প্রতিদিনের ডেস্ক:
একথা সত্য যে, মানুষ জন্মগ্রহণ করার পর যেখানে শিশুকাল ও কৈশোরকাল কাটায়; সেখানের বাতাসের দাগ, জলের দাগ, মাটির দাগ, মানুষের চলনবলনের দাগ গভীরভাবে থেকে যায় মানুষটির মগজ এবং মাংসের কোষে কোষে; চোখের আলোর রসে। পরে ওই মানুষ পৃথিবীর যেখানেই থাক না কেন শিশুকাল কৈশোরকাল যেখানে কাটিয়েছেন; সেখানের ছাপ কোনোদিনই আর ওঠে না; এ ছাপ এমনই অমোচিনীয় যে, পরবর্তীতে তার জীবনের নানা কাজে-কর্মেও তার প্রভাব নির্ঘাত পড়ে। কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীদের ক্ষেত্রে এ সত্য আরও সত্য।
‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বকবি হিসেবে খ্যাত, কিন্তু ভারতীয় বলে বিবেচিত। যদিও বঙ্গদেশে তাঁর জন্ম, জন্মসূত্রে বাঙালি, সাহিত্য সাধনা বাংলায়। তাঁর লেখনিতে আন্তর্জাতিকতা ও সর্বভারতীয় ছাপও বিদ্যমান। কিন্তু সব কিছু মিলে তিনি বাংলার কবি। বাংলার প্রতি মমত্ববোধ এবং দেশাত্মবোধের বলিষ্ঠ উদাহরণ স্বদেশ প্রেমের গান, কবিতা, ছোটগল্প, প্রবন্ধে চিরভাস্বর। কাজী নজরুল ইসলামকে বিদ্রোহী কবি হিসেবে আখ্যায়িত করার ফলে প্রেম-বিরহ-রোমান্টিকতা ও স্বদেশের প্রতি যে বলিষ্ঠ অবদান কিছুটা ম্লান হয়ে পড়ে। জীবনানন্দ দাশ রোমান্টিক কবি হলেও জন্মস্থান বরিশালের নিসর্গ-প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মনলোভা চিত্র নানাভাবে ব্যক্ত করেছেন, যা সত্যিকার অর্থে বাংলার চিরন্তন রূপ। শামসুর রাহমানের কবিতায় পুরান ঢাকা ও নরসিংদীর প্রতিফলন দেখা যায়। কবি আল মাহমুদ ছিলেন তিতাস প্রেমিক। তিতাস নদী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জনপদের প্রসঙ্গ নানাভাবে স্থান পেয়েছে। সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা, প্রবন্ধ ও নাটকে নিজ জেলা কুড়িগ্রাম এবং তিস্তা-ধরলা নদীপাড়ের জীবনগাঁথা নানাভাবে উদ্ধৃত হয়েছে। অভিমানী কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলাদেশকে ছেড়ে গেলেও জন্মভূমি বা নাড়ির কথা ভোলা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। কপোতাক্ষ নদ নিয়ে যে কাব্যরচনা করেছেন তাতেই স্বদেশপ্রেম বলিষ্ঠভাবে প্রতীয়মান। তবে এটা ঠিক—একেক কবির মননের বিকাশ প্রবণতা একেক ধরনের এবং আমাদের কাছে প্রতিভাত হয়। তবে শেকড়ের টান কেউ অস্বীকার করতে পারেন না। মধুকবির পক্ষেও সম্ভব হয়নি। কবিরা নিজ জন্মস্থানের কথা বিশেষভাবে তুলে ধরেন। তবে তা বৃহত্তর অর্থে আঞ্চলিকতা ছাড়িয়ে জাতীয় পরিচয়ে থিতু হয়। সেভাবেই উল্লেখিত কবিগণ সকলেই বাংলার কবি—বাংলাদেশের কবি এবং তাঁদের কাব্য সাধনায় বাংলা সাহিত্যের উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও সেই ধারা অব্যাহত থাকবে।’১
