আমীন আল রশীদ
মাত্র ৬ কার্যদিবসের মধ্যে গতকাল রবিবার যখন রাজধানীর পল্লবিতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করলেন আদালত, সেদিন মাগুরায় ধর্ষণ ও হত্যার শিকার শিশু আছিয়ার মা সাংবাদিকদের বলেছেন, তিনি মেয়ে হত্যার বিচারের আশা ছেড়ে দিয়েছেন। কেননা মৃত্যুদণ্ডের রায় হওয়ার এক বছরের বেশি সময় পার হলেও এখনও সেই রায় কার্যকর হয়নি। আর এ নিয়েই ক্ষোভ, হতাশা ও শঙ্কার কথা জানিয়েছেন আছিয়ার মা আয়েশা খাতুন।গত বছরের ৫ মার্চ মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার জারিয়া গ্রামে বড় বোনের শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হয় তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আছিয়া। গুরুতর অবস্থায় প্রথমে তাকে মাগুরা ও পরে ঢাকায় নেওয়া হয়। কয়েকদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) তার মৃত্যু হয়। ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও আন্দোলনের জন্ম দেয়।ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায়ও দ্রুত রায় দিয়েছিলেন আদালত। রায়ে প্রধান আসামি হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। তবে আইন অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকরের আগে হাইকোর্টের অনুমোদন এবং আপিল শুনানি সম্পন্ন হওয়া বাধ্যতামূলক বলে মামলাটি এখনও উচ্চ আদালতে বিচারাধীন।মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর না হলেও এ ঘটনার বিচার হয়েছে এবং আসামি এখন জেলে, এটি অবশ্য আশার সংবাদ। কেননা এরকম আরও অসংখ্য রামিসা ও আছিয়া ধর্ষণ ও খুনের শিকার হলেও সব মামলায় এত দ্রুত রায় হয়নি। উপরন্তু বছরের পর বছর মামলা বিচারাধীন থাকায় ভুক্তভোগী পরিবার হাল ছেড়ে দিয়েছে। অনেক মামলায় অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় আসামিরা ছাড়া পেয়ে গেছে। অনেকে জামিনে বেরিয়ে গেছে। ফলে এরকম একটি ত্রুটিপূর্ণ বিচারব্যবস্থার দেশে যে শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচারকাজ মাত্র ৬ কর্মদিবসে শেষ হলো, সেটি কম কথা নয়।বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার ওপর বিপুল সংখ্যক মানুষের কোনো আস্থা নেই। মানুষ মনেই করে, বিচার হচ্ছে ক্ষমতাবান ও টাকাওয়ালাদের জন্য। গরিব ও ক্ষমতাহীনের জন্য ‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।’ যদিও সবার ক্ষেত্রে এই অভিযোগ যে সত্য নয়, তার প্রমাণ রামিসা ও আছিয়া। কিন্তু কেন হাজারো ঘটনার মধ্যে দুয়েকটি মামলায় এ দ্রুত রায় হয়ে যায় এবং দৃশ্যত সেই বিচারগুলো নিয়ে সমাজের মানুষ আনন্দিত হয়, আর অগণিত ঘটনার কেন বিচার হয় না বা বিচার ঝুলে থাকে, সেই প্রশ্নের উত্তর মোটামুটি সবার জানা।আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, ঘটনার পরপর হত্যার শিকার শিশুটির বাবা আবদুল হান্নান মোল্লাও আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড নেই।’ তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘এটা বড়জোর ১৫ দিন চলবে, আবার কোনো ঘটনা ঘটবে। এরপর এটা ধামাচাপা পড়ে যাবে।’
একটু পেছনে ফেরা যাক। ২০১৫ সালে রাজধানী ঢাকায় ধারালো অস্ত্রধারীদের আক্রমণে নিহত হন জাগৃতী প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফয়সাল আরেফিন দীপন। তখন তার বাবা, খ্যাতিমান লেখক অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেছিলেন, তিনি তার সন্তানের হত্যাকারীদের বিচার চান না। তার ভাষায়, আদালতে ফাঁসি বা জেল দিয়ে যে বিচার, তার ওপর তার আস্থা নেই।সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনিকে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের বাসায় নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ২০১২ সালে। ১৪ বছরেও ওই ঘটনার বিচার তো দূরে থাক, তদন্তকারীরা এখন পর্যন্ত তদন্ত রিপোর্টই দিতে পারেনি। একবার দুবার করে ১১৮ বারের মতো পিছিয়েছে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়। বাংলাদেশ তো বটেই, পৃথিবীর ইতিহাসেই এরকম ঘটনা বিরল। ফলে সাগর-রুনি হত্যা মামলার যে বিচার হবে বা প্রকৃত খুনীরা ধরা পড়বে, সেটি নিহতদের পরিবারও এখন আর বিশ্বাস করে না।নিহত মেহেরুন রুনির ছোট ভাই নওশের আলম রোমান ২০১৭ সালেই একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ডের বিচারের আশা তারা ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যদি কখনো বিচার সম্ভব হয় সেটি হবে অলৌকিকভাবে। কারণ হ্ত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রভাবশালী কেউ জড়িত রয়েছে, আর না হয় তদন্তকারী সংস্থার ব্যর্থতা রয়েছে।’ এরপর কেটে গেছে আরও ৯ বছর। নিশ্চয়ই এই পরিবারে ন্যায়বিচার নিয়ে আশাবাদ আরও কমে এসেছে বা শূন্যে নেমেছে।
২০২২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সংবাদমাধ্যমেকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় সাগর সারোয়ারের মা সালেহা মনির বলেছিলেন, ‘কষ্টের কথা আর কত বলে পারা যায়! প্রতি বছর দিনটি এলে চারপাশ থেকে ফোন আসে। পত্রিকা অফিসগুলো থেকে প্রতিক্রিয়া জানতে চায়। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে আর কত, কত দিন অপেক্ষা। বিচার পাওয়া তো দূরের কথা, খুনিইতো চিহ্নিত হলো না।’২০১৬ সালে কুমিল্লা সেনানিবাসে খুন হন কলেজছাত্র সোহাগী জাহান তনু। সেই মামলারও বিচার হয়নি। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, বিচারের আশা ছেড়ে দিয়েছেন তনুর বাবা-মা।
২০২২ সালের ২৪ মার্চ রাতে রাজধানীর শাহজাহানপুর আমতলা রেলগেট এলাকায় বান্ধবীর সঙ্গে রিকশায় থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান বদরুন্নেসা মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী সামিয়া আফরিন প্রীতি। আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদুল ইসলাম টিপুকে মারতে সন্ত্রাসীরা গুলি করলে সেই গুলি গিয়ে লাগে প্রীতির শরীরে। মেয়ের এমন মৃত্যুর পর তার বাবা জামাল উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘আমি বিচার চাই না। আল্লাহর কাছে বিচার দিয়ে রাখলাম। কার শাস্তি চাইব? বিচার নাই, বিচার কার কাছে চাইব?’
একইভাবে রাজধানীর নিউমার্কেটে ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষে নিহত হন কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মী নাহিদ হাসানের মৃত্যুর পরে তার বাবাও একইভাবে বলেছিলেন, ‘আমি বিচার চাই না। বিচার চেয়ে কী লাভ? কার কাছে বিচার চাইব?’তার মানে বিচার নিয়ে মানুষের এই আক্ষেপ ও হতাশা নতুন কিছু নয় এবং এটি একদিনে তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর ধরে চলা বিচারহীনতার ‘সংস্কৃতি’ আর ত্রুটিপূর্ণ বিচারব্যবস্থাই এর জন্য দায়ী। অর্থাৎ দেশের বিচারব্যবস্থার ওপর যাদের আস্থা নেই তারাই বলছেন যে বিচার চান না। কেন এই আস্থাহীনতা তৈরি হলো, তার কারণ রাষ্ট্রের অজানা নয়। ফলে বিচার তথা ন্যায়বিচার নিয়ে এমন আস্থাহীনতার দেশে যখন কোনো একটি শিশু হত্যা মামলার রায় হয়ে যায় মাত্র ৬ কার্যদিবসে, তখন সেটি আমাদের আশাবাদী করে। আবার এই প্রশ্নেরও জন্ম দেয় যে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল না হলে; ঘটনাটি নিয়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক পরিসরে তোলপাড় না হলে; রাজনৈতিক দলগুলোর তরফে সরকারের ওপর চাপ তৈরি না হলে কি সরকার এ বিষয়ে তৎপর হতো এবং সরকার তৎপর না হলে কি এত দ্রুত রায় হতো?
