মিথুন দত্ত, অভয়নগর
যশোরের অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরে এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। হাসপাতালে কর্মরত এক ডেন্টাল টেকনোলজিস্ট নিজেকে ‘ডেন্টিস্ট’ পরিচয়ে দাঁত তোলা ও রোগী দেখার কাজ করে আসছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, একই হাসপাতালে কর্মরত দুইজন বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডার ডেন্টাল সার্জন রুম সংকটের কারণে একটি কক্ষেই রোগী দেখতে বাধ্য হচ্ছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগের ১০৬ নম্বর কক্ষে নিয়মিত রোগী দেখেন ডেন্টাল টেকনোলজিস্ট রুহুল কুদ্দুস। প্রতি রোববার ও বুধবার তিনি দাঁতও তুলে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া সরকারি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সঠিক সময়ে হাসপাতালে উপস্থিতি ও দায়িত্ব শেষে নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থল ত্যাগের নিয়মও তিনি মানেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু সরকারি হাসপাতালেই নয়, ‘নওয়াপাড়া ডেন্টাল কেয়ার’ নামে নিজস্ব একটি চেম্বারেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে দন্ত চিকিৎসা দিয়ে আসছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। সরকারি কর্মপরিধি অনুযায়ী, একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ডেন্টাল)-এর দায়িত্ব হলো দন্ত চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা প্রদান, যন্ত্রপাতি সংরক্ষণ, রেকর্ড ও রিপোর্ট ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করা। তবে রোগী দেখা, প্রেসক্রিপশন দেওয়া কিংবা স্বাধীনভাবে চিকিৎসা দেওয়ার কোনো বৈধতা তাদের নেই। এছাড়া বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগের রায় অনুযায়ী, ডিপ্লোমাধারী ডেন্টাল টেকনোলজিস্টরা নিজস্ব চেম্বার খুলে রোগী দেখতে বা প্রেসক্রিপশন দিতে পারবেন না। তারা কেবল নিবন্ধিত ডেন্টাল সার্জনের তত্ত্বাবধানে সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। অভিযোগের বিষয়ে জানতে বুধবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে ১০৬ নম্বর কক্ষে গিয়ে ডেন্টাল টেকনোলজিস্ট রুহুল কুদ্দুসকে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আপনার কাছে যদি কোনো রায়ের কপি ও সরকারি কর্মপরিধি থাকে, তাহলে হাসপাতালে এসে সামনাসামনি কথা বলবেন। নওয়াপাড়া ডেন্টাল কেয়ার’ নামের প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি ফোনে কোনো কথা বলতে পারব না। যা বলার সামনাসামনি বলব।” এ বিষয়ে অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মো. মাহফুজুর রহমান সবুজ বলেন, “আগে হাসপাতালে কোনো ডেন্টাল ডাক্তার না থাকায় তিনি রোগী দেখতেন। বর্তমানে হাসপাতালে দুইজন ডেন্টাল সার্জন রয়েছেন। এরপরও কীভাবে তিনি রোগী দেখছেন, তা আমার জানা নেই। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” রুম সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, “১০১ নম্বর কক্ষে দুইজন ডেন্টাল সার্জন রোগী দেখছেন। অন্যদিকে একজন ডেন্টাল টেকনোলজিস্ট কীভাবে ১০৬ নম্বর কক্ষে বসে রোগী দেখছেন, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে।” উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আলিমুর রাজিব বলেন, “আগে এমন কোনো নির্দেশনা না থাকায় তিনি রোগী দেখতেন। তবে সম্প্রতি হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী ডেন্টাল টেকনোলজিস্টদের রোগী দেখা ও চিকিৎসাসংক্রান্ত কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “দুই ডেন্টাল সার্জনকে আলাদা কক্ষ দেওয়া হয়েছিল। পরে তারা নিজেরাই একসঙ্গে বসে রোগী দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।” এদিকে হাসপাতালের দুই ডেন্টাল সার্জন ডা. মো. নাজমুল হোসেন ও ডা. মো. রাকিবুল ইসলাম জানান, তারা অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদানের পর থেকে ডেন্টাল টেকনোলজিস্ট রুহুল কুদ্দুস তাদের কোনো ধরনের সহযোগিতা করেননি। বরং তিনি আলাদাভাবে রোগী দেখতেন। এ কারণে তারা শেষ পর্যন্ত এক কক্ষে বসে সেবা প্রদান শুরু করেন। সরকারি হাসপাতালে একজন ডেন্টাল টেকনোলজিস্টের রোগী দেখা, দাঁত তোলা এবং ব্যক্তিগত চেম্বারে চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