উপর্যুক্ত উক্তিমালা থেকে আমরা সেই স্বতসিদ্ধ প্রমাণটিই পাই যে, জন্মস্থান এবং বেড়ে ওঠার স্থান সকল কবি-লেখকের মধ্যেই শক্তিশালী আঠার মতো, মধুর মিঠার মতো জড়িয়ে থাকে, ছড়িয়ে থাকে। বক্ষ্যমান নিবন্ধের আলোচ্য কবি আমিনুল ইসলামের ক্ষেত্রেও একথা সত্য। আসলে এর ব্যতিক্রম হবার সম্ভাবনা একেবারে নেই বললেই চলে। কবি আমিনুল ইসলামের জন্ম এবং শৈশব-কৈশোর কেটেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মা-মহানন্দা-পাগলা বিধৌত সরস অঞ্চলে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এই অঞ্চলের মানুষ ও মানুষের প্রকৃতি এবং প্রকৃতির প্রকৃতি ও ব্যবহার তার সাহিত্যে অত্যন্ত শক্তিশালী রেখায় আর গাঢ় আবহে ফুটে ওঠে।
‘গৌড়-বরেন্দ্রের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার অঙ্গীকার করেছেন কবি। লোকসম্পদে সমৃদ্ধ এ অঞ্চলের নিজস্ব লোকআঙ্গিক আলকাপ, গম্ভীরার সঙ্গে পুঁথিপাঠ, কবিগান, রাখালিয়া বাঁশি আর কিংবদন্তীর কথা বিভিন্ন প্রসঙ্গেই তাঁর কবিতায় মাঝেমধ্যেই ঘাঁই মারে। বরেন্দ্র’র কৃষক-শ্রমিক-শ্রমজীবী মানুষের অবসর বিনোদনের মাধ্যম এসব লোকসংগীত বিশেষ করে আলকাপ ও গম্ভীরা দুই জনপ্রিয় লোকআঙ্গিক। দলগত পরিবেশনায় এইসব মানুষই সাজে কবি-অভিনেতা দলপতি সরকার। আলকাপ গান, গম্ভীরার সরকার, পুঁথিপাঠ, পৌষমেলা, কবিগানের প্রবাদপুরুষ গুমানি এইসব বিষয় প্রায়শই স্মৃতিবাহিত হয়ে উঠে আসে আমিনুল ইসলামের কবিতায়।বাংলার জলময় ভূগোলে বরেন্দ্র অনেকখানি রুক্ষ। প্রকৃতির এই রুক্ষতাই বাড়িয়ে দেয় নদীতৃষ্ণা। বরেন্দ্রে খুব বেশি নদী নেই। উল্লেখযোগ্য সমস্ত নদীকেই পাওয়া যায় তাঁর কবিতায়: পদ্মা, আত্রাই, মহানন্দা, পুনর্ভবা, করতোয়া, তিস্তা । জলজীয়া প্রাণ কবির একটি কাব্যের নাম ‘মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম’। নাম কবিতায় কবি ‘মহানন্দাকে প্রাণের দোসর বানিয়েছেন’ ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে তাকে বর্ণনা করেছেন। সেই নদীসূত্রে এসেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্য আম, কাঁসা, রেশম প্রভৃতির কথা। স্বর্গের অলকানন্দার সঙ্গে তুলনা করেছেন বরেন্দ্রের মহানন্দাকে; অতীত ইতিহাসের স্মৃতিচারণ করে কবি লিখেছেন।’২
কবি আমিনুল ইসলাম নিজেও তার নিজস্ব মাটিমগ্নতা, মাটিলগ্নতার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘পদ্মা-মহানন্দা-পাগলা-পাঙ্গাশমারী-বিধৌত চাঁপাইনবাবগঞ্জের পলিসমৃদ্ধ চরাঞ্চলে আমার জন্ম। যতদূর মনে পড়ে শিশুকাল হতেই আমি বৃষ্টি ও নদীর অক্লান্ত ভক্ত। বৃষ্টি হলে আমাকে ঘরে বেঁধে রাখবে এমন সাধ্য কারুরই ছিল না। বাস্তবিকই বৃষ্টির নূপুর বেজে ওঠার সাথে সাথে আমার হৃদয়মন ময়ূরের মতো নেচে উঠতো। আর বৃষ্টিমুখর নদীতে দলবলে সাঁতার কাটায় যে আনন্দলাভ ঘটত, পরবর্তী সময়ে মহার্ঘ্য আর কোন কিছুতেই তা জোটেনি। যে কোনো অর্থেই আমি জলের সন্তান—কোনো জনমে জলদাস ছিলাম কি না জানি না। নদী আমার জন্মদাত্রী থেকে খেলার সাথি হয়ে প্রথম যৌবনে প্রেমিকার স্থান দখল করে। ভরাবর্ষায় আমি তরঙ্গায়িত পাঙ্গাশমারীর বুকে গাঙচিলের মতো ঝাঁপ দিতাম আর স্রোত ও ঢেউয়ের দোলায় ভেসে যেতাম দায়হীন আনন্দে—অবারিত অগন্তব্যে। বহুবার নাকানিচুবানি খেয়েছি, তবে কখনো সে আমাকে মাঝগাঙে ডুবিয়ে মারেনি। আমার শৈশব, আমার কৈশোরের মধুর দিনগুলো, আমার যৌবনের বড় অংশ কেটেছে নদীবিধৌত প্রকৃতির উদার