৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

নীতিনির্ধারণে হঠকারিতা, পরিকল্পনার অভাবে চাপে এইচএসসি ২০২৬ ব্যাচ?

হাসান হামিদ
বাংলাদেশের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা একটি সুসংগঠিত কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকার কথা; যেখানে সিলেবাস, পাঠদান, মূল্যায়ন ও পরীক্ষা সবকিছু একটি নির্ধারিত সময়চক্র মেনে চলবে। কিন্তু বাস্তবতা বারবারই দেখিয়েছে, এই কাঠামোর ভেতরে সমন্বয়ের অভাব গভীরতর হচ্ছে। চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা ঘিরে যে অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ এবং ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা কেবল একটি পরীক্ষার সময়সূচি নিয়ে নয়; বরং এটি আমাদের শিক্ষা পরিকল্পনার দুর্বলতা ও নীতিনির্ধারণের অসংগতির একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।
আগামী ৭ জুন থেকে পরীক্ষা শুরু হতে পারে- এমন একটি সম্ভাব্য তারিখ ঘিরে শিক্ষার্থীরা যখন মানসিক প্রস্তুতি নিতে চেষ্টা করছে, তখনো আনুষ্ঠানিক রুটিন প্রকাশ না হওয়া তাদের উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যান্য বছর যেখানে অন্তত দুই মাস আগে রুটিন প্রকাশ করা হয়, সেখানে এবার পরীক্ষা শুরু হতে সম্ভাব্য সময় বাকি থাকলেও রুটিন অনিশ্চিত। এতে শিক্ষার্থীদের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি ব্যাহত হচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। একটি জাতীয় পাবলিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে এমন অনিশ্চয়তা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়, এটি শিক্ষার্থীদের প্রতি এক ধরনের অবিচারও। এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে প্রস্তুতির সময় সংকট।প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী একজন শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর এইচএসসি পরীক্ষায় বসতে প্রায় ২২ থেকে ২৩ মাস সময় পায়। কিন্তু এবারের ব্যাচ বাস্তবে পেয়েছে ২০ মাসেরও কম সময়। এর মধ্যে আবার নিয়মিত ক্লাসের সংখ্যা ছিল অস্বাভাবিকভাবে কম। একাদশ শ্রেণিতে ক্লাস শুরু হয়েছে দেরিতে, অক্টোবর মাসে; ভর্তি প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ায় কার্যকর ক্লাস শুরু হয়েছে নভেম্বর থেকে। ছুটি ও অন্যান্য বিঘ্ন বাদ দিলে একাদশে ক্লাস হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন মাস। দ্বাদশ শ্রেণিতে একই চিত্র—জুলাইয়ের শেষ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মিলিয়ে কার্যকর ক্লাস হয়েছে প্রায় তিন মাস। অর্থাৎ, পুরো দুই বছরের শিক্ষাজীবনে শিক্ষার্থীরা মাত্র সাড়ে ছয় মাসের মতো নিয়মিত ক্লাস পেয়েছে।
এমন একটি প্রেক্ষাপটে পূর্ণ সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। গত কয়েক বছর ধরে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়া হলেও এবার পাঁচ বছর পর পূর্ণ সিলেবাসে ফেরা হচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হতে পারত, যদি পর্যাপ্ত সময় ও প্রস্তুতির সুযোগ নিশ্চিত করা হতো। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীরা একদিকে সময়ের স্বল্পতা, অন্যদিকে বিস্তৃত সিলেবাস; এই দ্বৈত চাপের মধ্যে পড়েছে।
শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের বক্তব্যে একটি বিষয় পরিষ্কার; এই পরিস্থিতিতে অন্তত এক থেকে তিন মাস সময় বাড়ানো প্রয়োজন। তাদের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সুযোগ না পেলে ফলাফলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে। বিশেষ করে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা উচ্চতর গণিতসহ জটিল বিষয়গুলোতে যথাযথ প্রস্তুতি নিতে পারেনি বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষকরা। এই আশঙ্কা অমূলক নয়; কারণ শিক্ষা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যা হঠাৎ করে তাড়াহুড়ো করে সম্পন্ন করা যায় না। