পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে যে ধরনের সংকট দেখা দিয়েছিল, বাংলাদেশেও বর্তমানে তার সবই বিদ্যমান। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশে সংকট কিছুটা বেশি। তাই সুধীজনরা মনে করছেন দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রে উত্তরণ প্রয়োজন। বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণার সঙ্গে যুক্ত দেশের কয়েকজন অরাজনৈতিক ব্যক্তির তৈরি করা এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এমন অভিমত ব্যক্ত করা হয়েছে।
‘বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনের মূল কথা হলো, বাংলাদেশ একটি সংকটকাল অতিক্রম করছে। তাদের মতে, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, সার্বিক উন্নয়ন এবং প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে উষ্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করা দেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এর জন্য রাজনৈতিকভাবে অভিজ্ঞ সরকারের বিকল্প নেই। আর তা পেতে হলে দরকার দ্রুত সংসদ নির্বাচন। প্রতিবেদনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়। তবে পুরো সরকার যেভাবে একটি ‘টিম’ হিসেবে কাজ করার কথা, তা হয়ে ওঠেনি বলেও মন্তব্য করা হয়। সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার সামপ্রতিক বক্তব্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি মানুষের আস্থা থাকলেও সরকারের কিছু দায়িত্বশীল ব্যক্তির কার্যক্রম উদ্বেগজনক। স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের পতনের পর রাষ্ট্রের স্বাভাবিক অবস্থা ব্যাহত করতে এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে প্রতিনিয়ত নানামুখী চাপে রাখতে পরাজিত শক্তিগুলো গোপনে ও কৌশলে কাজ করছে। ফ্যাসিবাদী শক্তিকে অগণতান্ত্রিক পন্থায় কিভাবে ফিরিয়ে আনা যায়, সেটি নিয়েও তৎপরতা রয়েছে। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে দূরে সরিয়ে না দিয়ে তাদের পরামর্শ নিয়ে এবং তাদের সহায়ক শক্তি হিসেবে সঙ্গে নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের পথচলা উচিত। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত লেখক-গবেষক ও বামপন্থী রাজনীতিক বদরুদ্দীন উমর বলেছেন, ‘সরকারের উচিত এই বছরের মধ্যে নির্বাচন দেওয়া।’ বিষয়টি উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ড. মাহবুব উল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন অনির্বাচিত সরকার থাকলে নানা জটিলতা দেখা দেয়। নির্বাচিত সরকারের যে শক্তি থাকে, সেটি এই সরকারের নেই।’ প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধু ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কারণে বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করার মতো অবস্থায় আছে। বিশ্বের খ্যাতনামা শাসকদেরও তিনি সমর্থন পাচ্ছেন। তবে প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো দ্রুত নির্বাচনও চায়। অন্তর্বর্তী সরকারকে পাঁচ থেকে ১০ বছর ক্ষমতায় রাখার প্রচারণার পেছনেও সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা রয়েছে বলে মনে করছেন প্রতিবেদন প্রণয়নে যুক্ত ব্যক্তিরা। বিএনপিসহ বেশির ভাগ দল ন্যূনতম সংস্কার করে নির্বাচন চাইছে। জামায়াতে ইসলামীও রমজানের আগে নির্বাচনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার করার কথা বলছে। কিন্তু নবগঠিত জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতাদের অনেকে সার্বিকভাবে সংস্কার শেষ করার পরই নির্বাচন করার কথা বলছেন। সংস্কার নিয়ে তাঁদের সঙ্গে স্পষ্টত বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের অবস্থানের ফারাক রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, ছাত্র নেতৃত্ব অন্তর্বর্তী সরকারের মূল শক্তি বা ভিত্তি যা-ই বলা হোক না কেন, দেশের অন্যতম প্রধান দল বিএনপিসহ অন্য প্রতিষ্ঠিত দলগুলোকে উপেক্ষা করা ভালো ফল আনবে না। অন্যদিকে নির্বাচন নিয়ে কোনো সংকট হলে তাতে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