অবাধ প্রাঙ্গণে। পরবর্তীতে আমাদের ভিটামাটি জমিজমা সব গেছে সেই নদীর পেটে। পদ্মানদীর গ্রাসে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে আমার জন্মগ্রাম টিকলীচরসহ ওই এলাকার ৪-৫টি ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রাম—মাঠ-ঘাট-হাট-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আমাদের এলাকার মানুষ ছিন্নভিন্ন হয়ে যে যেখানে পেরেছেন, চলে গেছেন। কেউ নতুন চরে, কেউ শহরে, কেউ রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে, কেউবা আরও দূরের কোনো জেলায়। আমার এবং তাদের সবার বুকে নিত্য শেকড়বিচ্যুত হওয়ার যন্ত্রণা। ভিটেমাটিহারা দীর্ঘশ্বাস মাঝে মাঝে আমাকেও ভীষণভাবে স্পর্শ করে। ফারাক্কাবাঁধের অভিশাপে সে নদী এখন ধূ ধূ বালুচর। কিন্তু আমার জাগরণে এবং স্বপ্নে এখনো সেই গ্রাম, সেই মাঠ, সেই নদী, সেই কৈশোর, সেই স্কুল প্রবলভাবে অস্তিত্বশীল।’ (আমার কবিতা: কাছের কেন্দ্র—দূরের পরিধি/ কবিতাসমগ্র-এর ভূমিকা)।কবি আমিনুল ইসলামের সমগ্র সাহিত্যেই রয়েছে তার শেকড়ের ছাপ এবং শেকড়ের প্রতি মধুর অঙ্গীকার। আমার মতে, এই ছাপের, এই মাধুরীর সবচেয়ে গভীর ছাপটি পড়েছে ‘মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম’ কাব্যগ্রন্থে। আবার এই মনোভাবের জালটাকে যদি গুটিয়ে আনি তবে কবিতার বইটির যে কবিতামাছটি সবচেয়ে বড় হয়ে ধরা দেবে, সেটা হলো এ গ্রন্থের নাম কবিতা ‘মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম’ কবিতাটি।
এই কবিতায় কবিতার নান্দনিকতাকে অক্ষুন্ন রেখেই পুরো চাঁপাইনবাবগঞ্জের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভূপ্রকৃতি, মানুষের সুখ, শান্তি, দুঃখ-বেদনাসহ সকল যাপন অবলীলায় তুলে ধরেছেন।কবিতার প্রকাশ কৌশলটি বেশ চমৎকার ও অভিনব। কবিতা বয়ানে কবি ব্যবহার করেছেন প্রথমে চর্মচোখ, তারপর যন্ত্রচোখ তারপর মর্মচোখ। কবিতার শুরুতেই কবিকে দেখতে পাই নদীসংলগ্ন তাসেম বোর্ডিংয়ের ছাদে; তখন মাত্র ভোর; ভোরের হাওয়া গায়ে মেখে কবি বসে আছেন আর চারদিকের যা যা দেখতে পাচ্ছেন তা তা কাব্যিক মাধুর্যে বর্ণনা করছেন। এরপরে কবি যন্ত্রচোখ ব্যবহার করেছেন; বাইনোকুলারে তিনি দেখছেন মহানন্দা নদীর দুপাড়ের দৃশ্যাবলি; দুপারের মানুষের বসতি। এবার তিনি দেখতে থাকেন মর্মচোখ দিয়ে; মর্মচোখ অতীত দেখে, বর্তমান দেখে, ভবিষ্যৎ দেখে। কবিও দেখতে থাকেন শত শত বছরের জানা ইতিহাস থেকে নেওয়া ছবি। এভাবেই কবিতাটি দারুণভাবে নন্দনে বন্ধনে জমে ওঠে।শুধু বাংলাদেশ নয় পৃথিবীর প্রতিটি অঞ্চলেই প্রাথমিকভাবে সভ্যতার আভা ফুটে উঠেছিল নদীকে কেন্দ্র করে এবং নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে। চাঁপাইনবাবগঞ্জও এর ব্যতিক্রম নয়।
‘ভোরের হাওয়া মেখে গায়ে বসে আছি একা
তাসেম বোর্ডিংয়ের ছাদে। বেলা হয়ে আসে,
আলোড়িত ক্ষীণতোয়া মহানন্দা। ঘাটে লৈলারমণীর
ভিড়, স্নান, কাপড়কাচার ধুম, কলসভরে জল
নিয়ে যাওয়া ঘরে। ডোঙায় শ্যালো ইঞ্জিনের
ভটভটানি, তাকিয়ে আছে যাত্রীরা কেউ কেউ
যদি দেখা যায় একচিলতে সিক্ত নান্দনিকতা!’
[মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম]
এই যে ছবি এর পুরোটাই মহানন্দার ঘাটপাড় এবং শহরের একেবারে মূল অংশ। শাহরীক এই অংশের আশেপাশেই হাসপাতাল, ক্লিনিক, থানা, আদালত। গ্রামের মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে নদীপথে, হাঁটাপথে, গরুরগাড়িপথে শহরে আসে। তাদের কেউ কেউ ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা নিয়ে, ওষুধ কিনে ফেরে; কেউ কেউ প্রেমময়ী বধূর জন্য পরনের শাড়ি কিনে নেয়; কেউবা হাজিরা দিতে আসে মামলার। এইসব চেনা দৃশ্য কবির কবিতায় যখন ফুটে ওঠে; তখন তাতে আরও বেশি হয়ে বড় হয়ে নতুন অনুভব আর অনুভূতি তৈরি হয়। কবি বলছেন—
‘গাঁট শূন্য করে বিকেলের রোদ মেখে
তারা ফিরে যাবে গাঁয়ে—সঙ্গে নিয়ে বউয়ের শাড়ি,
নাতনীর আবদার, ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন; অথবা
নিয়তির মতন ঝুলে থাকা দেওয়ানী মামলার নতুন তারিখ।’
[মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম]
এরপর একই অবস্থানে অবস্থান করে বিভিন্ন স্থান দেখানোর জন্য কবি আমাদের বাইনোকুলারের কাছে নিয়ে যান। বাইনোকুলারে চোখ দিয়ে কবির সাথে সাথে আমরা দেখতে পাই—এমন সব দৃশ্য যা আর কোথাও পাওয়া যাবে না; তা হোক জান্নাত-স্বর্গ-হেভেন; কোথাওই মিলবে না। এখানে আছে বিশাল সব আমবাগান; বাগানে ঝুলে আছে ল্যাংড়া, ক্ষীরসাপাত, মোহনভোগ প্রভৃতি আম; যা সকলের রসনাকে সুমধুর রসে রসিয়ে তোলে; খিদে মেটায়; আছে প্রকৃতির কিন্নরী কোকিল শ্যামার গান; এসব বিহঙ্গ গীত গান কানকে আরামে পূর্ণ করে দেয়; আছে খঞ্জনার নাচ; যা চোখকে এবং হৃদয়কে শান্তি দেয়। কবি মহানন্দা নদীকে বলেছেন বরেন্দ্রীর অলকানন্দা। বাইনোকুলারে চোখ লাগিয়ে কবি আমাদের কানে কানে বলে যাচ্ছেন আর দেখিয়ে দিচ্ছেন তার দেখা দৃশ্যাবলি—
‘বাইনোকুলারে আমার চোখ—এপারে রেহাইচর—
ওপারে মহারাজপুর-চকলামপুরের আম্রকানন,
থোকা থোকা আম—ল্যাংড়া ক্ষীরসাপাত মোহনভোগ-
স্বর্গীয় লোভের মতন ঝুলে আছে হাতের নাগালে,
নাকের ডগায়; রসনায় জল এসে যায়। আর ছায়া।
আর প্রকৃতির কিন্নরী কোকিল শ্যামার গান, খঞ্জনার নাচ।
মাঝখানে বয়ে চলে মহানন্দা—সর্পিলা অলকনন্দা বরেন্দ্রীর।
ও বাতাস! অক্সিজেন ভরে আসে বুক। আহা! আমের ট্রাকে
যদি তার নেয়া যেতো কিছুটাও রুগ্নতার রাজধানী ঢাকায়!
জান্নাত—স্বর্গ-হেভেন! কী আর বেশি পাবেন মহাগ্রন্থসমূহে?’
[মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম]
বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল অংশ হলো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস; স্বাধীনতার ইতিহাস। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বীরশ্রেষ্ঠ সাতজনের মধ্যে একজন শহীদ ক্যাপ্টেন মহীউদ্দিন জাহাঙ্গির। ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর চাঁপাইনবাবগঞ্জে যুদ্ধরত অবস্থায় শহীদ হন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কবি ধারণ করেন একেবারে হৃদয় থেকে। তাই তো তার লেখাতে বহুবার বিভিন্নভাবে ফুটে থাকে, উঠে আসে মুক্তিযুদ্ধ; এই কবিতাতেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কথা দুবার এসেছে।
‘দিয়াড় হতে আগত
মানুষ দলে দলে ঢুকছে শহরে—যেমন ঢুকেছিল
মুক্তিযোদ্ধারা সজনতা একাত্তরের মধ্য-ডিসেম্বরে।’
[মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম]
আবার,
‘তারপর সাতচল্লিশ মাড়িয়ে একাত্তর; ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর—
বীরবংশের উত্তরাধিকার বুক দিয়েছে মহানন্দায়।
ওই তো রেহাইচরের ঘাট! মহানন্দায় সেতু—
জাহাঙ্গীরের প্রশস্ত কাঁধ হাত বিছিয়ে দুই পাড়ে—
আর দৃপ্ত পায়ে পার হয়ে আসে স্বাধীনতা!’
[মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম]
আগেই বলেছি, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি কবি আমিনুল ইসলামের ভালোবাসা, প্রেম প্রচণ্ড রকমের। প্রাবন্ধিক জাহাঙ্গীর সেলিমের প্রবন্ধে এ সম্পর্কে জানতে পারি—
‘কবি আমিনুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। বালক বয়সে দেখা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি তার মানসপটে গাঁথা এবং সে সবের বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় গল্প-কবিতায়-ছড়ায়, যেমন- আমার মুক্তিযোদ্ধা হতে পারা না-পারা গল্প, মুক্তিযুদ্ধের কান্না, বালকের দেখা মুক্তিযুদ্ধ, কিশোর এক মুক্তিযোদ্ধার কথা ইত্যাদি কবিতায়—
… মনে আছে—প্রতিজ্ঞার মতো মাথায় বাঁধা
লাল গামছা, পরনে নিত্য প্রস্তুতির মতো লুঙ্গির মালকোচা
কিংবা হাফপ্যান্ট, কাঁধে স্টেনগান আর বুকে লুকিয়ে
দেশপ্রেমের গ্রেনেড, পড়ন্ত বিকেলে নৌকায় আসতেন—
তীরহারা সেই ঢেউসাগরের নবীন মাঝিরা: নজরুল ভাই—
আমজাদচাচা, সামাদকাকা, ইসমাইলমামা এবং আরও অনেকেই।…
কাজের বাহানায় বের হয়ে তাদের একনজর দেখে নিতেন
গেরস্থঘরের বউয়েরাও; আমরা আন্ধাসা আর চালভাজা
দিয়ে আসতাম—বৈঠকের কাছে বাঁধা ভালোবাসার নৌকায়।…
রাতের অন্ধকারে গুড়িয়ে যেত—দূরে কোথাও কোনো
রাজাকার-ক্যাম্প, কিংবা দালালের আস্তানা, অথবা মহানন্দায়
অস্ত্রবোঝাই শত্রুজাহাজের গলুই। কোনো কোনো বার—
মুক্তিযোদ্ধারা সাঁতার কেটে উঠে আসতেন সফল ভোরের মোহনায়;
তাদের ক্ষুধার্ত চোখেমুখে ফুটে থাকত রাতজাগার ছাপ,
আর পরবর্তী অপারেশনের বাজখাই প্রতিজ্ঞা। তাদের
সেই চোখে চেয়ে তাকাতে একধরনের ভয় হতো আমারও।
(আমার মুক্তিযোদ্ধা হতে পারা না-পারার গল্প/ জলচিঠি নীলস্বপ্নের দুয়ার)
মহানন্দা নদীর সাথে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একাত্তরের ১২ ডিসেম্বর মহানন্দার পাড়ে মুক্তিবাহিনীর সাথে শত্রুসেনার সঙ্গে মরণপণ যুদ্ধ শুরু হয়। নদীর পাড় রেহাইচরে ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর মুক্তিযোদ্ধাদের বেস ক্যাম্প তৈরি করেন এবং এখান থেকেই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। স্বাধীনতা লাভের প্রাক্কালে ১৪ ডিসেম্বর মহানন্দার পাড়েই তিনি না ফেরার দেশে চলে যান। তার নামেই মহানন্দা নদীর ওপর রচিত সেতু। এই নিয়ে আমিনুল ইসলাম চমৎকার কাব্যভজনা করেছেন।’৩
সোনালি সুন্দর মহানন্দা তার জীবন্ত সরস শরীর নিয়ে এঁকেবেকে বয়ে গেছে বহু জায়গা দিয়ে যেমন তেমনভাবেই কবি আমিনুল ইসলামের ‘মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম’ কবিতাটিও প্রকৃতির, অনুভবের, ইতিহাসের, প্রেমের, মর্মবেদনার, মনোবাসনার, মানুষ ও মিথের বহু কূল উপকূল ছুঁয়ে গেছে; বহুবিধ বিষয়ের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। কবিতাটির প্রধান শক্তিই বহুবিষয়ের বহুপ্রেমীতা।
‘মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম’ একটি কাব্যগ্রন্থ এবং এ কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতার নামও তাই। এই নাম কবিতাটি নিয়ে অনেক মানুষ তাদের মুগ্ধতার কথা, হৃদয় নাড়ানোর কথা বলেছেন। যেমন- কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বলেন—
‘কবি আমিনুল ইসলামের যে বইটি আমি প্রথমে হাতে পাই সেটি হলো মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম। প্রকাশকাল ২০০৪। বইটির নাম আমাকে খুব আগ্রহী করে। কারণ মহানন্দা আমার তরুণ বয়সের প্রিয় নদী। ভোলাহাটে মহানন্দার পাড়ে দাঁড়িয়ে নদীকে দেখেছি দু’চোখ ভরে।২০০৪ পর্যন্ত আমি বাংলা একাডেমিতে কর্মরত ছিলাম। একুশের বইমেলা থেকে বাংলা একাডেমির কেউ আমাকে বইটা দিয়ে বলেছিল, বইয়ের নামে আছে আপনার স্মৃতির নদী। আপনার না অনেক স্মৃতি আছে মহানন্দ নদী, সোনা মসজিদ, রোহনপুর, ইলামিত্রকে নিয়ে?