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি সামনে আসে, তা হলো পরিকল্পনার অভাব। যদি সরকার বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেয় যে ভবিষ্যতে এইচএসসি পরীক্ষা জুন মাসে নেওয়া হবে, তাহলে সেটি শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই স্পষ্ট করে জানাতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি ২০২৮ সালের পরীক্ষা ফেব্রুয়ারিতে নেওয়ার পরিকল্পনা থাকে, তবে তা এখনই ঘোষণা করা উচিত। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সেই অনুযায়ী তাদের প্রস্তুতি নিতে পারবে। কিন্তু হঠাৎ করে নির্ধারিত সময়ের দুই মাস আগে পরীক্ষা এগিয়ে আনা হলে সেই সময়ের ঘাটতি কীভাবে পূরণ হবে; এ প্রশ্নের কোনো সুস্পষ্ট উত্তর নেই।
নীতিনির্ধারকদের যুক্তি হতে পারে, পরীক্ষা ও ফল প্রকাশের দীর্ঘ প্রক্রিয়া কমিয়ে আনা প্রয়োজন। এটি একটি যৌক্তিক লক্ষ্য। কিন্তু এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য যদি শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির সময় কমিয়ে দেওয়া হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় সমস্যার জন্ম দেবে। শিক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা, কেবল প্রশাসনিক সুবিধা নয়। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষা বোর্ড, এনসিটিবি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। সিলেবাস প্রণয়ন করে এনসিটিবি, পাঠদান পরিচালনা করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আর পরীক্ষা আয়োজন করে শিক্ষা বোর্ড; কিন্তু এই তিনটি স্তরের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকলে পুরো ব্যবস্থাটিই ভেঙে পড়ে। এবারের এইচএসসি পরীক্ষা তারই একটি উদাহরণ। ২৪ মাসের সিলেবাস তৈরি করা হলেও বাস্তবে ২০ মাসের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত একটি নীতিগত অসংগতি। এছাড়া, শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। একটি পাবলিক পরীক্ষা তাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই সময়ে অনিশ্চয়তা, সময়ের অভাব এবং প্রস্তুতির ঘাটতি তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের উচিত শিক্ষার্থীদের এই চাপ কমানো, বাড়ানো নয়।
শিক্ষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে যৌক্তিক পদক্ষেপ হবে পরীক্ষার সময় অন্তত দেড় থেকে দুই মাস পিছিয়ে দেওয়া। এতে শিক্ষার্থীরা বাকি সিলেবাস শেষ করার এবং পুনরাবৃত্তির জন্য কিছুটা সময় পাবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে এ ধরনের সংকট আর তৈরি না হয়। অভিভাবকদের উদ্বেগও অমূলক নয়। এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল সরাসরি প্রভাব ফেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ওপর। যদি ফলাফল খারাপ হয়, তাহলে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়বে। ফলে একটি তাড়াহুড়ো করে নেওয়া সিদ্ধান্ত তাদের ভবিষ্যৎকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে বলা যায়, এইচএসসি পরীক্ষা এগিয়ে আনার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হঠাৎ করে নেওয়া উচিত নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হওয়া প্রয়োজন, যেখানে সিলেবাস, ক্লাসের সময়, পরীক্ষা ও মূল্যায়ন সবকিছু সমন্বিতভাবে নির্ধারণ করা হবে। অন্যথায়, প্রতি বছরই নতুন করে সংকট তৈরি হবে এবং তার খেসারত দিতে হবে শিক্ষার্থীদের। সুতরাং, চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়ন করা জরুরি। একই সঙ্গে বর্তমান শিক্ষার্থীদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে পরীক্ষার সময় পুনর্বিবেচনা করা উচিত। কারণ, একটি প্রজন্মের শিক্ষাজীবন নিয়ে কোনো ধরনের হঠকারিতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
লেখক: ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েট অ্যান্ড কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ (বাংলাদেশ), আইএসএইচআর।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়