বিচারব্যবস্থার প্রতি দেশের সব মানুষের বা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আস্থা নেই—এমন সরলীকরণেরও সুযোগ নেই। বরং সমস্যাটা অন্য জায়গায়। সেটি হলো, প্রায় ২০ কোটি মানুষের দেশে প্রতিনিয়ত যে পরিমাণ অপরাধ সংঘটিত হয়, তার বিচারের জন্য সেই অনুপাতে বিচারক এবং বিচার সংশ্লিষ্ট অন্যান্য জনবল নেই। দ্বিতীয়ত, যেকোনো ঘটনায় ন্যায়বিচার নিশ্চিতের প্রথম শর্ত যে তদ্ন্ত প্রতিবেদন, সেখানেই ঘাপলা থাকে। তদন্তকারীদের অদক্ষতা ও অসততাই এর প্রধান কারণ। যে কারণে বিচারক চাইলেও প্রকৃত অপরাধীকে সাজা দিতে পারেন না। কারণ অপরাধ প্রমাণের মতো যথেষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ ছিল না। তার মানে বিচারব্যবস্থার প্রতি কত শতাংশ মানুষ অনাস্থা পোষণ করেন আর কত শতাংশ মানুষ আস্থা রাখেন, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, বিচার বিভাগ নিজে কতটা স্বাধীন, সক্ষম এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ।
লাখ লাখ মামলা যে আদালতে অনিষ্পন্ন অবস্থায় ঝুলে আছে, সেটিও বিচারব্যবস্থার প্রতি অনাস্থার একটি বড় কারণ। কিন্তু কী কারণে মামলার জট, সেটি সরকারও জানে। অতএব মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে দুয়েকটি চাঞ্চল্যকর মামলায় দ্রুত রায় দেয়া মানেই দেশের বিচারব্যবস্থার সব সংকট কেটে গেছে—সেটি ভাববার কোনো কারণ নেই। বরং বিচার নিয়ে অনাস্থার দেশে যখন হঠাৎ করে কোনো একটা মামলায় অবিশ্বাস্য দ্রুততায় রায় হয়ে যায়, তখন জনমনে এই প্রশ্ন উঠতে পারে যে, দ্রুত বিচার করতে গিয়ে ন্যায়বিচারের সাথে আপোশ করা হলো কি না? কেননা, বিচার নিয়ে দুটি প্রবাদ খুবই পরিচিত। ১. জাস্টিস ডিলেইড জাস্টিস ডিনাইড। অর্থাৎ বিচারে বিলম্ব মানে বিচারকে অস্বীকার করা বা অবিচারের ঝুঁকি তৈরি করা এবং ২. জাস্টিস হারিড ইজ জাস্টিস বারিড। অর্থাৎ তড়িঘড়ি করে বিচার করা মানে বিচারকে কবর দেয়া।
মোদ্দা কথা, বিচারকে বিলম্বিত করা, যেমন ১৪ বছর পরও সাগর-রুনি হত্যাকারীদের চিহ্নিত করতে না পারা যেমন অবিচার এবং একপর্যায়ে বিচারহীনতার শঙ্কা তৈরি করেছে, তেমনি সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপে তড়িঘড়ি কোনো বিচার করার মধ্য দিয়ে সরকার বাহবা কুড়ালেও আদালতকে এটিও নিশ্চিত করতে হয় যে, দ্রুত সম্পন্ন হলেও সেখানে ন্যায়বিচার হয়েছে।
পল্লবীর শিশু হত্যা মামলার রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের একটি বক্তব্য দিয়ে লেখাটা শেষ করা যাক। তিনি বলেছেন, বিচার হবে না বলে শিশুটির বাবা যে সংশয় পোষণ করেছিলেন, বিচারব্যবস্থার ওপর যে আস্থাহীনতার প্রকাশ করেছিলেন, দ্রুততম সময়ে এই মামলার রায় তার জবাব। এই রায়ের মধ্য দিয়ে দেশের বিচারব্যবস্থার ওপর শিশুটির বাবার আস্থা ফিরে এসেছে বলে তিনি মনে করেন।
আমরাও এটি মনে করতে চাই এবং এই ঘটনার মধ্য দিয়ে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসুক। কিন্তু তার আগে বিচারব্যবস্থার ত্রুটিগুলো দূর করা প্রয়োজন। সেটি মাত্র ৬ কার্যদিবসে সম্ভব নয়।
লেখক : সাংবাদিক ও লেখক।