আছে তো, বলে আমি বইয়ের পাতা উল্টাই। কবিতা আমার প্রিয় পাঠ্য। বইয়ের শেষ কবিতা মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম। বেশ বড় কবিতা। খুঁজে পাই দৈনন্দিন জীবনের সাথে ইতিহাসের প্রেক্ষাপট। দেখতে পাই সোনা মসজিদের অপূর্ব কারুকার্যময় দেয়াল। কবিতার পংক্তিতে ভেসে ওঠে সময়ের কাঁটাতারে প্রজাপতির ডানার নান্দনিক শিল্প।’৪
কবিতাটি ভালো লাগার বিভিন্ন কারণের মধ্যে অন্যতম কারণ হিসেবে কথাকার সেলিনা হোসেন যেমন বললেন ‘মহানন্দা আমার তরুণ বয়সের নদী। ভোলাহাটে মহানন্দার পাড়ে দাঁড়িয়ে নদীকে দেখেছি দুচোখ ভরে।’ তেমনভাবে এই মহানন্দার তীরেই আমার জন্ম, আমার বেড়ে ওঠা, এর জলেই আমার অবগাহন। এই সকল কারণেও আমার ভালো লাগার আর ভালোবাসার কবিতা এটি। আমিও বিস্ময় নিয়ে, প্রেম নিয়ে, মমতা নিয়ে, ঋণিবোধে তাকিয়ে থাকি মহানন্দার শান্ত সুন্দর সাবলীল জলের দিকে। আমরাও মনে হয় এই মহানন্দা ‘দেবরাজের বর’ কি না!এই নদীকে কেন্দ্র করে এই নদীর তীরে বহু ঘটনা ঘটে গেছে ব্যক্তি মানুষের যেমন তেমনভাবে মানুষের সামষ্টিক ইতিহাসেরও। কবিতাটিতে ইতিহাসের ভেতর থেকে উঠে এসে ঠাঁই নেয় তুর্কি, নবাব, শ্বেতলুটেরারা। কবির ভাষায়—
‘এই যে মহানন্দা—দেবরাজের বর ছিল কি না কে জানে!
এই জলের আরশিতে বিম্বিত মহাজীবনের জলছবি।
ওই যে বারঘরিয়ার ঘাট—আজ মাঝিশূন্য, একদিন ওই ঘাটে
এসে থেমেছিল তুর্কিদের ঘোড়া সাম্যের সোয়ারি বয়ে কাঁধে;
আর নক্ষত্রের মতো হেসে উঠেছিল প্রাকৃত নারীর চোখ!
এই জলেই মুখ দেখে আপন, তলোয়ার রেখে জমিনে
মাটি চুমেছিলেন সুলতানের সেনাপতি।
আজ কোথায় সে মরুর অরণ্য! আর কোথায় সে প্রত্যাদেশ!
গৌড়ে সে ঘুমায় আজো সোনামসজিদের স্বর্গশাসিত ছায়ায়।
নানার হুঁশিয়ারি মেনে নবাব কি এসেছিলেন ছুটিয়ে ঘোড়া
আমাদের এই রেশমি উদ্যানে? তাই কি নবাবগঞ্জ!
তারপরও এসেছে শ্বেতলুটেরা!
আমের বাগান দষ্ট পেয়ালার মতো ভরেছে নীলের বেদনায়!
আর জমিদার? সে তো মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা।’
[মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম]চাঁপাইনবাবগঞ্জ ইতিহাস-ঐতিহ্যের, শিল্প-সংস্কৃতি এবং বিবিধ পেশার মানুষের জীবনভূমি। কিন্তু চিরকাল কোনো স্থানের প্রচ্ছদপট, প্রেক্ষাপট একইরকম থাকে না; পরিবর্তন হয় বছর বছর, যুগে যুগে, শতাব্দিতে শতাব্দিতে। প্রচ্ছদপটের, প্রেক্ষাপটের অর্থাৎ ঐতিহ্য ও চলমানতা বিষয়ে মানুষ সব সময়ই দোদুল্য থাকে। চলমানতার চকচকে রূপ মানুষকে ধাঁধিয়ে রাখে আবার ঐতিহ্যের শেকড়ও সহজে ছিঁড়তে পারে না।যে চাঁপাইনবাবগঞ্জে, যে মহানন্দার তীরে, সন্ধ্যা হলেই ঝড়–পালের গম্ভীরা শোনা যেত, মানিক সরকারের আলকাপের গান শোনা যেত; সেসব আর শোনা যায় না। নদীতে মালোদের আর নৌকাও নেই তেমনভাবে। এসবই কবিকে বেদনাহত করে। তখন ও এখনের মহানন্দার তীরের ছবির রেখা বুননের পার্থক্য কবিকে তীব্রভাবে কাতর করে তোলে। কবি কবিতাতে মনের কান্না ঢেলে দেন।
‘থেমে এসেছে কাঁসারিপট্টির টুংটাং; মানিক সরকারের
আলকাপের গলা—না, সেও আর আসে না কানে।
উজানের শাপে মালোদের নৌকাগুলো ধরেছে চুলোর পথ
জানি না—সে কী আশায় দেড় বাঁও জল নিয়ে বুকে,
শ্মশানবৈরাগীর মতন বসে আছে বুড়ি খালঘাট
স্মৃতিবন্দি ফতুর উঠোনে।
আমাদের একজন অদ্বৈতমল্ল নেই; থাকলে আমরাও
