২রা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ১৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

বয়সে বড় স্বামী: নিরাপত্তা নাকি ক্ষমতার অসমতা?

মাহফুজা অনন্যা
বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, শিক্ষার হার বাড়ছে, নারীর কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু এই অগ্রগতির মাঝেও কিছু সামাজিক বাস্তবতা এখনও উদ্বেগজনক। বাল্যবিবাহ এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অস্বাভাবিক বয়সগত ব্যবধান তার অন্যতম। বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সে বিবাহিত কিশোরীদের একটি বড় অংশের স্বামী তাদের চেয়ে ৫ থেকে ৯ বছর, এমনকি ১০ বছর বা তারও বেশি বয়সী। এই তথ্য শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি আমাদের সমাজের দীর্ঘদিনের মানসিকতা, ক্ষমতার কাঠামো এবং লিঙ্গবৈষম্যের প্রতিচ্ছবি; উন্নয়নের মানদণ্ড এবং নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও স্বাধীনতার প্রশ্ন।সমাজে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, স্বামীকে স্ত্রীর চেয়ে বয়সে বড় হতে হবে। এই ধারণা অনেক ক্ষেত্রে এতটাই প্রভাবশালী যে, কিশোরী মেয়েদেরও বয়সে অনেক বড় পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। ফলে বৈবাহিক সম্পর্কে সমতা, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং মানসিক বিকাশের স্বাভাবিক সুযোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। শুধু কিশোরী নয়, বহু শিক্ষিত মেয়েও চায় যে, বয়স্ক একজন প্রতিষ্ঠিত স্বামী নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘর-সংসার করতে।
আর এই বাস্তবতার পেছনে রয়েছে দারিদ্র্য, সামাজিক অনিরাপত্তা, কুসংস্কার এবং নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক মনোভাব। অনেক পরিবার মনে করে, মেয়েকে দ্রুত বিয়ে দেওয়া নিরাপদ; মেয়েকে সবার আগে আর্থিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করাই মূল লক্ষ্য। অথচ এর দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও মানবিক ক্ষতির বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যায়।
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নে নয়, বরং তার শিশু, কিশোরী ও নারীদের কতটা নিরাপদ, স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে পারে, তার ওপরও নির্ভর করে। বাল্যবিবাহ এবং দম্পতিদের অস্বাভাবিক বয়সগত বৈষম্য তাই শুধু ব্যক্তিগত নয়, জাতীয় উন্নয়নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বাংলাদেশে ছেলেদের গড় বিয়ের বয়স মেয়েদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই একটি কিশোরী বা সদ্য যৌবনে পা রাখা মেয়েকে এমন একজন পুরুষের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে হয়, যিনি জীবনের অভিজ্ঞতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং সামাজিক ক্ষমতার দিক থেকে অনেক এগিয়ে। বাহ্যিকভাবে এটি স্বাভাবিক মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে এক ধরনের অসম সম্পর্ক, যেখানে একজনের সিদ্ধান্তই অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রাধান্য পায়।বয়সের এই বড় ব্যবধানের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে মেয়েদের জীবনে। একজন কিশোরী যখন নিজের শিক্ষা, স্বপ্ন ও ব্যক্তিত্ব গঠনের পর্যায়ে থাকে, তখন তাকে সংসার, মাতৃত্ব এবং পারিবারিক দায়িত্বের ভার বহন করতে হয়। অনেক সময় সে নিজের মতামত প্রকাশের সুযোগ পায় না, কারণ পরিবার ও সমাজ ধরে নেয় যে, বয়সে বড় স্বামীই সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বেশি উপযুক্ত। ফলে মেয়েদের আত্মবিশ্বাস, স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিসত্তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে যতই আলোচনা হোক না কেন, যদি একটি মেয়ে নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ না পায়, তাহলে সেই ক্ষমতায়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। একটি সুস্থ দাম্পত্য সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, বোঝাপড়া এবং সমতা। বয়সের পার্থক্য সবসময় সমস্যা সৃষ্টি করে না, কিন্তু যখন সেই পার্থক্য বাল্যবিবাহ, অসম ক্ষমতা এবং অধিকারহীনতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা একটি সামাজিক সংকটে পরিণত হয়।