১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ২৫শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

যুদ্ধের উদ্বেগ ও তীব্র গরমের মধ্যেই শুরু হলো পবিত্র হজ

প্রতিদিনের ডেস্ক:
তীব্র গরম এবং যুদ্ধ নিয়ে তৈরি হওয়া আঞ্চলিক উদ্বেগ-অনিশ্চয়তার আবহেই সোমবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে বার্ষিক পবিত্র হজ পালন। ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম একটি স্তম্ভ হলো এই হজ। এর অংশ হিসেবে মুসল্লিরা মিনা, আরাফাত ময়দান, মুজদালিফা ও মক্কায় ৮ থেকে ১২ জিলহজ মোট পাঁচদিন অবস্থান করবেন।হজের পাসপোর্ট বাহিনীর কমান্ডার সালেহ বিন সাদ আল-মুরাব্বা গত শুক্রবার জানিয়েছেন, এবার সৌদি আরবের বাইরে থেকে ১৫ লাখের বেশি হজযাত্রী দেশটিতে এসে পৌঁছেছেন। ইরান যুদ্ধের একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি এবং এর সঙ্গে জড়িত আঞ্চলিক উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তার পটভূমির মধ্যেই আল্লাহর দরবারে হাজিরা দিতে দলে দলে ছুটে এসেছেন বিশ্বাসী মুসলমানরা।শারীরিক ও আর্থিকভাবে সক্ষম সব মুসলমানের জন্য জীবনে অন্তত একবার হজ করা ফরজ। হজে আসতে পেরে আল্লাহর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন মিসরের নারী হজযাত্রী সামিয়া আবদুল মোনেম। রবিবার মক্কায় তিনি বলেন, ‘আমি অত্যন্ত বরকত ও আনন্দের মধ্যে আছি। এটি সত্যি এক অবর্ণনীয় অনুভূতি। আমি বলতে চাচ্ছি, আল্লাহর শুকরিয়া যে আমি এই নেয়ামতের মধ্যে শামিল হতে পেরেছি।’সাধারণত হজের প্রথম দিনে মক্কার অনেক হজযাত্রীই কাছের মরুভূমিতে অবস্থিত মিনার বিশাল তাঁবু নগরীতে গিয়ে সমবেত হন। এর আগে, তীব্র গরমের মধ্যেই হজযাত্রীরা মসজিদুল হারামে পবিত্র কাবা শরিফ তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করেছেন। হজযাত্রীদের কাছে হজ হলো একটি গভীর আধ্যাত্মিক অনুভূতির অভিজ্ঞতা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ও অতীতের গুনাহ মাফ করিয়ে নেওয়ার এক পরম সুযোগ। কয়েক দিন ধরে হাজিরা হজের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবেন।
তীব্র গরমের মুখোমুখি হজযাত্রীরা
অনেকেই জীবনে একটি বার হজ পালন করার আশায় বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষা ও প্রার্থনা করেন বা টাকা জমান এবং এই সফরের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতির অপেক্ষায় থাকেন।তীব্র গরমের মধ্যে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে গিয়ে হাজিদের অনেকেই ছাতা ও হাতপাখা ব্যবহার করছেন। হাজিরা যাতে পানিশূন্যতায় না ভোগেন, সেজন্য স্বেচ্ছাসেবকেরা পানির বোতল বিতরণ করছেন এবং বড় বড় ফ্যান থেকে পানির হালকা কুয়াশা ছিটানো হচ্ছে।হজের এই সফরের আগে কিছু হজযাত্রী জানিয়েছেন, চলমান উত্তেজনার মধ্যে এই যাত্রা শুরু করার সময় তারা তাদের বিশ্বাসের ওপর ভরসা রাখছেন এবং এই সুযোগ পাওয়ায় মনে গভীর কৃতজ্ঞতা অনুভব করছেন। হজ মূলত বিভিন্ন বর্ণ, জাতি, ভাষা ও অর্থনৈতিক শ্রেণির বিপুলসংখ্যক মুসলমানকে একত্রিত করে, যা অনেকের মধ্যে ঐক্যের এক অনন্য অনুভূতি তৈরি করে।
আঞ্চলিক উত্তেজনা ও হজ যাত্রার খরচ
বিশ্বজুড়ে উচ্চমাত্রার অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম জনসংখ্যার দেশ ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ হজ মৌসুমের আগে থেকেই জরুরি পরিকল্পনা বা আকস্মিক পরিস্থিতি মোকাবিলার ওপর জোর দিয়েছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ভ্রমণ খরচ যেন ইন্দোনেশিয়ান হজযাত্রীদের ওপর চাপানো না হয়, সেই বিষয়ে নির্দেশনা জারি করেছে।অন্যদিকে, বিশাল মুসলিম সংখ্যালঘু জনসংখ্যার দেশ ভারতে হজের পরিকল্পনা মূলত স্বাভাবিকভাবেই এগিয়েছে। তবে জ্বালানির উচ্চ মূল্যের কারণে ভারতের হজযাত্রীদের যাতায়াত খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে।গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার পর বিশ্বব্যাপী যে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছিল, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হলে তা প্রশমিত হতে শুরু করবে। ওই হামলার পর তেহরান কার্যত এই জলপথটি বন্ধ করে দিয়েছিল, যার ফলে তেল, গ্যাস এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় ধাক্কা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রও এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ করে রেখেছে। রবিবার ট্রাম্প বলেছেন, ‘একটি চুক্তি সম্পন্ন, প্রত্যয়িত এবং স্বাক্ষরিত না হওয়া পর্যন্ত এই অবরোধ সম্পূর্ণ কার্যকর থাকবে।’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওই হামলার জবাবে ইরানও প্রতিশোধমূলক হামলা চালায়, যার ফলে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়েছিল। পরবর্তীতে গত এপ্রিলে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইসরায়েল এবং অঞ্চলের অন্যান্য মিত্রদের সঙ্গে ফোনালাপের পর ইরান যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া সংক্রান্ত একটি চুক্তি ‘মোটামুটি আলোচনা করা বা চূড়ান্ত হয়ে গেছে’। তিনি এটিকে ‘শান্তি সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা এখনও যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং আলোচনায় অংশ নেওয়া অন্য দেশগুলোর মাধ্যমে চূড়ান্ত করা বাকি রয়েছে। এমন এক সপ্তাহে এই অগ্রগতি হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নতুন করে হামলার কথা বিবেচনা করছিল।এদিকে সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর গত কয়েক দিন ধরে হজযাত্রীরা কাবা শরিফ তাওয়াফ করছেন। যেসব হজযাত্রী মিনায় যাবেন, তারা সেখানে বিশাল তাঁবুর শহরে অবস্থান করবেন এবং প্রার্থনা ও ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকবেন।
আগামীকাল মঙ্গলবার, যাকে হজের মূল বা সর্বোচ্চ আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেদিন হজযাত্রীরা আরাফাতের ময়দানে গিয়ে দাঁড়াবেন। সেখানে তারা আল্লাহর প্রশংসা করবেন, ক্ষমা প্রার্থনা করবেন এবং মোনাজাত করবেন। অনেকেই তাদের প্রিয়জনদের দেওয়া দোয়ার অনুরোধ সঙ্গে নিয়ে আসেন এবং অশ্রুসিক্ত চোখে দুহাত তুলে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা জানান।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়