পেতাম: কালের স্রোতে মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম।’
[মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম]
কবিতার এ অংশে দুরকমের বেদনা দেখতে পাই কবির। একটি হচ্ছে ঐতিহ্যের লোপাট হয়ে যাবার বেদনা। অন্য বেদনাটি একেবারে অন্যরকম। এটি একটি মনোবেদনা এবং মনোবাসনার মিথষ্ক্রিয়া। একই সাথে তার বেদনা এবং প্রার্থনা হলো, একজন অদ্বৈতমল্ল বর্মন নেই এবং একজন অদ্বৈতমল্ল থাকুক যিনি মহানন্দাকে নিয়ে একটা কিছু করবেন যা মহানন্দাকে অমরত্ব দান করবে।
জানি না, কবির এই মনোবেদনা মিটবে কি না বা মনোবাসনা পূরণ হবে কি না। তবে কবি আমিনুল ইসলাম মহানন্দাকে নিয়ে যে কাব্য তৈরি করলেন তা-ও মহানন্দার অস্তিত্বের একটা বিরাট অভিজ্ঞান হয়ে থাকবে। এ ব্যাপারে আমি প্রাবন্ধিক ফখরুল ইসলামের সাথে আমি একমত। ফখরুল ইসলাম তার একটি লেখাতে বলেন—
‘তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনায় যেমন রাঢ়ের পরিচয় মূর্ত হয়ে ওঠে, তেমনি কবি আমিনুল ইসলামের রচনায় গৌড়-বরেন্দ্র। তারাশঙ্করের সহায় ছিল কথা, আর আমিনুল ইসলামের সহায় কবিতা—এই পার্থক্য। আঙ্গিকগত কারণেই কবিতায় বর্ণনার সীমাবদ্ধতা, একথা জেনেও কবি তাঁর মাতৃদায় মোচনের চেষ্টা করেছেন। গৌড়-বরেন্দ্রের ভূ-প্রকৃতি, নিসর্গ, মানুষ, তার যাপিত-জীবন, লোক-ঐতিহ্য, ইতিহাস, নৃতত্ত্ব-ভাষা সবদিকেই সন্ধানী আলো ফেলেছেন কবি। তাই তাঁর কবিতায় গৌড়-বরেন্দ্রকে সম্পূর্ণরূপে আবিষ্কার করা যায়। কবি ‘মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম’ কবিতায় আক্ষেপ করে বলেছিলেন—‘আমাদের একজন অদ্বৈতমল্ল নেই’ থাকলে অন্তত মহানন্দা ও তার দু’পাড়ের মানুষের কথা উঠে আসত। কবির সঙ্গে সঙ্গে এ আক্ষেপ আমাদেরও। কিন্তু এ আক্ষেপের প্রশমন ঘটে এই দেখে যে কবি আমিনুল ইসলাম যেন সে দায় ‘আমার যেটুকু সাধ্য করিব তা আমি’ এই বলে নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছেন।’৫
প্রাবন্ধিক ফখরুল ইসলামের সাথে আমি একমত এবং তার সুরেই স্বর মিলিয়ে বলতে চাই, আমাদের একজন অদ্বৈতমল্ল বর্মন নেই কিন্তু আমরা একজন আমিনুল ইসলামকে পেয়েছি; যিনি তার কাব্যচেতনায় মহানন্দাকে ধারণ করেন, স্মরণ করেন এবং মহানন্দার মরণ রোধ করার জন্য তার কাব্যিক হৃদয় হতে উৎপন্ন কলম তুলে নেন হাতে। ‘মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম’ নামক কবিতাটি তো বটেই এই নদী এবং নদীর লীলাকে উপজীব্য করে আরও অনেকগুলো কবিতা কবির আছে। এসব কবিতার মধ্যেও মহানন্দার রূপ রস কীর্তি সাবলীলায় ফুটে আছে। ফলে বলা যায়, মহানন্দাকীর্তন হয়তো তেমনভাবে কোনো উপন্যাসে হয়নি কিন্তু আমিনুল ইসলামের কবিতায় বেশ চমৎকারভাবে এবং সফলভাবেই হয়েছে। এবং ব্যাপারটাকে অধ্যাপক গোলাম কবির তার একটি লেখায় তুলে ধরেছেন নিম্নোক্তভাবে—