তবে এ সমস্যার মূল কারণ শুধু পারিবারিক সিদ্ধান্ত নয়; এর পেছনে রয়েছে দারিদ্র্য, সামাজিক অনিরাপত্তা, কুসংস্কার এবং নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি। অনেক পরিবার মনে করে, বয়সে বড় ও আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত পাত্রের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে হলে ভবিষ্যৎ নিরাপদ হবে। কিন্তু বাস্তবে এই নিরাপত্তা অনেক সময় মেয়েদের স্বাধীনতা, শিক্ষা এবং আত্মমর্যাদার বিনিময়ে অর্জিত হয়।
নারীর ক্ষমতায়ন বলতে শুধু শিক্ষা অর্জন বা কর্মসংস্থানের সুযোগকে বোঝায় না; এর অর্থ হলো নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা, মতামত প্রকাশের অধিকার এবং সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বয়সের বড় ব্যবধান অনেক ক্ষেত্রেই নারীর এই ক্ষমতায়নের পথে একটি নীরব বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
যখন একজন নারী তার চেয়ে অনেক বেশি বয়সী পুরুষকে বিয়ে করেন, তখন সম্পর্কের মধ্যে প্রায়ই একটি অসম ক্ষমতার কাঠামো তৈরি হয়। বয়সে বড় ব্যক্তি সাধারণত অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং পারিবারিকভাবে অধিক প্রভাবশালী অবস্থানে থাকেন। অন্যদিকে কম বয়সী নারী অনেক সময় অভিজ্ঞতা, শিক্ষা বা আর্থিক স্বাধীনতার দিক থেকে পিছিয়ে থাকেন। ফলে সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোতে নারীর অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে যেতে পারে।
বয়সের বড় ব্যবধানের কারণে অনেক নারী নিজের মতামত প্রকাশে সংকোচ বোধ করেন। পারিবারিক ও সামাজিক সংস্কৃতিও প্রায়শই বয়সে বড় স্বামীর কর্তৃত্বকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করে। ফলে নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও আত্মবিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবর্তে তাকে সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার অবস্থানে থাকতে হয়।
এই পরিস্থিতির প্রভাব শিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও দেখা যায়। অল্প বয়সে বিয়ে হওয়া অনেক নারী উচ্চশিক্ষা বা দক্ষতা অর্জনের সুযোগ হারান। কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই তারা সংসারের দায়িত্বে আবদ্ধ হয়ে পড়েন। ফলে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়, যা ক্ষমতায়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তিকে দুর্বল করে। বয়সের পার্থক্য সবসময় সমস্যা নয়; কিন্তু যখন সেই পার্থক্য ক্ষমতার বৈষম্যে রূপ নেয়, তখন তা নারীর স্বাধীনতা ও বিকাশকে সীমাবদ্ধ করতে পারে।
একটি আধুনিক ও সমতাভিত্তিক সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে কেবল বাল্যবিবাহ রোধ করলেই হবে না, বরং এমন সামাজিক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে নারীরা শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ পায়। কারণ ক্ষমতায়ন তখনই বাস্তব হয়, যখন একজন নারী নিজের জীবন সম্পর্কে নিজেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা ও স্বাধীনতা অর্জন করেন। বয়সের অস্বাভাবিক ব্যবধান সেই স্বাধীনতার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধকতা হয়ে উঠতে পারে, যা নিয়ে সমাজকে আরও গভীরভাবে ভাবতে হবে।
নারীর ক্ষমতায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো অর্থনৈতিক ও সামাজিক নির্ভরশীলতা। যখন একজন নারী নিজের শিক্ষা, আয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার পরিবর্তে সম্পূর্ণভাবে স্বামীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, তখন তার স্বাধীনতা সীমিত হয়ে যায়। বয়সের বড় ব্যবধান এই নির্ভরশীলতাকে অনেক ক্ষেত্রে আরও গভীর করে তোলে।
আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যেখানে পুরুষকে পরিবারের উপার্জনকারী এবং নারীকে নির্ভরশীল সদস্য হিসেবে দেখা হয়। বয়সে অনেক বড় ও আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত পুরুষের সঙ্গে কম বয়সী নারীর বিয়ে হলে এই নির্ভরতার সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়। নারী তখন নিজের জীবন পরিচালনার জন্য নয়, বরং জীবনের প্রায় প্রতিটি প্রয়োজন পূরণের জন্য স্বামীর দিকে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য হন।
এই নির্ভরশীলতা শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি মানসিক ও সামাজিকও। একজন নারী যখন নিজের আয়, সম্পদ বা বিকল্প সিদ্ধান্তের জায়গা তৈরি করতে পারেন না, তখন অনেক ক্ষেত্রেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সাহসও হারিয়ে ফেলেন। নিজের ইচ্ছা, স্বপ্ন বা মতামত গৌণ করে সংসারের স্থিতিশীলতাকেই প্রধান বিবেচনা করতে বাধ্য হন।অর্থনৈতিক স্বাধীনতা মানুষকে শুধু অর্থ দেয় না; দেয় আত্মমর্যাদা, আত্মবিশ্বাস এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের শক্তি। যে নারী নিজের শিক্ষা ও দক্ষতার মাধ্যমে আয় করতে পারেন, তিনি পরিবারেও অধিক মর্যাদা পান এবং নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে স্বাধীনভাবে ভাবতে পারেন। বিপরীতে সম্পূর্ণ স্বামী-নির্ভরশীলতা একজন নারীকে প্রায়ই এমন অবস্থানে নিয়ে যায়, যেখানে তার অধিকারগুলোও অন্যের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
তাই নারীর ক্ষমতায়নের আলোচনায় শুধু আইনি অধিকার বা সামাজিক স্বীকৃতি নয়, অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতাকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একটি সমাজ তখনই সত্যিকারের সমতাভিত্তিক হতে পারে, যখন নারীরা কারও দয়া বা সহায়তার ওপর নয়, নিজেদের শিক্ষা, দক্ষতা ও সক্ষমতার ওপর ভর করে জীবন গড়তে পারবেন।নারীর জন্য নিরাপত্তার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি কোনো ব্যক্তি নয়, বরং তার নিজের সক্ষমতা। কারণ আত্মনির্ভরশীল নারী শুধু নিজের জীবনই বদলান না, বদলে দেন পরিবার, সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাবনাকেও।
নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শুধু সমস্যার কথা বললেই হবে না; উত্তরণের পথও খুঁজতে হবে। একজন নারী যেন নিজের পরিচয়, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ গঠনের জন্য সম্পূর্ণভাবে অন্যের ওপর নির্ভরশীল না হন, সে পরিবেশ তৈরি করাই হওয়া উচিত সমাজের লক্ষ্য।
নারীর হাতে আয় করার সুযোগ তৈরি করতে হবে। চাকরি, উদ্যোক্তা কার্যক্রম, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে নারীদের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। নিজের আয় থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়।অনেক পরিবার এখনও মনে করে, মেয়েদের প্রধান দায়িত্ব সংসার সামলানো। ফলে তারা দীর্ঘমেয়াদে স্বামীনির্ভর হয়ে পড়ে। নারীর ক্ষমতায়ন শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি মানসিক শক্তিরও বিষয়। একজন নারী যেন নিজের সক্ষমতার ওপর বিশ্বাস রাখতে পারেন, নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে।নারীকেই বুঝতে হবে, নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি কোনো ব্যক্তি নয়, বরং তার নিজের শিক্ষা, দক্ষতা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা। একজন আত্মনির্ভরশীল নারী স্বামীকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখেন না; বরং সমান মর্যাদার অংশীদার হিসেবে দেখেন। তাই নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়নের পথ হলো নির্ভরশীলতা থেকে সক্ষমতার দিকে, অভিভাবকত্ব থেকে অংশীদারত্বের দিকে এবং নীরবতা থেকে আত্মপ্রকাশের দিকে অগ্রসর হওয়া।
লেখক: কবি ও কথাসাহিত্যিক।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়