উৎপল মণ্ডল,শ্যামনগর
কাঁকড়ার প্রজনন মৌসুম ঘিরে সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী-খালে দীর্ঘ দুই মাস কাঁকড়া আহরণ বন্ধ ছিল। নিষেধাজ্ঞা শেষে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপকূলের সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার জেলেরা আবারও কাঁকড়া ধরতে সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খালে নৌকা নিয়ে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বন বিভাগ থেকে অনুমতিপত্র পেয়ে রোববার সকাল থেকে তাঁদের কাঁকড়া ধরা শুরু হবে। এতে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছেন জেলেরা। নিষেধাজ্ঞার সময়ে প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার স্বার্থে কাঁকড়া আহরণ বন্ধ রাখা হয়। এ সময় অনেক জেলে পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে। কেউ বিকল্প পেশায় যুক্ত হয়েছেন, কেউ ধারদেনা করে সংসার চালিয়েছেন। নতুন মৌসুম শুরু হওয়ায় এখন তাদের মধ্যে কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। ১ মার্চ(রবিবার) সকাল থেকে বন বিভাগের পাশ (অনুমতিপত্র) নিয়ে কাঁকড়া আহরণের লক্ষ্যে সুন্দরবনে প্রবেশ করবেন তাঁরা। এ উপলক্ষে জেলেরা নৌকা ও জাল মেরামতসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম গোছানোর কাজ শেষ করেছেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি(শনিবার) সকালে সুন্দরবন সংলগ্ন হরিনগর জেলেপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, পাশের চুনকুড়ি নদীর পাড় থেকে কাঁকড়া ধরার সরঞ্জাম নৌকায় তুলছেন জেলেরা। নৌকার সামনের অংশে প্রয়োজনীয় বাজার-সদাই রেখে তাঁরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন সুন্দরবন যাত্রার। কেউ শেষ মুহূর্তের নৌকার ছোটখাটো ত্রুটি সারছেন। আবার কেউ কাঁকড়া ধরার দোন-দড়ি মেরামতের ব্যস্ত।এসময় কথা হয় জেলে পাড়ার কাঁকড়া ধরা জেলে অরুন মন্ডলের সঙ্গে। তিনি বলেন, সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরেই তাঁর পাঁচ সদস্যের সংসার চলে। অন্য পেশার কাজে তিনি অভ্যস্ত নন। তাছাড়া এলাকায় অন্য কোনো কাজও নেই। বিগত দুই মাস কাঁকড়া ধরা বন্ধ থাকায় বাড়িতে অলস সময় কাটাতে হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত দুই মাস সংসার চালাতে মহাজনের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন। এখন নিষেধাজ্ঞা উঠে গেছে কাঁকড়া ধরে ঋণ পরিশোধের আশা তাঁর।একই এলাকার কাঁকড়া ধরার জেলে নিত্যরঞ্জন মন্ডল নিজেকে হতদরিদ্র দাবি করে বলেন, দুই মাস নিষেধাজ্ঞা চলাকালে আমরা মতো দরিদ্র জেলেদের চরম দুর্দিন গেছে। বন্ধের দিনগুলোয় সরকারি কোনো ভাতার ব্যবস্থা না থাকায় মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়েছে। আর্থিকভাবে সচ্ছল কেউই সুন্দরবনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাঁকড়া ধরতে যান না। যাঁরা যান, তাঁরা প্রায় সবাই দরিদ্র। রোববার সকালে কাঁকড়া ধরার অনুমতি মিলবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুই মাস পর আবারও সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরতে পারায় স্বস্তি ফিরেছে আমাদের মাঝে।পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ অফিস সূত্রে জানা যায়, সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী, কদমতলা, কৈখালী ও কোবাদক ফরেস্ট স্টেশনের আওতায় ২ হাজার ৯শটি নৌকার সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতিপত্র আছে। এর মধ্যে কাঁকড়া ধরার নৌকা ১ হাজার ৬শটি।বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের চারটি স্টেশনের আওতাধীন পুষ্পকাটি, মান্দারবাড়িয়া, নটাবেঁকি ও হলদেবুনিয়া এলাকা অভয়ারণ্য। এছাড়া দোবেকী ও কাঁচিকাটার ৫২ শতাংশ অভয়ারণ্য ঘোষিত। এছাড়াও সাতক্ষীরা রেঞ্জের সুন্দরবনের মধ্যে অভয়ারণ্য ঘোষিত ছোট কেয়াখালী খাল, বড় কেয়াখালী খাল, খোলশিবুনিয়া খাল ও সাপখালী খাল এবং ২৫ ফুটের কম প্রশস্ত খালে সারা বছরই কাঁকড়া ধরা নিষিদ্ধ থাকে। বাকি অংশের নদী ও খালে বৈধ পাস-পারমিটধারী প্রায় ১৫ হাজার জেলে শুধু কাঁকড়া আহরণ করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করেন। ১৯৯৮ সালে কাঁকড়া রপ্তানির নীতিমালা প্রণয়নের পর থেকেই প্রতিবছর দুই মাস কাঁকড়া ধরার পাস-পারমিট বন্ধ রাখা হয়। পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মোঃ মসিউর রহমান জানান, কাঁকড়া বৃদ্ধির লক্ষ্যে সুন্দরবনে বিভিন্ন নদী-খালে দুই মাস জেলেদের কাঁকড়া আহরণ নিষিদ্ধ ছিল। ১ মার্চ থেকে বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে জেলেরা প্রবেশ নিষিদ্ধ অভয়াশ্রম ছাড়া অন্য নদী-খালে কাঁকড়া আহরণ করতে পারবেন। তবে কেউ যাতে সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরার অনুমতি নিয়ে বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে না পারে, সে জন্য বনরক্ষীদের টহল ও অন্যান্য কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে ইঞ্জিনচালিত নৌকা বা ট্রলারে কাঁকড়া পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