‘…কাব্যের নাম কবিতা ‘মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম’-এ আর একবার জন্মস্থানকে তুলে ধরেছেন ভাঙাগড়ার ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের ‘তাসেম বোডিংয়ের ছাদে বসে কবির প্রিয় মহানন্দা চোখে পড়ে। প্রত্যক্ষ করেন লৈলারমণীর ভিড়। নবাবগঞ্জ শহরের পশ্চিম পাশে লৈল্যাপাড়া। ওরা এখন বলছেন মসজিদ পাড়া। সেখানকার মহিলাদের স্নান, কাপড়কাঁচা, রান্নার পানি নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি ‘ক্ষীণতোয়া মহানন্দা’তেই তারা সমাপন করে নিত্যদিন। ঐ লৈল্যারমণীরা কি কোনদিন ভাবতে পেরেছিলো চাঁপাই এর এক বিদগ্ধ কবি কবিতার আখরে তাদের অক্ষয় করে রাখবেন। দিয়াড় অঞ্চল থেকে দলে দলে নবাবগঞ্জ শহরে আগমনকে কবি একাত্তরের ডিসেম্বরে মুক্তিযোদ্ধাদের আগমনের সাথে তুলনা করেছেন। কবি আরও দেখতে পান মহানন্দার এপারের রেহাইচর আর ওপারের মহারাজপুর এবং চকলামপুরের আম্রকানন শোভিত শ্যামল প্রচ্ছায়া। তারপর কবি ইতিহাসের পথে হাঁটেন—তুর্কীদের আগমন থেকে আজকের ইতিহাসকে বিম্বিত করেন এ কবিতায়। কবির দুঃখ, চাঁপাইতে যদি একজন অদ্বৈতমল্ল বর্মনের মতো অমিত প্রতিভার আবির্ভাব ঘটতো তবে হয়তো ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের মতো রচনা করতেন, মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম’। আমরা মনে করি কবিতার সংক্ষিপ্ত পরিসরে বিস্তৃত ব্যঞ্জনায় কবি সে দায়িত্ব স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালন করেছেন।’৬
সুতরাং মহানন্দাকে নিয়ে একটা উপন্যাস হয়নি এমন বেদনা থাকলেও কবি আমিনুল ইসলামের কাব্যজুড়ে নাব্য আর স্রোতময় থাকবে মহানন্দা এ বিশ্বাস গভীরভাবেই থাকল গভীর হৃদয়ের ভেতর।
কবি আমিনুল ইসলামের প্রচুর কবিতা রয়েছে, যার সবগুলো না হলেও একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যার কবিতা আমার পাঠ করা। এবং পঠিত কবিতারগুলো মধ্যে ‘মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম’ বিশেষভাবে প্রিয়। আমিও মহানন্দার স্তন্যলালিত সন্তান বলেই যে এর প্রতি আমার এই ভালো লাগা শুধু তা কিন্তু নয়। কবি আমিনুল ইসলামের কবিতার চলন, এতে উপমা উৎপ্রেক্ষার স্বতঃস্ফূর্ত ব্যবহার, বক্তব্য বলাতে এবং কাব্যের চিত্র আঁকার ক্ষেত্রে অভিনব কৌশল, মুসলিম ঐতিহ্য এবং হিন্দু মিথের সফল এবং প্রাসঙ্গিক ব্যবহৃতি আমাকে মুগ্ধ করে। তার এসব কাব্যকৌশলগুণ তাকে শুধু অঞ্চলের নয় পৃথিবীর কবি করে তোলে।
যে কবিতা নিয়ে এই লেখা সেই কবিতা থেকেই কয়েকটি মাত্র উদাহরণ দিয়ে আমার মুগ্ধতাকে প্রমাণ করার চেষ্টা করবো এবং লেখাটিকে শেষ করবো। এই কবিতায় ‘মুয়াজ্জিনের আজান’, ‘তুর্কিদের ঘোড়া’, ‘সোনামসজিদ’, ‘সুলাতানের সেনাপতি’ ইত্যাদি মুসলিম ঐতিহ্যের ব্যাপার যেমন বলিষ্ঠভাবে আসে তেমনভাবে আসে ‘কিন্নরী’, ‘অলকানন্দা’, ‘দেবরাজের বর’, ‘শ্মশানবৈরাগী’ প্রভৃতি হিন্দু শাস্ত্রীয় ও মিথীয় বিষয়।
‘তাকিয়ে আছে যাত্রীরা কেউ কেউ
যদি দেখা যায় একচিলতে সিক্ত নান্দনিকতা!’
[মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম]
উপর্যুক্ত পঙ্ক্তিতে যে সৌন্দর্যের কথা বলা হয়েছে তা নিখাদ দৈহিক কিন্তু এখানে বা এর আগে পরে একবারও দেহের কোনো উল্লেখ নেই। ‘এই সিক্ত নান্দনিকতা’র মধ্যে যে অসাধারণ কাব্যিক নান্দনিকতা ফুটে উঠেছে তা সত্যিই অতুলনীয়। কবি আমিনুল ইসলামের কবিতাখনি খুঁড়ে দেখলে আরও প্রচুর এমন নন্দনতাত্ত্বিক মণি-মুক্তা খুঁজে পাওয়া যাবে। ‘মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম’ কবিতাটি টিকে থাক, আরও ছড়িয়ে পড়ুক অজস্র মানুষের হৃদয় থেকে হৃদয়ে। কবি আমিনুল ইসলামের হৃদয় হয়ে উঠুক আরও বড় কাব্যঝরনা, কাব্যনদী, কাব্যসাগর।

