প্রতিদিনের ডেস্ক:
আগামী ২৩ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার প্রথম দফার নির্বাচন এবং দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণ ২৯ এপ্রিল। রাজ্যের ২৯৪টি আসনের অধিকাংশতেই গত তিনবারের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে মূল লড়াই রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপির। তবে কিছু কিছু আসনে জোর টক্কর দিতে পারে শতাব্দী প্রাচীন দল জাতীয় কংগ্রেস, কিংবা সিপিআইএম, ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ), আম জনতা উন্নয়ন পার্টি (এজেইউপি) এর মতো অন্য বিরোধী দলগুলোর প্রার্থীরাও।হেভিওয়েট প্রার্থী তালিকায় সবার শীর্ষে রয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী। তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে ভবানীপুর আসন থেকে লড়াই করছেন তিনি। আবার এই আসনটিতে তার প্রধান প্রতিপক্ষ বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী। আগামী ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফায় এই আসনটিতে নির্বাচন। তবে ভবানীপুরের পাশাপাশি পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নন্দীগ্রাম আসনটিতেও এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন শুভেন্দু অধিকারী। যেখানে আগামী ২৩ এপ্রিল প্রথম দফায় নির্বাচন হবে।এর পাশাপাশি তৃণমূলের অন্যতম মুখ তারই বিশ্বস্ত কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম। আসন্ন নির্বাচনে কলকাতা বন্দর আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তিনি। বর্তমানে রাজ্যের পৌরসভা এবং নগর উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি কলকাতার মেয়র পদে রয়েছেন তিনি।হাবড়া আসনে তৃণমূলের প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক ওরফে বালুর দিকেও নজর থাকবে। ২০১১ সাল থেকে এই কেন্দ্র থেকে পরপর তিন বারের বিধায়ক জ্যোতিপ্রিয়। রাজ্যের খাদ্য বন্টন দপ্তরের পাশাপাশি বন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। যদিও রেশন দুর্নীতি মামলায় তাকে কারাগারে যেতে হয়েছিল। তাকে প্রার্থী করার পর দলের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা যায়। ফলে হাবড়ার মানুষ এবার তাকে গ্রহণ করবে কি না সেটাই এখন দেখার বিষয়।পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বর্ণময় চরিত্র হলেন মদন মিত্র। তিনি একাধারে রাজনীতিবিদ, অভিনেতা আবার ছবিতে গানও করেছেন। এবার কামারহাটি আসনে তৃণমূলের টিকিটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মদন। তার বিরুদ্ধেও একাধিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠেছে, জেলও খেটেছেন। যদিও এত কিছুর পরেও তাকেই প্রার্থী করেছে দল।অন্যদিকে শুভেন্দু ছাড়াও বিজেপির প্রার্থীদের মধ্যে খড়গপুর সদর আসনে দিলীপ ঘোষের দিকে নজর থাকবে। দলের সাবেক রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ রাজ্যে পদ্ম শিবিরকে সাংগঠনিক ভাবে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।আসানসোল দক্ষিণের বিধায়ক এবং বিজেপি নেত্রী অগ্নিমিত্রা পালকে এবারও প্রার্থী করেছে বিজেপি। রাজ্যের দলটির অন্যতম বিশিষ্ট মহিলা নেত্রীদের একজন। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী সায়নী ঘোষকে পরাজিত করেছিলেন অগ্নিমিত্রা।শিলিগুড়িতে বিজেপির প্রার্থী বর্তমান বিধায়ক শঙ্কর ঘোষের দিকেও এবার নজর থাকবে রাজনৈতিক মহলের। সিপিআই(এম)-এর সাবেক এই নেতা ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে বিজেপিতে যোগ দেন এবং শিলিগুড়ি কেন্দ্র থেকে জয়লাভ করেন। শঙ্করকে রাজ্যের উত্তরবঙ্গে বিজেপির অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে গণ্য করা হয়।বিজেপির প্রার্থী তালিকায় আরেকটি পরিচিত নাম রেখা পাত্র। এবারে নির্বাচনে হিঙ্গলগঞ্জ আসন থেকে লড়াই করছেন রেখা। নারী নির্যাতন ও জমি দখলের অভিযোগ সামনে আসার পরই ২০২৪ সালে সন্দেশখালি আন্দোলনের সময় রেখা পাত্র বিজেপির একটি পরিচিত মুখ হিসেবে উঠে আসেন। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনেও দুর্নীতি, নারী নির্যাতনসহ একাধিক ইস্যুকে হাতিয়ার করে রাজনৈতিক প্রচারণায় নেমেছেন রেখা।নিজের মেয়ের হত্যার বিচার চেয়ে আন্দোলন করে উঠে আসা বিজেপির আরেক প্রার্থী হলেন রত্না দেবনাথ। আসন্ন নির্বাচনে বিজেপির টিকিটে পানিহাটি আসন থেকে লড়াই করছেন তিনি। ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট কর্তব্যরত অবস্থায় কলকাতার আরজিকর মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতালে ধর্ষণ ও নৃশংসভাবে খুনের শিকার হতে হয় এক শিক্ষানবিশ চিকিৎসককে। রত্না হলেন সেই হতভাগ্য চিকিৎসকের মা।চারবারের বিধায়ক এবং একবারের সংসদ সদস্য অর্জুন সিংকে নোয়াপাড়া আসনে প্রার্থী করেছে বিজেপি। সাবেক এই কংগ্রেস নেতা তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকে সেই দলে ছিলেন। যদিও ২০১৯ সালে তৃণমূল থেকে বিজেপি যোগদান করেন। ২০২২ সালে ফের তৃণমূলে ফিরে যান। ২০২৪ সালে তৃণমূল থেকে ফের বিজেপিতে যোগদান করেন। ব্যারাকপুরে বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধিতে যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে এই অ-বাঙালি নেতার।বিজেপির হেভিওয়েট প্রার্থীদের মধ্যে অন্যতম সাবেক কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক (মাথাভাঙ্গা), রাজ্যসভার সাবেক সংসদ সদস্য সাংবাদিক স্বপন কুমার দাশগুপ্ত (রাসবিহারী), অভিনেত্রী সাবেক সংসদ সদস্য রূপা গাঙ্গুলী (সোনারপুর দক্ষিণ)।কংগ্রেসের প্রার্থী তালিকায় অন্যতম হেভিওয়েট মুখ অধীর রঞ্জন চৌধুরী। এবারের নির্বাচনে বহরমপুর আসন থেকে লড়াই করবেন অধীর। দীর্ঘদিনের সংসদ সদস্য ও ভারতের সাবেক রেল প্রতিমন্ত্রী অধীর রঞ্জন একটা সময় কংগ্রেসের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এরাজ্যে জয়ের খাতাই খুলতে পারেনি কংগ্রেস। ফলে অধীরের হাত ধরে কংগ্রেস ফের এরাজ্যে ঘুরে দাঁড়াতে পারে কিনা সেটাই এখন দেখার।যাদবপুর কেন্দ্রে বামেদের প্রার্থী সিনিয়র আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য। প্রার্থী তালিকা ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই বামেদের অন্যতম প্রধান মুখ বিকাশ রঞ্জন যাদবপুরে প্রচারে ঝড় তুলেছেন। কখনো নারীদের নিয়ে মিছিল, কখনো ছোট সভা করে, কখনো পায়ে হেঁটে জনসংযোগ সারছেন এই সিপিআইএম প্রার্থী। তার বক্তব্য বর্তমান রাজ্য সরকার নারীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে ব্যর্থ। কর্মসংস্থান নেই, রাজ্যের একাধিক সরকারি দপ্তরে দুর্নীতি, স্বাস্থ্যের বেহাল পরিষেবা। ফলে এই সরকারের বদল চাই।এবারের নির্বাচনে আরও একজন হেভিওয়েট প্রার্থী আম জনতা উন্নয়ন পার্টি (এজেইউপি)-হুমায়ুন কবীর। আসন্ন নির্বাচনে রেজিনগর এবং নওদা- এই দুইটি আসন থেকে লড়াই করছেন হুমায়ুন। মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় বাবরি মসজিদ নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে গত ডিসেম্বরে তৃণমূলের রোষানলে পড়েছিলেন এই মুসলিম বিধায়ক। এরপরে দল থেকে সাসপেন্ড করা হয় তাকে। পরবর্তীতে নিজেই নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে নির্বাচনের ঘোষণা দেন।ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের একমাত্র বিধায়ক পীরজাদা মোহাম্মদ নওশাদ সিদ্দিকী এবারও ভাঙ্গর আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করা নওশাদ ফুরফুরা শরীফের অন্যতম সদস্য। মুসলিম সমাজের তার গ্রহণযোগ্যতাও রয়েছে।এছাড়াও তৃণমূলের নামী প্রার্থীদের মধ্যে অন্যতম কৃষিমন্ত্রী শোভন দেব চট্টোপাধ্যায় (বালিগঞ্জ), মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস (টালিগঞ্জ), খাদ্যমন্ত্রী রথীন ঘোষ (মধ্যমগ্রাম), কৃষি বিপণন মন্ত্রী বেচারাম মান্না (সিঙ্গুর), ফায়ার সার্ভিস মন্ত্রী সুজিত বসু (বিধাননগর), শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু (দমদম), তৃণমূলের মুখপাত্র কুনাল ঘোষ (বেলেঘাটা), সাবেক মন্ত্রী গৌতম দেব (শিলিগুড়ি), উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী উদয়ন গুহ (দিনহাটা), সাবেক মন্ত্রী জাকির হোসেন (জঙ্গিপুর), সাবেক আইপিএস কর্মকর্তা হুমায়ুন কবীর (ডোমকল), দলের যুব নেতা ও আইটি সেলের প্রধান দেবাংশ ভট্টাচার্য (চুঁচুড়া)।পাশাপাশি এবারের নির্বাচনে ময়দানে নজর থাকবে সিপিআইএম প্রার্থী মিনাক্ষী মুখার্জী (উত্তরপাড়া), মানস মুখার্জী (কামারহাটি), এবং কংগ্রেস প্রার্থী মৌসম বেনজির নূর (মালতীপুর)-এর দিকেও। পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার নির্বাচনে রাজ্যের ২৯৪টি আসনে ভোট গণনা হবে আগামী ৪ মে।

