়ে আগামী কয়েক মৌসুমেও চাষাবাদ ব্যাহত হবে। এতে পরিবার চালাতে হিমশিম খেতে হবে কৃষিনির্ভর হাজারো মানুষকে।
ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও ইয়াসের পর প্রতাপনগর ইউনিয়নে লবণাক্ততার ভয়াবহ প্রভাব কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময় লেগেছিল। স্থানীয় উদ্যোগে স্লুইস গেট নিয়ন্ত্রণ ও মিঠা পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে গত দুই বছরে হাজার হাজার বিঘা জমিতে ধান ও সবজি চাষ পুনরুদ্ধার হয়, যাকে এলাকাবাসী সবুজ বিপ্লব বলছিলেন। কিন্তু নতুন করে লোনা পানি ঢোকানোয় সেই অর্জন হুমকির মুখে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতাপনগর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের খেয়াঘাট এলাকার স্লুইস গেট দিয়ে শাহাদাৎ হোসেনের নেতৃত্বে একটি চক্র দক্ষিণ বিলে লোনা পানি প্রবেশ করাচ্ছে। এতে প্রায় ৮০ বিঘা জমির ধান তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি স্থায়ী জলাবদ্ধতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, যে স্লুইস গেট দিয়ে এখন লোনা পানি তোলা হচ্ছে, সেটি মূলত বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। কৃষকেরা বলছেন, নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে উল্টো পথে ব্যবহার করে লবণ পানি প্রবেশ করানো হলে তা শুধু চলতি মৌসুমের ধানই নয়, ভবিষ্যৎ চাষাবাদ ও পুরো এলাকার পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ সাইফুল ইসলাম বলেন, উপকূলীয় এলাকায় ফসল উৎপাদন কম হয়। বেড়িবাঁধ নির্মাণের পর কিছু এলাকার চাষিরা লবণাক্ত সহনশীল জাতের ধান চাষ শুরু করেছেন। তবে আবারও মাছ চাষের নামে কেউ কেউ ফসলি জমিতে লবণ পানি তোলার চেষ্টা করছে। ধান চাষ বন্ধ হলে স্থানীয় খাদ্য উৎপাদনে বড় ঘাটতি তৈরি হবে। প্রতাপনগর ইউপি চেয়ারম্যান আবু দাউদ ঢালী বলেন, আমি এরইমধ্যে বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও কৃষি কর্মকর্তাদের জানিয়েছি। প্রয়োজনে লিখিতভাবে জেলা প্রশাসককেও অবহিত করবো। ইউনিয়ন পরিষদে জরুরি সভা ডেকে কৃষক প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বসার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বিভাগ ২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহমান তাযকিয়া বলেন, প্রতাপনগর ও তেঁতুলিয়া এলাকার যে স্লুইস গেট দিয়ে পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয়, সেটি মূলত বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য নির্মিত। আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত আছি। লিখিত অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিকভাবে একটি তদন্ত টিম গঠন করা হবে। কৃষি বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিদের নিয়ে সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রকৃত অবস্থা যাচাই করা হবে। যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে স্লুইস গেট অপব্যবহার করে অবৈধভাবে লোনা পানি তোলা হচ্ছে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়